হরশঙ্করের অনুচরগণ সবাই এখন বন্ধ্যার জঙ্গলে রয়েছে। গুরুদেবের আদেশ পাওয়া মাত্র সবাই ছড়িয়ে পড়লো গোটা বনের মধ্যে। কে এই শত্রু, যার গুলীতে তাদের একজন নিহত হলো।
কেউ বা বল্লম, কেউ বা শরকী, দা, কুঠার, খর্গ-যে যা পারলো তাই নিয়ে চষে ফিরতে লাগলো বনভূমি।
কিন্তু কোথায় কাউকে খুঁজে পেলো না।
সন্ধ্যার পূর্বে সবাই হরশঙ্করের সম্মুখে হাজির হলো।
নত মস্তকে সবাই জানালো বনভূমি তারা চষে ফেলেছে কিন্তু কাউকে পাওয়া যায় নি।
একজন অনুচর এগিয়ে এলো-গুরুদেব আমি কাউকে খুঁজে না পেলেও এমন একটা জিনিস পেয়েছি যার দ্বারা বোঝা যায়-আমাদের এই বন্ধ্যা জঙ্গলে কোন–
কথা শেষ হয় না লোকটা হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায় মাটিতে। লোকটার বুকের রক্তে রাঙা হয়ে উঠে বন্ধ্যা জঙ্গলের শুকনো মাটি।
হরশঙ্কর ও অন্যান্য অনুচরগন শুনতে পেয়েছিলো একটা গুলীর শব্দ, পরক্ষণেই লোকটা পড়ে গিয়েছিলো ভূতলে।
হরশঙ্কর ইংগিত করলো অনুচরগণকে যেতে। কিন্তু কোন দিক থেকে। গুলীটা এসেছিলো এটা কেউ বলতে পারলোনা। তবু সবাই বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়লো চারিদিকে।
হরশঙ্কর এগিয়ে গেলো মৃতলোকটার দিকে, কি পেয়েছিলো। সে, যার জন্য তার মৃত্যু ঘটলো।
হরশঙ্কর ঝুকে পড়লো লোকটার হাতের উপর, দেখতে পেলো-একটা সিগারেটের টুকরা রয়েছে তার হাতের মুঠায়।
হরশঙ্কর মৃতের হাতের তালু থেকে সিগারেটের টুকরাটা তুলে নিয়ে হেসে উঠলো-হাঃ হাঃ হাঃ–হাঃ হাঃ হাঃ।
০৯.
যাদুকর হরশঙ্করের দল যখন সমস্ত বন খুঁজে খুঁজে হয়রান পেরেশান তখন বনহুর সুউচ্চ এক ডালের ঘন পাতায় ফাঁকে হেলান দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে বসে মৃদু মৃদু হাসছে। একবার রিভলবারটা খুলে দেখে নিলো-মাত্র আর তিনটা গুলী অবশিষ্ট রয়েছে। ইচ্ছা করলে এ গুলী তিনটা দিয়ে তিন জনকে পর পারে পাঠাতে পারে কিন্তু এতো শীঘ্র রিক্তহস্ত হলে তার চলবেনা। যতক্ষণ নূরীকে উদ্ধার করা না যায় ততক্ষণ তাকে এ গুলী কটি সাবধানে ব্যয় করতে হবে।
কিন্তু সেই দিনের পর থেকে আবার হরশঙ্কর উধাও হলো।
বনহুর আশ্চর্য হলো—লোকটা আবার গেলো কোথায়। যেখানেই থাক বনহুর, হরশঙ্করের উপর ছিলো তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। বনহুর গাছের ডালে ডালে থেকে সর্তক অনুসন্ধান চালালো। এ মুহূর্তে নূরীকে উদ্ধার করা মোটেই কোন অসুবিধাজনক নয়। কিন্তু নূরীকে উদ্ধারের পূর্বে জানতে হবে—কে এই পাষন্ড নরপিশাচ? কোথায় এর বাস, কি উদ্দেশ্য এর? .
বনহুর একদিন গাছের শাখায় বসে তাকাচ্ছিলো দূর হতে দূর-যত দূর তার দৃষ্টি যায়। হঠাৎ নজর তার চলে গেলো অদূরে এক বটবৃক্ষতলে এক সন্ন্যাসীর উপর।
চমকে উঠলো বনহুর-সন্ন্যাসী বাবাজী এই গহণ বনে!
বনহুরের চোখদুটো আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। এই সমস্ত জঙ্গলে মহৎ ব্যক্তিও বাস করে। সন্ন্যাসীর সঙ্গে মিলন আশায় উদগ্রীব হয়ে উঠলো বনহুর।
হঠাৎ বনহুর শুনতে পেলো একটা গুরুগম্ভীর কণ্ঠ–বস, এসো, আমি তোমার প্রতীক্ষায় পথ চেয়ে আছি।
বনহুর বিস্ময়ভরা চোখে তাকালো, তার এখানে উপস্থিতি সন্ন্যাসী বাবাজী জানলো কি করে। বনহুর বৃক্ষ শাখা ত্যাগ করে নেমে এলো নীচে।
সন্ন্যাসী বাবাজী বললো-বৎস তুমি ঐখানে উপবেশন করো। বনহুর বসে পড়লো আদুরে একটা গাছের গুড়ির পাশে।
সন্ন্যাসী বললো-বৎস, জানি তুমি কিসের সন্ধানে আজ এই বন্ধ্যার জঙ্গলে এসেছে।
বনহুরের চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।
কিন্তু বৎস, তুমি কোন সময় এ বনের পশ্চিম অংশে যাবে না।
বনহুর প্রশ্ন করলো—কেনো?
সন্নাসী বাবাজী বললো–ঐদিকে বিপদ আছে।
বিপদ!
হাঁ, মায়ারাণীর মায়াজালে জড়িয়ে পড়বে।
মায়ারাণীর মায়াজাল……..হঠাৎ অট্টহাসিতে ভেংগে পড়লো বনহুর। মুহূর্ত বিলম্ব না করে সন্ন্যাসীর সম্মুখে এসে দাঁড়ালো। রিভলভার চেপে ধরলো সন্ন্যাসীর কণ্ঠনালীতে।
কঠিন কণ্ঠে গর্জে উঠলো বনহুর তুমি সন্ন্যাসী সেজে মায়ারাণীর মায়াজালে জড়িয়ে পড়ার ভয় দেখাচ্ছো হরশঙ্কর-জানো আমি কে?
সন্ন্যাসী বেশী হরশঙ্কর একটুও নড়লো না, চোখ দুটো দিয়ে অগ্নি বর্ষণ করলো। বনহুর ওর দৃষ্টির দিকে তাকাতেই কেমন যেন অসুস্থ বোধ করলো, টলতে লাগলো তার পা দুখানা। এতে তেজ হরশঙ্করের চোখে! বনহুর মুহূর্ত বিলম্ব না করে রিভলভার থেকে গুলী ছুঁড়লো।
একটা আর্তনাদ হলো মাত্র।
বনহুর অবাক হয়ে দেখলো-হরশঙ্কর যেমন বসে ছিল তেমনি রইলো। একটু সরলো না সে।
বনহুর এবার ভাল করে লক্ষ্য করতেই আশ্চর্য হলো, সন্ন্যাসী বেশী হরশংকরের দেহটা সম্পূর্ণ বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছে।
বনহুর হাত দিয়ে নাড়া দিতে লাগলো, মনের মধ্যে সন্দেহ জাগলো–হরশঙ্কর না হয়ে যদি সত্যই কোন সন্ন্যাসী হয়, তা হলে একটা নিরপরাধ মহৎ জনকে খুন করার অপরাধে অপরাধী হবে সে। বনহুর দাড়ি ধরে টানতেই খসে এলো–জটাজুটসহ মাথার চুলও খুলে এলো তার হাতের মুঠায়। এবার বনহুর আশ্বস্ত হলো, তার অনুমান তা হলে মিথ্যে হয়নি। অহেতুক একটি মহৎ জীবন নামের অপরাধে অপরাধী নয় তবে সে।
বনহুর এবার হরশঙ্করের মাথা ধরে টেনে তুলে ফেললো। আশ্চর্য একটা খোলসের মধ্যে সে জমাটভাবে বসেছিলো। খোলসটা দেখলে ঠিক বটবৃক্ষের শিকড় বলে ভ্রম হয়, অতি কৌশলে এ খোলসটা সে তৈরী করেছিলো তাতে কোন সন্দেহ নেই।
