না, ভুল আমি করিনি। তোমাকে স্বামীরূপে পেয়ে আজ আমি ধন্য হয়েছি।
বনহুর মনিরার চিবুকটা তুলে ধরে—মনিরা।
মনিরা স্বামীর বুকে মুখ গুঁজে অনুভব করে স্বর্গের শান্তি।
সব কথা মনের পর্দায় ভেসে উঠে মনিরার। কোথায় গেলো তার জীবনের স্বর্গসুখ। কোথায় গেলো তার এতো খুশী এতো আনন্দ–হাসিগান–
মনিরার বালিশ সিক্ত হয়ে উঠে চোখের পানিতে।
ঘুমন্ত নূরকে বুকে আঁকড়ে ধরে ডাকে মনিরা-বাপ আমার।
আকাশে চাঁদ তখন পশ্চিমে হেলে পড়েছে।
০৮.
বন্ধ্যার জঙ্গলে বনহুরকে ধরে রাখে এমন জন কেউ নেই। পিঞ্জরাবদ্ধ হিংস্র জন্ত ছাড়া পেলে যেমন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে তেমনি দুর্দান্ত হয়ে উঠলো বনহুর।
হরশঙ্করের দলের চোখে ধুলো দিয়ে আত্মগোপন করলো সে বন্ধ্যার জঙ্গলে।
গাছের ফল আর ঝর্ণার জল হলো বনহুরের ক্ষুধা তৃষ্ণা নিবারণের একমাত্র সম্বল। দিনের আলোতে সে লুকিয়ে থাকে গাছের শাখার অন্তরালে। রাতের অন্ধকারে নেমে আসে সে গহন বনের মধ্যে। চারিদিকে সর্তক দৃষ্টি নিয়ে বিচরণ করে বেড়ায় গোটা বনভূমি।
বনহুরের একমাত্র চিন্তা নূরীকে উদ্ধার করা।
কিন্তু যতক্ষণ নূরী তার স্বাভাবিক জ্ঞানে ফিরে না এসেছে ততক্ষণ বনহুর যেন নিরুপায়। নূরীকে জোর করে হরণ করতে পারে সে। পারলে কি হবে, তাকে নিয়ে এ বন ছেড়ে চলে যেতে হবে তো। চলে যাবার পথ কোথায়? বনপথে কিসে যাবে-ঘোড়া নেই। আর জল পথে যাওয়া যায় তবু নৌকা বা জলযানের প্রয়োজুন।
বনহুর নূরীর উদ্ধার চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়লো। সুযোগ খুঁজতে। লাগলো-এই দলের নেতা হরশঙ্করকে হত্যা করবে নাহলে কোন উপায় নেই।
বনহুর দুষ্টজনকে হত্যা করতে কিছুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করেনা। বরং আনন্দ লাভ করে।
বনহুর একদিন গভীর রাতে বন্ধ্যা বনের মধ্যে বিচরণ করে ফিরছিলো। অনেক সন্ধান করেও হরশঙ্করকে সে আজও আবিস্কার করতে সক্ষম হয়নি। আশ্চর্য হয়ে গেছে সে, লোকটা গেলো কোথায়।
গহন বনের মধ্যে একটা কাঠের তৈরী কুঠি নজরে পড়লো। বনহুর। জঙ্গলে আত্মগোপন করে কুঠিখানার নিকটে পৌঁছলো। বিস্ময়ে আরষ্ট হলে বনহুর কুঠির ফাঁকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখলো–শুধু নূরী নয় অমনি আরও কতকগুলি যুবতীকে সেই কুঠিতে আটকে রাখা হয়েছে। যুবতীদের দেহে তেমন কোন বস্ত্র নেই প্রায় উলঙ্গের মত রয়েছে সবাই।
বনহুর লজ্জায় দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো।
আশ্চর্য, যুবতীগুলি যেন পাথরের মূর্তির মত চুপচাপ বসে আছে, কেমন এক তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব তাদের চোখে মুখে।
বনহুর নূরীর কথা স্মরণ করে আবার কুঠরীর মধ্যে তাকালো নূরীকে উদ্ধার করতে হলে লজ্জা তাকে বিসর্জন দিতে হবে।
বনহুর প্রতিটি নারীর উপর দৃষ্টি বুলিয়ে চললো। যদিও এটা তার অন্যায়, কোন পুরুষ নারীর যৌবন লুকিয়ে দেখা ঠিক নয়। বনহুরের দৃষ্টি হঠাৎ থেমে গেলো একটি যুবতীর উপর এই তো তার নূরী পাথরের মূর্তির মত স্তব্ধ হয়ে বসে আছে এক পাশে জড়োসড়ো হয়ে।
বনহুরের চোখে পানি এলো,তার চিরচঞ্চল নূরী কোনদিন এমনতো ছিলোনা। কি হয়েছে তার কেনই বা সে তার স্বাভাবিক জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
বনহুর যখন এই সব কথা ভাবছে ঠিক সেই মুহূর্তে কুঠির দরজা খুলে গেলো।
কুঠির মধ্যে প্রবেশ করলো হরশঙ্কর ও আরও দুজন পুরুষ। কুঠির মধ্যভাগে একটি মশাল জ্বলছিলো। মশালের আলোতে বনহুর সব কিছুই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।
হরশংকর কুঠির মধ্যে এসে দাঁড়ালো।
পিছনের একটি লোকের হাতে মস্তবড় একটি মাটির পাতিল। হরশঙ্কর ইংগিত করতেই পিছনের আর একজন লোক মাটির পাতিল হতে একটি গেলাসে তরল পদার্থ জাতীয় কিছু তুলে নিয়ে প্রতিটি মেয়ের মুখে ধরলো।
হরশংকর গুরুগম্ভীর কণ্ঠে গর্জে উঠলো-খাও।
যুবতী ভয় কাতর চোখে তাকালো হরশঙ্করের দিকে। তারপর নিঃশব্দে পান করলো তরল পদার্থ।
বনহুর কাঠের ফাঁকে তখনও নির্বাক নয়নে তাকিয়ে আছে।
হরশঙ্কর যমমূর্তির মত দাঁড়িয়ে আছে। আর লোক দুটি মাটির পাতিল থেকে তরল পদার্থ নিয়ে পান করাচ্ছে একজনের পর একজনকে।
বনহুরের দুচোখে বিস্ময় এবার বুঝতে পারলো সে শয়তান হরশঙ্কর কোন মারাত্মক রস দ্বারা এ সব যুবতীকে সংজ্ঞাহারা করে রেখেছে। প্রতিদিন সে এইভাবে এদের ঐ রস খাওয়ায়। এবং ইচ্ছামত যাকে খুশী নিয়ে গিয়ে শহরে নাচ–গান দেখিয়ে পয়সা উপার্জন করে তৎসহ করে চুরি ডাকাতি এমনি আর কত কি। রাগে বনহুরের শরীর জ্বালা করে দুচোখে তার আগুন ঠিকরে বের হয়।
বনহুর দেখলো, লোকটা এবার নূরীর দিকে গেলাস হাতে এগুচ্ছে।
বনহুর অধর দংশন করে।
লোকটা নূরীর মুখে গেলাস উঁচু করে ধরতেই বনহুরের রিভলবার থেকে একটা গুলী এসে বিদ্ধ হলো তার বুকে। সঙ্গে সঙ্গে লোকটা মুখ থুবড়ে পড়ে গেলো ভূতলে।
হরশংকর কুদ্ধ সিংহের ন্যায় গর্জন করে ছুটে গেলো কুঠিরের বাইরে।
বনহুর তখন অদৃশ্য হয়েছে।
এরপর হরশঙ্কর বুঝতে পারলো-শত্রু তার অতি নিকটে পৌঁছে গেছে। তার অনুচরগণকে জানিয়ে দিলো এ বনের চারিদিকে তন্নতন্ন করে অনুসন্ধান করতে।
হরশঙ্কর গহন বনে থাকলেও তার বিরাট একটা দল আছে। তার অনুচরগণ এক এক জন এক একটী নারী নিয়ে কেউ বা শিশুদের নিয়ে নানা রকমের যাদু খেলা দেখাতে দূর হতে দূর দেশে চলে যায়।
এই দোল পুর্নিমায় সবাই দূর দেশ থেকে ফিরে আসে বন্ধ্যার জঙ্গলে। হরশঙ্কর নরহত্যা করে দোল পূর্ণিমায় তার পূজা শেষ করে।
