ভূত-প্রেত আর রাক্ষসের গল্প শুনতে ভালবাসতো নূর। যুদ্ধ আর লড়াইয়ের কথা শুনলে শিশু নূরের ধমনীর রক্ত যেন উষ্ণ হয়ে উঠতো।
সরকার সাহেবকে বলতো নূর-এসো দাদু, লড়াই করি।
হেসে বলতেন সরকার সাহেব-না দাদু, আমি তো বাঘ নই,যে আমার সঙ্গে লড়াই করবে।
এসো না একটু দাদু।
নূর বৃদ্ধ সরকার সাহেবকে নাজেহাল ও পেরেশান করে তবে ছাড়তো।
বৃদ্ধ সরকার সাহেবকে হারিয়ে দিয়ে ছুটে যেতো নূর মায়ের পাশে–আম্মা আম্মা, আমি দাদুকে হারিয়ে দিয়েছি। দাদুকে হারিয়ে দিয়েছি।
মনিরা হাস্য উজ্জ্বল মুখে এগিয়ে আসে দুহাতে নূরকে কোলে তুলে নিয়ে বলে–ছিঃ দাদুকে বুঝি হারিয়ে দিতে আছে।
ততক্ষণে বৃদ্ধ সরকার সাহেব এসে দাঁড়ান মা ও পুত্রের পাশে, মিষ্টি হেসে বলেন—মা মনিরা, তোমার ছেলে বড় হলে মস্ত একজন বীর পুরুষ হবে। এখন দাদুকে হারিয়ে দিয়ে জয়ী হয়েছে তখন হাজার হাজার সৈনিককে পরাজিত করে রাজ্যজয় করবেও।
হাসতো মনিরা।
মরিয়ম বেগমও এসে দাঁড়াতেন তাদের পাশে, তাঁর মুখেও তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠতো।
নূর মনিরার পাশে শুয়ে বলতো—আম্মা আমার কিন্তু আর একটা মাম্মা ছিলো ঠিক তোমার মত।
নূরের উপর থেকে যাদুকরের যাদুক্রিয়া দূর হয়ে যাওয়ায় এখন তার মনে পড়তো নূরীর কথা। মাঝে মাঝে নূরীর জন্য মন খারাপ হতো শিশু নূরের।
সেদিন মনিরা খোলা জানালার পাশে দুগ্ধ-ফেননি বিছানায় শুয়ে আছে। কোলের কাছে নূর।
আকাশে দ্বাদশীর চাঁদ হাসছে।
জোছনার আলো এসে পড়েছে মনিরা ও নূরের মুখে।
মনিরা নূরের মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবছে আর এক জনের কথা—যার দান এই অমূল্য রত্ন। না জানি সে আজ কোথায় কেমন আছে। বেঁচে আছে কিনা তাই বা কে জানে।
শিশু নূরের ছোট্ট সুন্দর ললাট থেকে কোঁকড়ানো চুলগুলি সরিয়ে দিয়ে মনিরা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলো। গন্ড বেয়ে গড়িয়ে এলো দুফোটা অশ্রু।
এমনি আরও বহুদিন মনিরা তার স্বামীর জন্য নীরবে অশ্রু বিসর্জন করেছে। কিন্তু শিশু নূরের সম্মুখে সে কোন দিন চোখের পানি ফেলে নি। যতদূর সম্ভব মনিরা নিজকে সংযত করে রাখতো নূরের কাছে।
আজ মনিরার চোখে অশ্রু দেখে বললো নূর—আম্মা, তুমি কাঁদছো!
তাড়াতাড়ি চোখের পানি মুছে ফেলে বললো মনিরা-কই না তো। এমনি চোখে কুটো পড়েছিলো বাবা।
আম্মা, আমার কিন্তু আর একটা মাম্মা ছিলো ঠিক্ তোমার মত।
আমার মত?
হাঁ, মাম্মা সুন্দর গান জানতো। আমি না ঘুমোলে মাম্মা গান গেয়ে আমাকে ঘুম পাড়াতো।
আশ্চর্য হয়ে শোনে মনিরা, শিশু নূরকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে চলে সে-আচ্ছা নূর–
দুহাতে মনিরার গলা জড়িয়ে ধরে বলে নূর আম্মা, তুমি আমাকে নূর বলে ডাকো কোনো? আমার নাম যে মনি, মাম্মা আমাকে মনি বলে ডাকতো।
অবাক হয়ে শুনতো মনিরাকে সে নারী, যে তার সন্তানকে এতো স্নেহ-আদর দিয়ে মানুষ করেছে। ঐ শয়তান যাদুকরের সঙ্গে সে নারীর কি সম্বন্ধ কে জানে।
মনিরা বললো-বাপ, আমি তোমার নাম নূর রাখলাম। কেনো নূর নামটা তোমার ভাল লাগে না?
বেশ, তুমি আমাকে নূর বলে ডেকো আর মাম্মা আমাকে মনি বলে ডাকবে, আমার দুটো নাম হবে—কি সুন্দর, তাই না? তুমি নূর আর মাম্মা মনি–শুনো আম্মা, মাম্মা আমাকে অনেক ভালবাসতো।
আমি তোমাকে একটুও ভালবাসতে পারিনা তাই না?
তুমিও ভালবাসো। কিন্তু গান গাইতে জানো না, তাই—
তাই আমাকে ভাল লাগে না বুঝি?
আমার মাম্মার জন্য মন কেমন করছে।
শিশু নূর মুখখানা গম্ভীর বিষণ্ণ করে ফেললো।
মনিরা বুকে চেপে ধরে বললো-ওরে আমি যে তোর মা।
না, আমার মাম্মা আছে। আমি তার কাছে যাবো।
কোথায় আছে তোমার সেই মাম্মা?
জানি না।
তা হলে কি করে যাবে তার কাছে?
আমি বুঝি কোন দিন মাম্মার কাছে যেতে পারবো না?
পারবে। তোমার মাম্মা আসবে।
আমাকে নিতে?
মনিরা শিউরে উঠে, জবাব দিতে পারে না।
নূর মায়ের মুখে হাত দিয়ে নাড়া দিয়ে বলে-মাম্মা আমাকে কবে নিতে আসবে আম্মা বলো?
আসবে। তুমি এখন ঘুমোও নূর।
না, আমার চোখে ঘুম আসছেনা।
গান গাইলে ঘুমাবে?
তুমি গান গাইতে জানো আম্মা?
একটু একটু জানি বাপ।
তবে গাও–আমি ঘুমোবো আম্মা। নুর চোখ বন্ধ করে।
মনিরা নূরের গায়ে মৃদু মৃদু দোলা দিয়ে গান ধরে। সুমিষ্ট মধুর সুরে গান মনিরা:
আমার নূর ঘুমাবে
আকাশে চাঁদ হাসবে।
হাস্নাহেনার গন্ধ নিয়ে
সমীরণ ভাসবে।
তারার দল মিটি মিটি
চেয়ে চেয়ে দেখবে।
আমার নূর ঘুমাবে।
এতো সুন্দর সুরে গাইতে পারে তার আম্মা ভাবতেই পারেনি নূর, আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠে—তুমি এতো সুন্দর গান গাইতে জানো আম্মা! রোজ এমনি করে গান গাইবে—আমি ঘুমোবো।
আচ্ছা, তুমি ঘুমোও নূর, আমি গান গাইছি।
মনিরার গানের সুরে ঘুমিয়ে পড়ে নূর। মনিরা জোছনার আলোতে নির্নিমেষ নয়নে তাকিয়ে থাকে পুত্রের ঘুমন্ত ঘুমের দিকে।
ধীরে ধীরে আনমনা হয়ে যায় মনিরা তাকায় জোছনায় ভরা আকাশের দিকে। চোখের সম্মুখে ভেসে উঠে বনহুরের মুখখানা। মনে পড়ে অতীতে বিলীন হয়ে যাওয়া কত স্মৃতি–স্বামীর বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছে মনিরা। নিবিড়ভাবে কাছে টেনে নেয় বনহুর ওকে মাথায় হাত বুলিয়ে ডাকে-মনিরা!
মনিরা মুখ তুলে তাকায় স্বামীর মুখের দিকে—বলো?
তুমি একি করলে মনিরা?
কেনো?
আমাকে স্বামীরূপে গ্রহণ করে তুমি ভুল করলে।
