বনহুর নীরবে বসে রইলো, এই মুহূর্তে সে এদের তিন জনকে কাবু করে সাগরের জলে নিক্ষেপ করতে পারে কিন্তু তাহলে তার সব উদ্দেশ্য সফল হবেনা। নূরী এখন স্বাভাবিক জ্ঞানে নেই বিশেষ করে ওকে নিয়ে বড় অসুবিধা হবে হয়তো হিতে বিপরীত হতে পারে। নূরী সাগরবক্ষে ঝাপিয়েও পড়তে পারে-কাজেই বনহুর নিশ্চুপ রইলো।
চলন্ত জাহাজের পিছনে উচ্ছল জলরাশির বুকে মোটর বোটখানা ছোট্ট একটা কুটোর মত দোল খাচ্ছিলো।
জাহাজ থেকে মোটর-বোটখানা খুলে নেওয়া হলো।
সঙ্গে সঙ্গে ঘুরপাক খেয়ে মোটর বোটখানা ছিটকে গেলো প্রায় এক শত গজ দূরে।
হরশঙ্কর কৌশলে ইঞ্জিন ঠিক রেখে ডুবু ডুবু মোটর বোট-খানাকে সামলে নিলো।
বনহুর অবাক না হয়ে পারলোনা, অতি দক্ষ শয়তান এটা বুঝতে পারলো।
নূরী পড়তে যাচ্ছিলো, বনহুর নূরীকে ধরে ফেলেছিলো অতি সাবধানে। মোটর-বোটখানা সোজা হতেই বনহুর নূরীকে ছেড়ে দিলো ক্ষিপ্রগতিতে। অন্য কেউ লক্ষ্য করবার পূর্বেই সে একাজ করে ফেললো।
নূরী চীকার করেছিলো বটে, কিন্তু কিসের ভয়ে সে চীৎকার করেছিলো কেউ বুঝতে পারলোনা। মোটর-বোট ডুবে যাওয়ার ভয়ে না, আলখেল্লাধারী তাকে ধরে ফেলেছিলো সেই জন্যে। অন্য কেউ না বুঝলেও বনহুর বুঝতে পেরেছিলোনূরী তাকেই দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলো।
মোটর বোট থেকে লক্ষ্য করলো বনহুর, জাহাজখানা ক্রমান্বয়ে দূরে সরে যাচ্ছে।
তীর বেগে ছুটে চলছে মোটর বোটখানা।
হরশঙ্কর দক্ষ মোটর-বোট চালকের মত বোটখানা চালিয়ে চলেছে।
এক সময় বললো হরশঙ্করের একজন অনুচর-গুরুদেব তোর হবার পূর্বেই কি আমরা আশ্রমে পৌঁছতে সক্ষম হবো?
হাঁ মহন্ত হবো। বললো হরশঙ্কর।
অন্য একজন অনুচর বলে উঠলো—গুরুদেব, আমাদের বন্ধ্যা বন ছেড়ে মহানগর কত দূর ছিলো?
পুনরায় হরশংকর জবাব দিলো-হাজার হাজার মাইল দূরে। আমরা প্রায় এক সপ্তাহ কাল চলে মহানগরে পৌঁছেছিলাম। এ কথা নিশ্চয়ই তোমাদের স্মরণ আছে?
হাঁ গুরুদেব, আছে।
এবার বললো আলখেল্লাধারী বনহুরহরশঙ্কর আমরা জাহাজে বন্ধ্যা বনের–
হাঁ কেশব, আমরা জাহাজে আমাদের বন্ধ্যা বনের অতি নিকটে এসে গেছি। ভোর হবার পূর্বেই আমরা আশ্রমে পৌঁছবো আশা করি।
হরশঙ্করের কথা সত্য হলো।
অবিরাম গতিতে মোটর বোটখানা চালিয়ে হরশঙ্কর ভোর হাবার কিছু পূর্বে বন্ধ্যা বনের ধারে এসে নেমে পড়লো।
হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো বনহুর। পথে দিনের আলো ফুটে উঠলো আত্মগোপন করায় অসুবিধা হতো তার।
হরশঙ্করের সঙ্গে এগিয়ে চললো তার অনুচরদ্বয় ও নূরী। পিছনে আলখেল্লাধারী বনহুর।
সুন্দর বনটা, কোথাও এতোটুকু আগাছা বা ঝোপঝাড় নেই। মনে হচ্ছে কেউ যেন গোটা বনটা পরিস্কার করে রেখেছে।
এই সেই বন।
যে বনে নূরী মনিকে নিয়ে প্রথম পদার্পণ করেছিলো, যে বনে সন্ন্যাসী বাবাজী তাকে আশ্রয় দিয়েছিলো এই সেই বন-বন্ধ্যা এর নাম।
বেশ কিছু দূর এগুনোর পর হরশঙ্কর পূর্বদিকে অগ্রসর হলো।
থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো অন্যান্য অনুচারগণ ও নূরী। অগত্যা বনহুরও দাঁড়িয়ে পড়লো।
হরশঙ্কর আর এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে গহণ বনের অন্তরালে অদৃশ্য হলো।
অনুচরদ্বয় নূরীসহ অগ্রসর হলো পশ্চিমে।
বনহুরও তাদেরকে অনুসরণ করলো।
০৭.
মনিরা সন্তানকে ফিরে পেয়ে খুশীর অন্ত নেই তার। এটাই যে তার নূর তাতে কোন সন্দেহ নেই। এক বছরের শিশু নূরকে যখন হারিয়েছিলো মনিরা তখন নূরের শিশু মুখ খানা আকাঁ ছিলো মায়ের হৃদয়পটে। সেদিন খেলা দেখতে গিয়ে মনিরার কিছুমাত্র ভুল হয়নি নূরকে চিনতে।
এতো সহজেই মনিরার তার নূরকে পাবে কোনদিন কল্পনাও করতে পারেনি। মনিরা ভেবেছিলে নূরকে কপালিক সন্ন্যাসিগণ হত্যা করে ফেলেছে। আর কোনদিন তাকে ফিরে পাবে না। ঐ সুন্দর ফুটফুটে মুখখানা আর দেখতে পাবে না কোনদিন। কিন্তু সবই খোদার ইচ্ছা—তিনি কি না পারেন। তার ইচ্ছায় আজ মনিরা তার হারানো রত্ন ফিরে পেলো। হাজার হাজার শুকরিয়া করে মনিরা খোদার দরগায়।
শিশু নূরকে পেয়ে শুধু মনিরাই খুশী হয়নি, খুশী হয়েছেন মরিয়ম বেগম। তার সুপ্ত হৃদয়ে যেন আবার অনন্দের বান বয়ে চলছে। খুশীর অন্ত নেই। চৌধুরী বাড়ী বহুদিন পরে আবার শিশুর কলরবে মুখর হয়ে উঠেছে।
বৃদ্ধ সরকার সাহেবও আজ আনন্দে আত্মহারা।
চৌধুরী বাড়ীর সুখ-দুঃখের সঙ্গে তিনি যে নিবিড়ভাবে জড়ানো। এ বাড়ীতে যখন দুঃখ আর বেদনার ছায়া ঘনিয়ে আসে, বৃদ্ধ সরকার সাহেবের মন তখন ব্যথায় কুঁকড়ে যায়, মুখের সাদা হাস্যময় ভাব বিলুপ্ত হয় কোন অজানার অন্ধকারে। আবার যখন চৌধুরী বাড়ীতে খুশীর বান ডেকে যায় তখন সরকার সাহেবের মুখে হাসি ফুটে উঠে, আনন্দে তিনি ছোট্ট শিশুর মতই উহৃল্ল হয়ে উঠেন।
নূরকে পেয়ে বৃদ্ধ সরকার সাহেব ছোট্ট শিশুর মতই আনন্দে মেতে উঠেন।
এতো সুখেও এ বাড়ীতে যেন এতোদিন কোন সুখ ছিলোনা। অভাব ছিলোনা কোন জিনিসের, তবু যেন সদা অভাব কিসের অনুভব করতো বাড়ীর সবাই।
সারাটা দিন চৌধুরী বাড়ীর হিসেব-নিকেশ নিয়ে এতোটুকু অবকাশ ছিলোনা সরকার সাহেবের—আজ এতো কাজের মধ্যেও প্রচুর সময় তিনি নূরকে নিয়ে কাটিয়ে দেন। নূরও সরকার সাহেবকে পেলে কোন কথা নেই, আনন্দে আত্মহারা হয় সে।
নূর সরকার সাহেবকে দাদু বলে ডাকে।
ড্রইংরুমে দাদু আর নাতি মিলে চলতো কত হাসি আর গল্প।
