বনহুর চট করে সরে দাঁড়ালো এক পাশে।
অলখেল্লাধারী হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলো ভূতলে।
বনহুর সেই দন্ডে চেপে বসলো আলখেল্লাধারীর বুকের উপর। বাম হতে টিপে ধরলো ওর গলা, দক্ষিণ হস্তে গুলীভরা রিভলভারখানা আলখেল্লাধালীর কণ্ঠনালীতে চেপে ধরে আলখেল্লাধারীকে কাবু করে ফেললো।
বনহুরের সঙ্গে পেরে উঠা সহজ ব্যাপার নয়।
বনহুরের বাম হাতখানা আলখেল্লাধারীর গলায় সাড়াশীর মত এটে বসলো।
বনহুর এবার দুই হাতে টিপে ধরলো ওরা গলা।
খানিকক্ষণ ছট ফট করে নীরব হয়ে গেলো আলখেল্লাধারীর দেহটা।
এবার বনহুর দ্রুতহস্তে আখেল্লাধারীর মুখের আবরণ উন্মোচন করে ফেললে সঙ্গে সঙ্গে অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো–শয়তান, ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরী সেজে খুব বাহাদুরী করছিলে।
এবার বনহুর দ্রুত হস্তে মৃত মুঙ্গেরীর শরীর থেকে ঐ ড্রেস খুলে নিয়ে নিজে পরে নিলো। ক্যাবিনের আয়নায় দাঁড়িয়ে দেখলো, না আর তাকে চিনবার কোন উপায় নেই।
বনহুর এবার রিভলভার পকেটে রেখে ক্যাবিনের একপাশে এগিয়ে গেলো। সম্মুখেই একটা চাকার আকারে জিনিস নজরে পড়লো তার। বনহুর দ্রুত চাকার মত জিনিসটায় চাপ দিলো, সঙ্গে সঙ্গে খানিকটা তক্তা খসে পড়লো। ভিতরে একটা খুপড়ীর মত কুঠি জীর্ণ শীর্ণ অবস্থায় মেঝেতে পড়ে রয়েছে একটি লোক। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চোখ দুটো কোঠরাগত; বুকের হাড় কখানা যেন গোনা যাচ্ছে। বনহুর ভূতলে লুণ্ঠিত লোকটার পাশে হাটু গেড়ে বসে ক্ষিপ্রহস্তে ওর শরীরের বাধন মুক্ত করে দিলো। লোকটা ক্ষীণ কণ্ঠে বললো-পানি–
বনহুর পাশের ক্যাবিনে প্রবেশ করে এক গ্লাস পানি নিয়ে তাড়াতাড়ি ফিরে গেলো লোকটার পাশে। হাতে দিয়ে বললো-খাও।
এক নিশ্বাসে গ্লাসের পানিটুকু পান করে বললো—শয়তান, কেনো তুমি আমাকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছো? আমাকে তার চেয়ে হত্যা করো।
বনহুর বুঝতে পারলো, আলখেল্লাধারী একে এই কুঠরিতে আটকে রেখে ভয়নক কষ্ট দিয়েছে।
বনহুর লোকটাকে বললো এবার আর তোমাকে কষ্ট দেবোন, তুমি মুক্ত।
লোকটা হাত-পায়ের বন্ধন মুক্ত হওয়ায় অনেকটা শান্তি পাচ্ছিলো। হাতে এবং পায় হাত বুলিয়ে বললোসত্যি তুমি আমাকে মুক্ত করে দিলে?
হাঁ, ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরী আপনি মুক্ত। আর সেই শয়তান নকল মুঙ্গেরীকে পাপের প্রায়শ্চিত্ত দিয়েছি।
তাহলে তুমি—তুমি কে?
আমি দস্যু বনহুর।
দস্যু বনহুর।
হাঁ, ভয় পাবার কিছু নেই।
কিন্তু–
আমি এই মুহূর্তে জাহাজ ত্যাগ করে চলে যাচ্ছি।
তুমি–চলে–যাচ্ছো? টেনে টেনে কথাটা বললেন মিঃ মুঙ্গেরী।
হাঁ বন্ধু। কথা শেষ করে বনহুর হাতঘড়িটার দিকে তাকালোদুটো বাজতে মাত্র কয়েক মিনিট বাকী।
বনহুর জাহাজের পিছন ডেকে এসে দাঁড়ালো।
দেখতে পেলো, একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। আলখেল্লাপরা বনহুরকে দেখে সরে এলো দ্রুত গতিতে তারপর বললো—এতো বিলম্ব হলো কেন তোমার?
কণ্ঠস্বরে বনহুর চিনতে পারলো এটাই সেই বংশীবাদক-নূরীর নৃত্যকালে বাঁশী বাজাতো।
বনহুর চাপা কণ্ঠে বললো—হঠাৎ মিঃ সেন অজ্ঞান হয়ে পড়ায়—
তাহলে সিগারেটের বিষক্রিয়া এতোক্ষণে শুরু হলো?
হাঁ, সেই রকম মনে হচ্ছে।
বেটা ঘুঘু দেখেছিলো কিন্তু ফাঁদ দেখেনি। আমার পিছনে লেগেছিলো সে, লোভ-মেয়েটিকে হস্তগত করা।
আমারও সেই রকম মনে হয়েছিলো। আচ্ছা সর্দার—
হেসে উঠলো ইরশঙ্কর—তুমি আবার সর্দার বলা শিখলে কবে থেকে?
আলখেল্লার মধ্যে বনহুর বিব্রত বোধ করলো। সর্বনাশ তার কথাটা তাহলে ভুল হয়েছে। তাড়াতাড়ি বললো বনহুর–আমি এখন থেকে সর্দার বলেই ডাকাবো।
কেনো হে, তুমি কি আমাকে সম্মান দেখাচ্ছো? পূর্বে যেমন হরশঙ্কর বলে ডাকতে তাই ডেকো। কিন্তু আর বিলম্ব নয়, সময় হয়ে এসেছে।
এদিকের সব কাজ ঠিকভাবে হয়ে গেছে তো? মানে ওকে বোটে উঠানো হয়েছে? কথাগুলো অতি সাবধানে বললো বনহুর।
হয়েছে। এদিকের সব কাজ শেষ-শুধু তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।
তাহলে চলো বন্ধু।
আজ তোমাকে বেশ খুশী খুশী লাগছে কেশব। এমন না হলে চলে!
বললো আলখেল্লাধারী বনহুর—এতোক্ষণ মিঃ সেন হয়তো শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।
তাই বুঝি এতো আনন্দ?
হাঁ হরশঙ্কর কিন্তু এখন আমাদের জাহাজ ত্যাগ না করলেও চলতো। পথের কাঁটা দূর হলো তো?
এরি মধ্যে ভুলে গেলে সব কথা। আসছে পৃর্ণিমায় আমার যোগিণী পূজা আছে। তার পূর্বে আমাকে আশ্রমে পৌঁছতে হবে। না হলে আমার যাদুর মায়াচক্র নষ্ট হয়ে যাবে।
তাহলে যাত্রা শুরু না করলেই পারতে হরশঙ্কর। কি দরকার ছিলো এ জাহাজে এসে?
হেসে উঠলো হরশঙ্কর–তুমি এমন হয়ে গেলে কবে থেকে, তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? জাহাজে আসার উদ্দেশ্যটাও ভুলে গেছো দেখছি।
ওঃ এবার সব মনে পড়েছে। চলো আর দেরী করা ঠিক নয়। মনে পড়ছে বললো বটে বনহুর, কিন্তু কেনো শয়তান হরশঙ্কর এ জাহাজে আশ্রয় নিয়ে এতোদূর এসে আবার ফিরে যাচ্ছে সেটা এখনও সে বুঝতে পারলোনা।
সেটা বুঝলে মোটর বোটে বসে।
হরশঙ্কর নিজে ইঞ্জিনে গিয়ে বসলো।
বোটের মধ্যে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে একটি নারীমূর্তি। বনহুর বুঝতে পারলো-নূরী ওটা। ওর দুপাশে দুটি বলিষ্ঠকায় লোক বসে। আলখেল্লাধারী বনহুর বসলো এক পাশে।
মোটর বোটখানার তলায় স্তুপকার নানা ধরনের মূল্যবান সামগ্রী। স্যুটকেস, ব্যাগ, নানা রকমের আরও কত কি রয়েছে। বনহুর বুঝতে পারলো-এগুলি চুরি করার জন্যই শয়তান হরশঙ্কর এ জাহাজে আশ্রয় নিয়ে লোককে নাচ-গান শুনিয়ে মাতিয়ে রাখতো। আসল উদ্দেশ্য হলো এ সব লুটে নেওয়া।
