ক্যাবিনের সম্মুখ ভাগ দিয়ে গেলে নিশ্চয়ই সে আলখেল্লাধারী তাকে দেখে ফেলবে বা দেখে ফেলতে পারে। কাজেই বনহুর এই পথে নূরীর ক্যাবিনের দিকে এগুচ্ছে। নূরীর ক্যবিনে পৌঁছতে আরও দুটি ক্যাবিন পার হয়ে তবে যেতে হবে। হঠাৎ বনহুরের কণ্ঠে ভেসে আসে চাপা গম্ভীর কণ্ঠস্বর। দুজন পুরুষ গুরুগম্ভীর গলায় কোনকিছু আলোচনা করছে বলে মনে হলো।
বনহুর অতি সাবধানে রেলিংএর উপর দিয়ে ক্যাবিনটার পিছনে শার্শীর পাশে এসে পৌঁছলো। একবার নীচে তাকিয়ে দেখে নিলো সে। নীচে অসীম জলরাশি গর্জণ করে ছুঁটে চলেছে। জাহাজের ইঞ্জিনের ঝক ঝক শব্দ আর ঝাকুনি বনহুরের দেহে এবং মনে এক অদ্ভুত আলোড়ণ সষ্টি করে চলেছিলো। অতি মনোযোগ সহকারে কান পাতলো বৃনহুর পিছনে শার্শীর ফাঁকে শুনতে পেলো কে যেন গম্ভীর চাপা গলায় বলছে–বন্দরে পৌঁছবার আগেই ওকে সরাতে হবে। অন্য আর একটি কন্ঠ–বোট নৌকাখানা তাহলে জাহাজের পিছনে অংশে বেঁধে রাখলেই চলবে। পূর্বের কণ্ঠ হ পিছনেই বোট-নৌকা বাধা থাকবে। তারপর গভীর রাতে মেয়েটিকে নিয়ে বোটে চাপতে হবে। দ্বিতীয় ব্যক্তির গলায় আওয়াজ–মেয়েটি সজ্ঞানে এভাবে বোটে চাপতে রাজি হবেনা। অন্য কণ্ঠ—না, ওকে অজ্ঞান অবস্থায় নিতে হবে বুঝলে? কাল রাত দুটো মনে রেখো।
বনহুর বুঝতে পারলো, নূরীকে সরানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। নিশ্চয়ই তার গতিবিধি ওরা ধরে ফেলেছে। জাহাজ বন্দরে পৌঁছার পূর্বেই একাজ তারা সমাধা করবে।
বনহুরের কানে এলো আবার প্রথম ব্যক্তির কণ্ঠ-লোকটাকে আমার প্রথম থেকেই কেমন সন্দেহ হয়েছিলো। মায়ার নাচ দেখেই লোকটা কেমন। যেন গম্ভীর হয়ে পড়লো।
বনহুরের ঠোঁটের কোণে এবার একটা হাসির ক্ষীণ রেখাফুটে উঠলো। আর শোনার কিছু নেই। বনহুর অতি সাবধানে এগুলো এবার নিজের ক্যাবিনের দিকে। আজ আর চিন্তার কিছু নেই,কালকের জন্য তাকে তৈরী হতে হবে।
ক্যাবিনে ফিরে এসে সিগারেট কেসটায় সিগারেট ভর্তি করে টেবিলে রাখলো বনহুর, তারপর শয্যায় শুয়ে পড়লো নিশ্চিন্ত মনে।
পরদিন বেলা অনেক হয়ে গেছে তবু ঘুম ভাংছেনা বনহুরের।
ক্যাবিনের দরজায় এসে দাঁড়ালো ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরী মৃদু টোকা দিয়ে ডাকলেন—মিঃ সেন, মিঃ সেন?
বনহুর পাশ ফিরে চোখ বন্ধ করলো।
পুনরায় ক্যাবিনের দরজায় টোকা পড়লো—মিঃ সেন?
দরজায় ধাক্কা দিতেই খুলে গেলো। মুঙ্গেরী ক্যাবিনের মধ্যে প্রবেশ করে দ্রুত এগিয়ে গেলো শয্যার দিকে মিঃ সেন, মিঃ সেন? গলায় তাঁর উৎকণ্ঠা ভাব।
ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরীর ধাক্কায় গা মোড়া দিয়ে পাশ ফিরে উঠে বসলো বনহুর হাই তুলে বললো-ক্যাপ্টেন।
গুডমর্নিং, মিঃ সেন।
গুডমর্নিং, বড়ড় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বসুন ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরী, বসুন।
মুঙ্গেরী আসন গ্রহণ করেন।
বনহুর শয্যা ত্যাগ করে সোফায় এসে বসলো। টেবিল থেকে সিগারেট–সেটা হাতে তুলে নিয়ে বাড়িয়ে ধরলো মিঃ মুঙ্গেরীর দিকে–নিন।
থ্যাঙ্ক ইউ। সিগাটে আমার কাছেই আছে। কথা শেষ করে নিজের পকেট থেকে সিগাটে-কেসটা বের করে একটা সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করলেন ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরী।
বনহুর একটা সিগারেট নিজের কেস থেকে নিয়ে ঠোঁটের ফাঁকে চেপে ধরলো।
ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরীর মুখমন্ডল ক্ষণিকের জন্য বিবর্ণ হলো যেন, পর মুহূর্তেই নিজকে সামলে নিয়ে সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে ম্যাচের কাঠিটা বাড়িয়ে ধরলো বনহুরের ঠোঁটে চেপে ধরা সিগারেটটার দিকে।
বনহুর একটু নীচু হয়ে নিজের সিগারেটটা ক্যাপ্টেনের বাড়িয়ে ধরা ম্যাচে কঠি থেকে অগ্নি সংযোগ করে নিলো। এক মুখ ধোয়া ছেড়ে বললো বনহুর-আজ গোটারাত ঘুমিয়েছি ক্যাপ্টেন–আপনি?
আমিও ঘুমিয়েছি মিঃ সেন।
সুখনিদ্রা —কি বলেন?
হাঁ মিঃ সেন। কথার ফাঁকে ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরী তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকালো বনহুরের মুখের দিকে।
বনহুর সিগারেট থেকে ধুমরাশি নিক্ষেপ করলো সামনের দিকে।
ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরী উঠে দাঁড়ালো—আমি একটু কাজে যাচ্ছি মিঃ সেন, পুনরায় অর্ধঘন্টা পর ফিরে আসছি।
আচ্ছা ক্যাপ্টেন।
গুডবাই। অস্ফুট কণ্ঠে বললো বনহুর—গুড বাই।
০৬.
গভীর রাত।
বনহুর বার বার হাতঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। একবার সে প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে রিভলভারের অস্তিত্ব অনুভব করে নিলে। আজ আকাশের অবস্থা খুব ভাল নয়। সন্ধ্যার পর থেকে কেমন একটু ঝুপঝুপ করে বৃষ্টি পড়ছে। ঝড় তুফান না হলেও দুর্যোগপূর্ণ রাত এটা।
সমস্ত জাহাজটা নিস্তব্ধ নিঝুম।
জাহাজের একটানা ঝক ঝক শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দই শোনা যাচ্ছেন। জাহাজের ঝক ঝক শব্দের মধ্যে তলিয়ে গেছে বৃষ্টির ঝুপ ঝাপ শব্দটা।
বনহুর ক্যাবিন থেকে বেরিয়ে এলো বাইরে।
অতি সন্তর্পণে এগিয়ে চললো পিছনে ডেকের দিকে।
কেউ যেন তাকে দেখে না ফেলে এইভাবে অতি সাবধানতার সঙ্গে আত্মগোপন করে চলেছে বনহুর।
ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরীর ক্যাবিনের সম্মুখে এসে থামলো।
দক্ষিণ হাতখানা প্যান্টের পকেটে প্রবেশ করিয়ে বের করে আনলো গুলীভরা রিভলভারখানা তারপর অতি দ্রুত প্রবেশ করলো ক্যাবিনের মধ্যে।
ক্যাবিনের মেঝে তখন দাঁড়িয়ে আছে জমকালো পোষাক পরা একটি মূর্তি।
বনহুরকে উদ্যত রিভলভার হাস্ত ক্যবিনে প্রবেশ করতে দেখে আলখেল্লাধারীর চোখ দুটো আগুনের, ভাটার মত ধক করে জ্বলে উঠলো। মুহূর্ত বিলম্ব না করে ঝাপিয়ে পড়লো আলখেল্লাধারী বনহুরের উপর।
