হরশঙ্কর একবার কটমট করে বনহুরের দিকে তাকিয়ে চলে গেলো সেখান থেকে।
০৫.
যে কোন বন্দরে জাহাজ পৌঁছানোর পূর্বেই নূরীকে উদ্ধার করতে হবে, না হলে শয়তান ওকে নিয়ে উধাও হবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু যতক্ষণ না নূরী স্বাভাবিক জ্ঞান ফিরে পেয়েছে ততক্ষণ তাকে রক্ষা করবার কোনো উপায় নেই। এ কদিন বনহুর নূরীকে, আরও আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু সব ব্যর্থ হয়ে গেছে নূরী বনহুরকে আজও চিনতে পারেনি।
এক সপ্তাহ হলো জাহাজ আন্দাম বন্দরে থেকে যাত্রা করেছে। এর মধ্যে কোন বন্দরে জাহাজ নোঙ্গর করেনি। বনহুর সতর্ক দৃষ্টি সব সময় হরশঙ্কর ও নূরীকে অক্টোপাশের মত ঘিরে রেখেছে। এমনকি বনহুরের রাতের নিদ্রা অন্তর্ধান হয়েছে। সদা-সর্বদা সে সজাগ রয়েছে কোন সময় যেন শয়তান লোকটা নূরীকে নিয়ে পালাতে না পারে।
বনহুরের শ্যেন্য দৃষ্টি নূরী এবং হরশঙ্করের উপরে যেমন রয়েছে তেমনি হরশঙ্করও বনহুরকে সদা লক্ষ্য রেখে চলেছে। বনহুরের আচরণ তার কাছেও সন্দেহজনক বলে মনে হয়েছে। জাহাজে কত না লোক আছে–কেউ তো তাকে এ ভাবে ফলো করে না বা তার কার্যকলাপে কোন রকম আপত্তি করে না। কিন্তু ঐ যুবকটা কেনো তার সঙ্গে এমনভাবে লেগে রয়েছে। হরশঙ্করও কম লোক নয় সেও ওকে দেখে নেবে।
সেদিন রাতে ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরী যাত্রিগণকে জানিয়ে দিলেন আর দুদিন পর জাহাজ কাংঙ্গেরী চাই বন্দরে পৌঁছবে তারপর সেখানে চব্বিশ ঘন্টা অবস্থান করার পর পুনরায় লুইয়া বন্দর অভিমুখে যাত্রা করবে কাংঙ্গেরী।
বনহুর বুঝতে পারলোকান্দাই পৌঁছতে কাংঙ্গেরীর এখনও একমাসের বেশী সময় লাগবে। কিন্তু কান্দাই পৌঁছবার পূর্বেই নূরীকে উদ্ধার করে নিতে হবে।
হঠাৎ একটা শব্দে বনহুরের চিন্তাস্রোতে বাধা পড়লো। রাত এখন দুটোর বেশী হবে। বনহুর নিজের ক্যাবিনে বসে কাঁচের শার্শীর ফাঁকে তাকিয়ে ছিলো ডেকের ওদিকে যেখান থেকে নূরীর কক্ষ দেখা যায়। বনহুর কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলো। শব্দটা তারই ক্যাবিনের দরজার বইরে থেকে আসছিলো। বনহুর বুঝতে পারলে কেউ তার ক্যাবিনের দরজা বাইরে থেকে খোলার চেষ্টা করছে।
মুহূর্ত বিলম্ব না করে বনহুর নিজের শয্যায় এসে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লো। চাদরের ফাঁকে চোখ দুটি সে সজাগ করে রাখলো। দক্ষিণ হাতখানা বালিশের পাশে রইলো যেখানে রয়েছে বনহুরের জমকালো রিভলভার খানা।
ক্যাবিনের দরজা খুলে গেলো।
অতি লঘু পদক্ষেপে কক্ষে প্রবেশ করলো একটা ছায়ামূর্তি সমস্ত শরীর তার কালো আলখেল্লায় ঢাকা। বনহুর চাদরের নীচে চমকে উঠলো, এই আলখেল্লাধারীকেই সে একদিন জাহাজের ডেকে আত্মগোপন করে বেরাতে দেখেছে। কি অভিসন্ধি নিয়ে তার ক্যাবিনে প্রবেশ করেছে এই ছায়ামূর্তি! বনহুর আপন মনে একটু হাসলো।
লোকটা সতর্ক চোখে তাকালো শয্যার দিকে, তারপর অতিলঘু পদক্ষেপে এগিয়ে গেলো টেবিলের পাশে। আলখেল্লাধারী এবার অতি সাবধানে টেবিলে থেকে সিগারেট কেসটা তুলে নিলো হাতে-তারপর কি যেন করলো লোকটা সিগারেট কেসটা পুনরায় টেবিলে রেখে বেরিয়ে গৈলো বাইরে।
বনহুর সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসলো। ইচ্ছে করলে আলখেল্লাধারী যেই হোক তাকে কাবু করার তার পক্ষে কোনই কষ্টকর ছিলোনা, কিন্তু তাকে ধৈর্য ধরতে হলো, কাজ এখনও শেষ হয় নাই।
লোকটা ক্যাবিন ত্যাগ করতেই বনহুর শয্যা ছেড়ে নেমে দাঁড়ালো। সিগারেট—কেসটা হাতে তুলে নিয়ে একবার দেখলো একটা ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটে উঠে মিলিয়ে গেলো বনহুরের ঠোঁটের কোণে। সিগারেট কেসটা : প্যান্টের পকেটে রেখে দ্রুত সেও ক্যাবিনের বাইরে বেরিয়ে এলো, সম্মুখে তাকাতেই দেখলো-ছায়ামূর্তি দ্রুত সম্মুখের একটা ক্যাবিনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
বনহুর আর একদন্ড দেরী না করে রেলিং এর আড়ালে আত্মগোপন করে আলখেল্লাধারীকে অনুসরণ করলো।
একি! এ যে ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরীর ক্যাবিনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ব্যাপার কি! তাহলে কি মুঙ্গেরীকেও হত্যা করবার চেষ্টা চলেছে? ক্যাবিনের নিকটে এসেই আলখেল্লাধারী যেন হাওয়ায় মিশে গেলো।
বনহুর আড়ালে দাঁড়িয়ে ভাবলো–তার চোখেও ধুলো দিলো, এমন জন। এই আলখেল্লাধারী। কিন্তু ততক্ষণ বা কদিন বনহুরের দৃষ্টির আড়ালে আত্মগোপন করে থাকবে?
বনহুর ফিরে এলো নিজের ক্যাবিনে।
এবার বড় লাইটটা জেলে সিগারেটকেসটা হাতে তুলে নিলো বনহুর। একটা সিগারেট হাতে তুলে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগলো–না, সিগারেটগুলি সম্পূর্ণ নিখুঁত রয়েছে। কিন্তু এ সিগারেটগুলি যে তার নিজস্ব সিগারেট নয় তার বেশ বুঝতে পারলো বনহুর। এগুলো নিশ্চয়ই কোন মারাত্মক বিষ দ্বারা তৈরী তাতে কোন সন্দেহ নেই। এর একটা সিগারেট পান করলেই মৃত্যু তার অনিবার্য।
বনহুর সিগারেটগুলি সিগারেটকেস থেকে বের করে নিক্ষেপ করলো কাছের শার্শী দিয়ে সাগরবক্ষে। তারপর ক্যাবিনের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে শার্শী খুলে বেরিয়ে এলো বাইরে। ডেকের রেলিংএর রড এগুলো—একটু পা ফসকে গেলেই অথৈ জল রাশি। নীচেই ইঞ্জিনের দাঁতওয়ালা চাকা, একবার যদি পড়ে যায় তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিনের চাকার মধ্যে দেহটা নিষ্পেষিত হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। বনহুর অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে রেলিং বেয়ে এগুতে লাগলো। যেমন করে হোক নূরীর কক্ষে তাকে পৌঁছতে হবে।
