যাত্রীদের হই-হুল্লোড় আর জাহাজের ঝকঝক শব্দ মিলে একটা অদ্ভুত শব্দের সৃষ্টি করে চলছিলো।
ক্রমান্বয়ে রাত বেড়ে আসে।
জাহাজ এখন সাগরবক্ষে এসে পড়েছে।
যাত্রিগণ স্ব স্ব স্থান বেছে নিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে পড়ায় তেমন হই-চই আর নেই। তবু বেশী জনতার কলকণ্ঠের একটা প্রতিধ্বনি জাহাজটাকে মুখর করে রেখেছিলো।
বনহুর অর্ধদগ্ধ সিগারেটটা এ্যাসট্রেতে নিক্ষেপ করে আর একটা সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করতে গেলো, ঠিক সেই মুহূর্তে একটা নুপুরের শব্দ ভেসে এলো তার কানে; নুপুরের শব্দের সঙ্গে একটা বাঁশীর সুর।
বনহুর একমুখ ধুয়া সম্মুখের দিকে ছুড়ে দিয়ে সোফায় লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লো। তারা ভরা আকাশের খানিকটা অংশ ভেসে ভেসে সরে যাচ্ছে তার চোখের সম্মুখ দিয়ে কাঁচের শার্শী পথে। আনমনে চেয়ে আছে সে।
বাঁশীর সুরের সঙ্গে নুপুরের আওয়াজ এখন আরও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। সঙ্গে আরও কিছু শব্দ ভেসে আসছে জনগণের করতালি আর হাস্যধ্বনি।
বনহুর নিশ্চিন্ত মনে ধূম পান করে চলেছে।
ডেকে কোন নর্তকী হয়তো নাচ দেখাচ্ছে, ভাবলো বনহুর। বেশ কিছুক্ষণ হলো নুপুরের শব্দের সঙ্গে বাঁশীর আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে জনগণের হর্ষধ্বনি আর করতালি।
নিজের অজ্ঞাতেই বনহুর সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো, এগিয়ে চললো ডেকের দিকে। দক্ষিণ হস্তের আংগুলের ফাঁকে তখনও অর্ধদগ্ধ একটী সিগারেট। তাকিয়ে দেখলো বনহুর সম্মুখের দিকে। ডেকের উজ্জ্বল আলোতে নজরে পড়লো কতকগুলি লোক ডেকের দক্ষিণ দিকে গোলাকার ভাবে দাঁড়িয়ে কিছু দেখছে।
বনহুর থমকে দাঁড়ালো, যাবে কিনা ওখানে ভাবছে। এমন সময় পাশে এসে দাঁড়ালো জাহাজের ক্যাপ্টেন মিঃ মুঙ্গের। বনহুরকে সম্বোধন করে বললেন—হ্যালো মিঃ সেন, চলুন নাচ দেখবেন।
দস্যু বনহুর এ জাহাজে মিঃ চন্দ্রসেন নামে নিজকে পরিচিত করেছিলো। ক্যাপ্টেনের কথায় হেসে বললো-ধন্যবাদ, চলুন।
ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরের সঙ্গে বনহুর এগিয়ে চললো ডেকের দিকে।
জাহাজ তখন সীমাহীন জলরাশি অতিক্রম করে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে কোন অজানার পথে। চারিদিকে শুধু জল আর জল, স্থলের চিহ্নমাত্র নেই কোথাও।
তারা ভরা আকাশ।
সপ্তমীর চাঁদ ডুবে গেছে কিছুক্ষণ আগে।
জনতামন্ডলীর পাশে এসে ঘাড় উঁচু করে উঁকি দিলো বনহুর—একটি নর্তকী এদিকে পিছনে ফিরে নাচছে। অপূর্ব অদ্ভুত সে নাচ। একটি লোক বাঁশী বাজাচ্ছে, শরীরে ঢিলা পাজামা আর পাঞ্জাবী মাথায় মস্তবড় একটা পাগড়ী বাধা। লোকটার বাঁশীর সুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচছে নর্তকী। এতোটুকু শিথিলতা নেই সেই দুটি চরণ যুগলে।
বনহুর অবাক হয়ে নর্তকীর পা দুখানা লক্ষ্য করছিলো। লোকটার বাঁশীর সুরে যেন কোন যাদু আছে, যার জন্য নর্তকীর পা দুখানা যন্ত্রের মত দ্রুত ভাবে চলছিলো। আশ্চর্য এ নাচ।
হঠাৎ নর্তকী ঘুরে নাচতে লাগলো।
সঙ্গে সঙ্গে বনহুর অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো-নূরী! দুচোখে তার অতীব বিস্ময়। .
ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরী দাঁড়িয়ে ছিলেন বনহুরের পাশে, তিনি মিঃ সেনকে হঠাৎ নূরী শব্দ উচ্চারণ করতে দেখে এবং তার মুখভাব লক্ষ্য করে অবাক হলেন,বললেন-আপনি ওকে চেনেন?
যদিও বনহুর নূরীকে দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন তবু চট করে নিজকে সংযত করে নিয়ে বললো—নাচনেওয়ালীকে এর পূর্বে আর একবার দেখেছিলাম।
ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরী হেসে বললেন–ও।
নূরী তখনও চঞ্চল চরণে নেচে চলেছে। বংশীবাদকের বাঁশীর সুরে তার চরণ যুগল যেন আরও দ্রুত হয়ে উঠছিলো।
বনহুরের মুখমন্ডল গম্ভীর হয়ে উঠলো। নূরী বেঁচে আছে; আনন্দিত হওয়ার চেয়ে ক্রুদ্ধ হলো সে বেশী। নূরী নর্তকী হয়ে পথে-ঘাটে নেচে বেড়াচ্ছে-ছিঃ ছিঃ ছিঃ এর চেয়ে ওর মৃত্যু হলেও খুশী হতো সে। বনহুর তাকালো বংশীবাদকের মুখের দিকে। নরপিশাচের মতই দেখতে লোকটা। লম্বা-বিরাট দেহ; মস্ত মাথা, লম্বা নাক, মস্ত মস্ত একজোড়া গোঁফ, গোল গোল দুটি চোখ, কেমন শয়তানী ভরা চাহনী। বনহুরের ভ্রু কুঞ্চিত হয়ে উঠলো। আর দাঁড়াতে পারলো না সে, ফিরে এলো নিজের কামরায়।
কিছুক্ষণ পূর্বেও বনহুরের মনোভাব স্বাভাবিক ছিলো। হাজার ব্যথাও তাকে একেবারে চুর্ণ-বিচুর্ণ করে দিতে পারেনি। হঠাৎ নূরীকে এভাবে দর্শন করায় বনহুর যেন সত্তা হারিয়ে ফেললে। সে ভাবতেও পারেনি–নূরী একজন নাচনে ওয়ালী হতে পারে।
ক্যাবিনের মেঝেতে ক্রুদ্ধভাবে পায়চারী করতে লাগলো বনহুর। মাঝে মাঝে অধর দংশন করছে, নূরীকে সে এভাবে দেখবে আশা করেনি কোন দিন। নূরীর প্রেমকে সে এতো দিন অতি নির্মল সচ্ছবলে জেনে এসেছে। নূরীর ভালবাসা তার কাছে ফুলের মতই পবিত্র মনে হয়েছে, আর সেই নূরী কিনা–বনহুর দুহাতে নিজের মাথার চুল টেনে ছিড়তে লাগলো।
ডেকের বুকে নূরীর নুপুরের শব্দ বনহুরের কানে গরম সীসা ঢেলে দিচ্ছে যেন। বনহুর দুহাত কান চেপে ধরলো।
রাত বেড়ে আসছে।
এক সময় গোটা জাহাজটা সুপ্তির কোলে ঢলে পড়লো। নীরব হয়ে এলো যাত্রীদের কলকণ্ঠ। জাহাজের ইঞ্জিনের ঝক ঝক শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দই শোনা যাচ্ছে না।
বনহুর শয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়ালো,বেরিয়ে এলো ক্যাবিনের বাইরে। সমস্ত জাহাজখানা নিস্তদ্ধ, ঘুমিয়ে পড়েছে যাত্রিগণ।
বনহুর অতি সৃন্তর্পণে এগিয়ে চললো। হঠাৎ চমকে উঠলো বনহুর তার অদূরে একটা ক্যাবিনের পাশ কেটে অন্ধকারে আর একটি ছায়ামূর্তি এগিয়ে যাচ্ছে। বনহুর থমকে দাঁড়ালো, লক্ষ্য করলো কে এই লোক। কিন্তু বনহুর আশ্চর্য হয়ে দেখলো–লোকটার আপাদ মস্তক কালো আলখেল্লায় আবৃত। বুঝতে পারলো বনহুর-আলখেল্লাধারী নিশ্চয়ই কোন শয়তান। কোন কুমতলবে সে এগুচ্ছে। বনহুর অনুসরণ করলো আলখেল্লাধারীকে কিন্তু কিছু দূর এগুতেই হঠাৎ তার সম্মুখে এসে দাঁড়ালো ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরী। হাস্য উজ্জ্বল মুখে বললেন—হ্যালো মিঃ সেন।
