মিঃ লাহিড়ী।
আপনার কন্যা মিস জলি আর তার বান্ধবী মিস মলি দস্যু বনহুরের ভয়ে ভীত হয়ে পড়ায় তাদের বাড়ী পৌঁছে দিয়ে গেলাম।
–দস্যু বনহুর।
জলি আর মলির চোখে মুখে বিস্ময় ফুটে উঠলো। মিঃ লাহিড়ী রাগে গস গস করে উঠলেন।
জলি আর মলির মুখে কোন কথা বের হচ্ছে না। দুজন তাকাচ্ছে দুজনার মুখের দিকে।
মিঃ লাহিড়ী বলে উঠলেন—বাইরের কাউকে বিশ্বাস করো না তোমরা। দস্যু বনহুর তোমাদের উপর কোন অন্যায় আচরণ করে নি তো?
মিস জলি বলে উঠলোনা বাবা, তার ব্যবহার অত্যন্ত মধুর ছিলো। আমাদের প্রতি কোন রকম খারাপ ব্যবহার করেনি।
মিঃ লাহিড়ী তখনও রাগে অধর দংশন করছিলেন।
জলি পুনরায় বললো—দস্যু বনহুর অমন হবে তা ভাবতেও পারিনি।
মিঃ লাহিড়ীর কন্যার কথায় কান না দিয়ে তখনই অফিসে ফোন করলেন। জানিয়ে দিলেনদস্যু বনহুর তাদের আশে-পাশেই বিচরণ করে ফিরছে। পুলিশ বাহিনী যেন সদা সজাগ থাকে এবং শহরময় যেন সজাগ করে দেওয়া হয় এ ব্যাপারে।
০৪.
এই ঘটনার পর কেটে গেছে বেশ কয়েকটা দিন।
বনহুর সম্বন্ধে শহরময় নানা আতঙ্ক ভরা ভাবের সৃষ্টি হলেও বনহুর আজও কারো উপর হামলা চালায় নি বা কারো ধনভান্ডার লুটে নেয় নি, কিংবা কারো বুকে ছোরা বসিয়ে রক্তপাত ঘটায় নি।
শান্ত নাগরিকের মতই বনহুর মহানগরের বুকে আত্মগোপন করে রইলো।
শহরবাসীর মন থেকে দস্যু বনহুরের ভীতিভাব সম্পূর্ণ প্রশমিত না হলেও অনেকটা হাল্কা হয়ে এসেছে। সবাই আপন আপন মনে নিজ নিজ কাজ করে চলেছে।
নগরবাসী বনহুর সম্বন্ধে কিছুটা আশ্বস্ত হলেও পুলিশ মহল তাকে নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন রইলো, শহরের নানা স্থানে নানাভাবে সি আই ডি পুলিশ গোপনে অনুসন্ধান করে চললো। কিন্তু এতো করেও তারা বনহুরের সন্ধান পেলোনা।
বনহুর তখন লারফাং হোটেলের দ্বিতল একটি ক্যাবিনে দুগ্ধ ফেননিভ শয্যায় অর্ধশায়িত অবস্থায় দৈনিক পত্রিকাখানা পড়ছিলো। বাম হস্তের আংগুলের ফাঁকে অর্ধদগ্ধ সিগারেট থেকে ক্ষীণ একটি ধুম্র রেখা ঘুরপাক খেয়ে খেয়ে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছিলো।
অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে পত্রিকার পাতায় দৃষ্টি বুলিয়ে যাচ্ছিলো। দস্যু বনহুরের আবির্ভাবে মহানগরে একটা আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিলো। প্রতিটি পত্রিকার পাতায় পাতায় বিরাট আকারে প্রকাশ পেতো বনহুরের আগমন বার্তা।
সমস্ত পত্রিকাখানায় একবার দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে বনহুর স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো। পত্রিকা ওয়ালারা বনহুরের নামে এ কদিনে বেশ দুপয়সা কামিয়ে নিয়েছে। কারণ, দস্যু বনহুরের আবির্ভাব সংবাদ পত্রিকায় এমন একটা আতঙ্ক আনয়ন করেছিলো যার ফলে নগরের প্রতিটি জনগণ সর্বক্ষণ পত্রিকার অপেক্ষায় প্রহর গুণতো। ধনী-দরিদ্র নারী-পুরুষ বিদ্বান-অবিদ্বান সবাই খরিদ করতে একখানা দৈনিক পেপার। দস্যু বনহুরের সংবাদ জানবার জন্য উদগ্রীব হয়ে সবাই পেপার দেখতো।
আজ পত্রিকার পৃষ্ঠায় দস্যু বনহুর সম্বন্ধে কোন তাজা খবর ছিলোনা। বনহুর নিজেও এ কদিন পত্রিকায় তার নামে নানা ধরনের আজগুবি গুজব পড়ে একটা কৌতুক অনুভব করতো, নিজ মনেই হাসতো সে।
বনহুর আজ হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো, যাক পত্রিকাগুলি তাহলে আশ্বস্ত হয়েছে। হঠাৎ বনহুরের নজর চলে গেলো পত্রিকা খানার একটি জায়গায়—আজ সন্ধ্যায় আন্দাম বন্দর থেকে জাহাজ কাংঙ্গেরী কান্দাই অভিমুখে রওয়ানা হচ্ছে। কান্দাই–কান্দাই শব্দটা বনহুরের হৃদয় স্পর্শ করলো, আচম্বিতে মনের পর্দায় ভেসে উঠলো দুটি ব্যাকুল আঁখি উগ্রীব নয়নে তাকিয়ে আছে চৌধুরী বাড়ীর মুক্তাগবাক্ষে। তাকিয়ে তাকিয়ে হতাশ হয়ে যাচ্ছে আঁখি দুটি গন্ড বেয়ে, গড়িয়ে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু। তার মনিরা–বনহুর মনস্থির করে ফেললোআজ সন্ধ্যায় সে আন্দাম থেকে কাংঙ্গেরী জাহাজে কান্দাই এর পথে রওয়ানা দেবে।
সন্ধ্যার পূর্বেই হোটেল লারফাং ত্যাগ করে ট্যাক্সিতে উঠে বসলো দস্যু বনহুর। মহানগর ত্যাগ করতে মনটা তার আজ কেমন যেন আনচান করছিলো। একটা বেদনা বোধ হচ্ছিল তার হৃদয়ে, কোন আপন জনকে যেন ছেড়ে যাচ্ছে সে এই মহানগরের বুকে।
ট্যাক্সি আন্দাম বন্দরে পৌঁছতেই ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে নেমে পড়লো বনহুর।
আন্দাম, বিরাট বন্দর।
অগণিত জাহাজ ভাসমান অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে বন্দরের আশে পাশে। জেটিতে ভিড়ে পঁড়িয়েছে জাহাজ কাংঙ্গেরী। অগণিত যাত্রি জেটির সিঁড়ি বেয়ে এগুচ্ছে জাহাজ অভিমুখে।
ভোঁ বেজে উঠলো।
জেটি ত্যাগ করে কাংঙ্গেরী এগুতে লাগলো গভীর জলের দিকে।
ফার্স্ট ক্লাশ ক্যাবিনের একটি সোফায় গা এলিয়ে বসেছিল বনহুর। সম্মুখের কাঁচের জানালা দিয়ে তাকিয়ে ছিলো সে, ছেড়ে আসা মহানগরীর দিকে।
আন্দাম বন্দর ছেড়ে কাংঙ্গেরী দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতর হয়ে আসছে মহানগরী। উচ্ছল জলরাশি খলখল শব্দে পিছিয়ে যাচ্ছে পিছনের দিকে। এবার বনহুর একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটের ফাঁকে চেপে ধরে অগ্নিসংযোগ করলো।
সন্ধ্যার অন্ধকার এখন কাংঙ্গেরীর বুকে জমাট হয়ে উঠেছে। ক্যাবিনে ক্যাবিনে জ্বলে উঠেছে বৈদ্যুতিক নীলাভ,আলো। যাত্রীরা সব আপন আপন জায়গা বেছে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। দূর দেশের যাত্রী সবাই, বহুদিন তাহাদের কাটাতে হবে এই ভাসমান আবাসে। কাজেই সবাই চায় একটা আরামদায়ক সুখময় স্থান।
