বনহুর হেসে বললো—বড় গরম বোধ করছিলাম।
হাঁ, আজ আবহাওয়াটা বড় সুবিধে নয়। কেমন যেন একটি গুমোট ভাব দেখা দিয়েছে। ঝড় আসতে পারে।
তাই বুঝি আপনি–
না, ঠিক সে কারণে নয়, ইঞ্জিন-মেশিনটা একটু খারাপ বোধ হচ্ছিলো তাই দেখে এলাম। আচ্ছা, চলি মিঃ সেন। কথা শেষ করে ক্যাপ্টেন মুঙ্গেরী চলে গেলো নিজের ক্যাবিনের দিকে।
বনহুর ফিরে তাকালো যে দিকে কিছুক্ষণ পুর্বে সেই আলখেল্লাধারীটিকে দেখতে পেয়েছিলো। কিন্তু কি আশ্চর্য লোকটা যেন হাওয়ায় মিশে গেছে।
বনহুর বিলম্ব না করে ফিরে এলো নিজের কামরায়।
শয্যায় শুয়েও এতোটুকু ঘুম এলোনা বনহুরের চোখে। সব সময় তার কানের কাছে যেন নূরীর চরণের নূপুরধ্বনি ভেসে আসছে। নূরী–নূরী–ছোট বেলা থেকে নূরীকে বনহুর সাথী রূপে পেয়েছিলো। নূরীর প্রেম-ভালবাসা তার মনকে আচ্ছন্ন করতে না পারলেও বনহুর তাকে কোনদিন উপেক্ষা করতে পারেনি। নূরীকে সে অন্তরের অনুভূতি দিয়ে ভালবেসেছে। নূরীর পবিত্র ভালবাসার মধ্যে আত্মসমর্পণ করেছে বনহুর। সেই নূরীকে সে আজ এরূপে দেখবে ভাবতে পারেনি–বনহুর এবার সোজা ডেকের বুকে এসে দাঁড়ালো। অদূরে যে ক্যাবিনটা দেখা যাচ্ছে-নূরী ওটাতেই রয়েছে। একবার ভাবলো বনহুর-সোজা নূরীর ক্যাবিনে প্রবেশ করে বলবে, কেনো-কেনো সে এ পথ বেছে নিয়েছে। এ পথ ছাড়া তার কি আর কোন গতি ছিলো না। রাগে ক্ষোভে অধর দংশন করে বনহুর। উষ্ণ হয়ে উঠে তার ধমনীর রক্ত।
বনহুর ক্যাবিনের শার্শী খুলে প্রবেশ করলো ভিতরে।
অদূরে মেঝেয় কম্বল বিছিয়ে ঘুমিয়ে রয়েছে নূরী। ক্যাবিনের স্বল্পালোকে তাকিয়ে দেখলো নূরীকে।
কতদিন পর নূরীকে দেখছে বনহুর, কিন্তু কোন বিস্ময় তার মনে জাগলোনা, জাগলোনা কোন অনুভূতি। বনহুরের শিরায় শিরায় তখন উষ্ণ রক্তের প্রবাহ।
ক্রুদ্ধ সিংহের ন্যায় বনহুর এগিয়ে গেলো নূরীর পাশে। দাঁতে দাঁত পিষছিলো বনহুর, রাগে তার মাংসপেশীগুলি শক্ত হয়ে উঠছিলো। হাটু গেড়ে
বসে পড়লো নূরীর শয্যার পাশে দুহাত বাড়িয়েটিপে ধরলো নূরীর গলা।
সঙ্গে সঙ্গে নূরী জেগে গেলো চীৎকার করতে গেলো সে। বনহুর দক্ষিণ হস্তে চেপে ধরলো নূরীর মুখ।
নৃরী তাকালো বনহুরের দিকে।
কিন্তু একি! বনহুরকে দেখেও নূরীর চোখে কোন ভাবের পরিবর্তন এলোনা।
নূরীর দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বনহুরের হাত দুখান যেন শিথিল হয়ে এলো। নূরীর কণ্ঠ ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো সে। নূরী নিজের গলায় হাত বুলোচ্ছে এবং তাকাচ্ছে বনহুরের মুখের দিকে-আশ্চর্য! নূরী বনহুরকে দেখে একটা শব্দও উচ্চারণ করলোনা। নূরী যে তাকে চিনতে পেরেছে এমন মনে হলোনা।
বনহুরের মুখেও কোন কথা বের হচ্ছেনা, তবে কি নূরী তাকে চিনতে পারছেনা।
হঠাৎ বলে উঠলো নূরী–কে তুমি?
বিস্মিত বনহুর আরও বিস্মিত হলো, নূরী তাকে তাহলে চিনতে পারেনি। না তার মিথ্যা অভিনয়। বনহুর গম্ভীর চাপা কণ্ঠে দাঁতে দাঁত পিষে বললো-নূরী, তোমাকে এ ভাবে দেখবার পূর্বে তোমার মৃত্যু হলে অনেক খুশী হতাম।
নূরী আশ্চর্য দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে, বনহুরের কথায় তার চোখ দুটো আরও অবাক হলো। সে ওর কথাগুলো ঠিক বুঝে উঠতে পারছেনা।
বনহুর পুনরায় বলে উঠলো-নূরী, আমাকে তুমি থোকা দিতে পারবেনা।
নূরী এবার বলে উঠলো—কে তুমি? এসব কি বলছো?
বনহুর নূরীর কথায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকালো তার মুখের দিকে। তবে কি এ নূরী নয়, নূরীর আকারে অন্য কোন মেয়ে? হয়তো তাই হবে নাহলে এতোক্ষণ তাকে চিনতে পারবেনা—এও কখনও হতে পারে! বনহুর, অবাক নয়ননে নূরীর পা থেকে মাথা অবধি নিপুণ আঁখি মেলে। দেখতে লাগলো। না না, ভুল তার হয়নি—ঐ তো নূরীর কপালে সেই ক্ষত চিহ্নটা-যা একদিন তারই আঘাতে হয়েছিলো। সেই মুখ সেই চোখ-একি, কোনদিন ভুলে যাবার! সেই কথা বলবার ভঙ্গী। নূরী ছাড়া এ অন্য কোন মেয়ে নয়–তবে কি নূরী তার সঙ্গে মিথ্যা ছলনা করছে?
বনহুর দৃঢ় মুষ্ঠিতে চেপে ধরলো নূরীর দক্ষিণ হাত-নূরী।
না, আমার নাম নূরী নয়।
নূরী নও তুমি? ছেড়ে দিলো বনহুর নূরীর হাত খানা, প্রশ্ন করলোকে তুমি? কি তোমার নাম?
নূরী বনহুরকে চিনতে পারেনি এটা সত্য। নূরীকে যাদুকর যাদুর মায়াজালে নিজ সত্তা থেকে বঞ্চিত করে রেখেছিলো। নূরী যা করছিলোসব যাদুকরের যাদুর মায়ায়। এমনকি নূরীর দৃষ্টিশক্তিও অন্যরকম হয়ে গিয়েছিলো, আপন জনকে সে দেখলেও চিনতে পারবে না বা পারছিলো না। বনহুর নূরীর স্বপ্ন-সাধনা–প্রাণের চেয়েও সে ওকে ভালবাসে, অথচ আজ সেই বনহুরকে কাছে পেয়েও নূরী চিনতে পারে না। বনহুরের প্রশ্নে নূরী জবাব দেয়–আমি নাচনেওয়ালী। আমার নাম মায়া।
অস্ফুট ধ্বনি করে উঠে বনহুর–মায়া। হাঁ মায়া।
বনহুরের দৃষ্টি ধীরে ধীরে নত হয়ে আসে। সে অন্য একটি মেয়েকে নূরী বলে ভ্রম করেছে। আবার তাকালো বনহুর নূরীর মুখের দিকে—না, ভুল তার হয়নি—এই তো সেই নূরী–কিন্তু এর নাম যে মায়া।
বনহুর যেমনভাবে এসেছিলো তেমনি বেরিয়ে গেলো। একটা অব্যক্ত বেদনা তার সমস্ত অন্তরটাকে যেন নিষ্পেষিত করে চললো নূরী ছাড়া সে কেউ নয়। কিন্তু একি পরিবর্তন নূরীর মধ্যে!
গোটা রাত নানা দুশ্চিন্তায় কাটলো বনহুরের।
পরেরদিন।
বনহুর ডেকে দাঁড়িয়ে সিগারেট পান করছিলো। ভোরের মিষ্টি হাওয়ায় দেহটা শান্ত-স্নিগ্ধ হলেও মনটা তখনও গুমড়ে কেঁদে মরছিলো। গত রাতের নূরীর কথাই স্মরণ হচ্ছিলো বার বার। যে নূরী তাকে না পেলে অস্থির হয়ে পড়তে, যে নূরী তার এতোটুকু ভালবাসার জন্য উদগ্রীব থাকতো-সেই নূরীর একি পরিবর্তন! হঠাৎ বনহুরের চিন্তাজালে বাধা পড়ে, সেই নুপুরের শব্দ।
