না, আমাদের সঙ্গে কোন পুরুষ নেই, তাই আপনি যদি একটু….থেমে গেলো জলি।
বলুন কি করতে পারি?
মলিই বলে উঠলো-আমাদের একটু বাড়ী অবধি পৌঁছে দেবেন? অবশ্য মনে যদি কিছু না করেন।
এতো শীঘ্রই চলে যাবেন? বনহুর হাতঘড়িটা দেখে নিয়ে বললো… এখন তো সবে আটটা বাজে।
আমাদের বড্ড ভয় করছে। বললো জলি।
বনহুর ভ্রূকুঞ্চিত করে বললো—কেনো এতো ভয়?
মলি বললো–দস্যু বনহুরের জন্য ভয় পাচ্ছি আমরা–আপনাকে তো বললাম।
মুখভাব স্বাভাবিক করে নিয়ে বললো বনহুর-এতোগুলো লোকের মধ্যে দস্যু বনহুর প্রবেশ করবে, এতোবড় সাহস আছে তার?
জলি আর মলি এক সঙ্গে বলে উঠলো—কি বললেন?
বললাম, সে এই ভর সন্ধায় এই লোকজনে ভরা হোটেলে প্রবেশ করতে সক্ষম হবে?
আপনি ঠিক্ জানেন না, দস্যু বনহুর স্বাভাবিক দস্যু নয়।
সে নরখাদক, তাই না? বনহুর কোন রকমে হাসি চাপতে চেষ্টা করে।
হাঁ সে নর-মাংস খায়। তার চেহারা নাকি অতি ভয়ঙ্কর বিশ্রী। রাক্ষসের মত….
এবার বনহুর চোখ বড় বড় করে বললো—এ রকম চেহারার লোক, আছে নাকি দুনিয়ায়?
নেই, বলেন কি? দস্যু বনহুরকে যদি দেখতেন একবার…..তাহলে তো আমার জীবন নিয়ে ফিরে আসা দায় হতো।
জলি, মলি আর দস্যু বনহুর যখন আলাপ আলোচনা চলছিলো, তখন সমস্ত হোটেল কক্ষেই প্রতিটি লোক দস্যু বনহুরকে নিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। সকলেরই মুখে ঐ এক কথা–না জানি কোন্ মুহূর্তে দস্যু বনহুরের এই হোটেলে আবির্ভাব হবে।
জলি উঠে দাঁড়ালো—আমার ভয় হচ্ছে, আর বিলম্ব করা উচিৎ নয় মলি।
মলিও ততক্ষণে উঠে পড়েছে–চলো, এখন ভালয় ভালয় বাড়ী পৌঁছতে পারলে বেঁচে যাই।
জলি বনহুরকে লক্ষ্য করে বললো-অনুগ্রহ করে আপনি যদি আমাদের সঙ্গে..•••
নিশ্চয়ই চলুন। বনহুর উঠে দাঁড়ালো, তখনও তার ঠোঁটের ফাঁকে মৃদু হাসির আভাষ লেগে রয়েছে।
জলি আর মলি বনহুরের পাশে পাশে হোটেল কক্ষ ত্যাগ করলো।
জলি বললো—আমাদের গাড়ী আছে, আসুন।
অদূরে থেমে থাকা একটা গাড়ীর পাশে গিয়ে দাঁড়ালো জলি আর মলি। জলি পিছনের দরজা খুলে ধরে বললো-উঠুন।
বনহুর উঠে বসলো।
জলি ড্রাইভ-আসনে বসলো, মলি তার পাশে।
গাড়ী ছুটতে আরম্ভ করলো।
অদ্ভুত এ পরিবেশটা বনহুরের কাছে ভালই লাগছে। যার ভয়ে ভীত আতঙ্ক গ্রস্ত, তাকেই নিজেদের গাড়ীতে বসিয়ে নিয়ে চলেছে। আপন মনে হাসতে লাগলো বনহুর।
জলি বললো-ভাগ্যিস, আপনি অনুগ্রহ করে আমাদের সঙ্গে এসেছেন, নইলে ভয়ে মরে যেতাম।
মলিও বান্ধবীর কথায় যোগ দিয়ে বললো—সত্যি, কি বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ জানাবো। আচ্ছা আপনার নাম বা পরিচয় এখনও জানা হয়নি কিন্তু।
বনহুর বললে—যদি বলি আমিই দস্যু বনহুর।
এক সঙ্গে হেসে উঠলো জলি আর মলি।
মলি বললো-দস্যু বনহুর যদি আপনি হতেন তবে তো আমাদের আনন্দের সীমা থাকতো না।
তাই নাকি?
মলি পুনরায় বললো–যদি আপনার আপত্তি না থাকে, বলুন না আপনার পরিচয়টা?
আমার নাম নাসিম চৌধুরী। মহানগরের একজন নাগরিক আমি। আর আপনারা? বললো বনহুর।
মলিই জবাব দিলো—আমি মিঃ রায় এর কন্যা মলি। আর আমার বান্ধবী পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ লাহিড়ীর একমাত্র কন্যা জলি।
বনহুর চমকে উঠলো, অন্ধকার বলে মলি লক্ষ্য করতে পারলো না। জলি তো ড্রাইভ করছিলো।
এ শহরের আর কেউ তাকে না চিনুক মিঃ রায় এবং মিঃ লাহিড়ী তাকে চিনতে পারবেন—এ সুনিশ্চয়। বনহুর প্রমাদ গুণলো, এদের পৌঁছে দিতে গিয়ে মিঃ লাহিড়ীর নিকটে পাকড়াও না হয়ে পড়ে। এখন কি ভাবে এদের কবল থেকে ফসকানো যায়।
হঠাৎ বলে উঠলো জলি—এসে গেছি। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ী থেমে পড়লো।
জলি নেমে দাঁড়িয়ে বললো-আসুন মিঃ নাসিম।
ততক্ষণে বনহুর নেমে দাঁড়িয়েছে গাড়ী থেকে আপনারা পৌঁছে গেছেন, এবার আমি চলি?
না তা হয় না মিঃ নাসিম, আপনি আসুন-বাবার সঙ্গে আপনার পরিচয় হলে অনেক খুশী হবেন। কথাগুলো বললো, জুলি।
মলিও জেদ ধরে বসলো—এতোখানি উপকার যখন করলেন তখন আর একটু বইতে নয়, আসুন না জলি যখন বলছে।
বনহুর অগত্যা জলি আর মলিকে অনুসরণ করলো।
পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ লাহিড়ীর ড্রইং রুম।
মিস মলি আর জলির সঙ্গে বনহুর প্রবেশ করলো ড্রইংরুমে। সুসজ্জিত কক্ষ, ফিকে নীল রঙ করা দেয়াল। মেজের কার্পেটখানাও ফিকে নীল, কক্ষের মাঝখানে কাপেৰ্টের বুকে গোলাকার করে সাজানো কয়েকটা সোফা সেট। সোফার কভারগুলোও ফিকে নীল রঙ এর। দরজা জানালার পর্দাও ফিকে নীল রঙ কাপড়ের তৈরী। কক্ষ মধ্যে একটা নীল রঙ এর আলো জ্বলছিলো।
মিস জলি বনহুরকে লক্ষ্য করে বললো—বসুন, বাবাকে ডেকে আনছি।
জলি ভিতরে চলে গেলো, মলিও অনুসরণ করলো তাকে।
একটু পরে ফিরে এলো মলি আর জলি—সঙ্গে সঙ্গে মিঃ লাহিড়ী। কক্ষে প্রবেশ করে হতবাক স্তম্ভিত—কেউ নেই কক্ষে!
মিঃ লাহিড়ী অবাক হলেন, বললেন–কই সেই ভদ্রলোক যিনি তোমাদের পৌঁছে দিয়েছেন?
জলি আর মলি এক সঙ্গেই বলে উঠলো—এখানেই তো তিনি বসেছিলেন!
হঠাৎ মিঃ লাহিড়ী দেখতে পেলেন—সোফার উপর একটি কাগজের টুকরা পড়ে আছে। তিনি কাগজের টুকরাখানা হাতে তুলে নিয়ে চোখের সামনে মেলে ধরলেন, সঙ্গে সঙ্গে তার মুখমন্ডল অন্ধকার হয়ে উঠলো।
জলি বললো-কি হলো বাবা?
মিঃ লাহিড়ী গম্ভীর, কণ্ঠে বললেন-পড়ে দেখো।
জলি কাগজের টুকরোখানা নিয়ে উচ্চ কণ্ঠে পড়লো। তাতে লিখা রয়েছে মাত্র কয়েকটা শব্দ :
