হোটেল লারফাং আলোয় ঝলমল করছে। শহরের সবচেয়ে বড় হোটেল এটা। এখানে আভিজাত্য আর বংশ গৌরবে যারা গৌরবান্বিত, তাদেরই পদার্পণ হয়ে থাকে। সাধারণ কোনো নাগরিকের হোটেল লারফাং এ প্রবেশের উপায় নেই।
লারফাং সরগরম হয়ে উঠছে।
টেবিলে টেবিলে চলেছে নানা রকম খানা-পিনা আর হাসি গল্প। নানা জাতীয় যুবক-যুবতী হাসি আর গল্পের লহরীতে ভরে উঠছে লারফাং হোটেল।
এক পাশের একটি টেবিলের সম্মুখে আনমনে বসে কফি পান করছিলো বনহুর। ভাবছিলো সে…..এবার তার এখানের কাজ শেষ হয়েছে। মালতী হত্যা-রহস্য উদঘাটনে সক্ষম হয়েছে, নিরাপরাধ অরুণবাবু মুক্তি পেয়েছে। মালতীর নিহতকারী বাসুদেব বন্দী, বিচারে তার ফাসি কিংবা দ্বীপান্তর হয়ে। যাবে—তাতে কোন সন্দেহ নেই। এবার বনহুর ফিরে যাবে নিজের দেশে, সেই কান্দাই শহরে। মনিরা তার প্রতীক্ষায় পথচেয়ে বসে আছে। তার মা না জানি কত উগ্রীব হয়ে পড়েছেন। হয়তো বা কত কান্দা-কাটা করছেন তিনি। মনিরার মুখখানা মনে পড়তেই বনহুরের হৃদয়ে একটা অপুলক শিহরণ বয়ে গেলো। মনের মধ্যে একটা আলোড়ন শুরু হলো, মনিরাকে কাছে পাবার প্রবল বাসনা তাকে উন্মত্ত করে তুললো। হঠাৎ মনে পড়ে গেলো নূরীর কথা মুহর্তে একটা বিষণ্ণতার ছাপ ছড়িয়ে পড়লো বনহুরের। গোটা মুখে। নূরী আজ বেঁচে নেই, তার হয়ত সলিল সমাধি হয়ে গেছে। নিষ্পাপ ফুলের মত একটি জীবন….নূরীর পবিত্র প্রেম-শিখা বনহুরের গোটা অন্তরে ছড়িয়ে আছে ধূপশিখার মত। এতোটুকু প্রেম ভালবাসার জন্য নূরী কিইনা করেছে। নূরীর অতৃপ্ত আত্মার কথা স্মরণ করে বনহুরের চোখ দুটো আশ্রু ছলছল হয়ে উঠে, তার মনের পর্দায় ভেসে উঠে আর একটি ছোট্ট সুন্দর কচি মুখ-মনি, সেও মুছে গেছে পৃথিবীর বুক থেকে….বনহুর এবার রুমালে চোখ মোছে।
এমন সময় হঠাৎ বনহুরের কানে আসে হোটেলের মাইকে একটি গম্ভীর কণ্ঠস্ব—আপনারা সাবধানতা সহকারে চলাফেরা করবেন, মহানগরেও দস্যু বনহুরের আর্বিভাব ঘটেছে। যে কোন মুহূর্তে দস্যু বনহুর আপনাদের উপর হামলা চালাতে পারে।
বনহুর তখন কফির খালি কাপটায় শেষ চুমুক দিয়ে টেবিলে নামিয়ে রাখছিলো। হাতখানা তার থেমে গেল কাপটার পাশে, একটা মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠলো তার ঠোঁটের কোণে। মিঃ লাহিড়ী তাহলে তার উপস্থিতিটা মহানগরের প্রতিটি নাগরিকের কানে পৌঁছে দিয়েছে।
বনহুরের চিন্তাস্রোতে বাধা পড়লো, হোটেল লারফাং ভরে উঠলো মৃদু গুঞ্জনে। সকলেরই চোখেমুখে দেখা দিলো ভীতি ভাব। বিবর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে উঠলো লারফাং এর প্রতিটি জনতার মুখমন্ডল। সবাই তাকাতে লাগলো হোটেলের দরজার দিকে।
হোটেল কক্ষের দক্ষিণ দিকে একটা টেবিলে বসে ছিলো দুজন যুবতী-কোন ধনিক দুহিতা হবে। অঙ্গে শোভা পাচ্ছে মূল্যবান অলঙ্কার। যুবতীদ্বয়ের মুখভাব অত্যন্ত ভয়-কাতর হয়ে পড়লো। তাদের সঙ্গে কোন পুরুষ নেই বোঝা গেলো, তাই এতো ভীতভাব দেখা দিয়েছে তাদের মধ্যে। যুবতীদ্বয় ফিস ফিস করে কথা বলতে শুরু করলো। বনহুরের অনতি দূরেই তাদের টেবিল, কাজেই তাদের কথাবার্তা যদিও নীচুস্বরে চলছিলো তবু কানে ভেসে আসতে লাগলো তার।
প্রথম যুবতী চাপা স্বরে দ্বিতীয় যুবতীকে লক্ষ্য করে বললো—পত্রিকার সংবাদটা জানার পর আমাদের এভাবে বের হওয়া ঠিক হয় নাই মলি!
দ্বিতীয় যুবতী ফ্যাকাশে মুখে কক্ষের দিকে একবার ভীতভাবে তাকিয়ে নিয়ে বললো—সত্যি জলি, আমার হৃদকম্প শুরু হয়েছে। দস্যু বনহুর নাকি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর।
হাঁ মলি, আমি শুনেছি–সে নাকি দিন-দুপুরে মানুষের বুকে ছোরা বসিয়ে দেয়। অসুরের শক্তি নাকি তার দেহে, দশ বিশজন শক্তিশালী পুরুষ। নাকি তার কাছে কিছু নয়।
শুধু কি তাই, দস্যু বনহুর নরমাংস ভক্ষণ করে।
সত্যি?
বনহুর কথাটা শুনে আপন মনেই হেসে উঠলো। বনহুরের হাসির শব্দে ফিরে তাকালো জুলি, বনহুর তখন একটা সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করে তাকালো উপরের দিকে নিজকে সংযত করে নেবার জন্য।
মলি বললো–আপনি হাসলেন কেনো?
বনহুর দৃষ্টি ফিরিয়ে তাকালো যুবতীদ্বয়ের মুখের দিকে, একটু গম্ভীর হয়ে নিয়ে বললো-দস্যু বনহুর মানুষ হয়ে মানুষের মাংস ভক্ষণ করে কথাটা শুনে।
জলি বনহুরের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হলো, এতোক্ষণ জলি এবং মলি বনহুরকে তেমন করে লক্ষ্যই করে নাই। বনহুরের সুন্দর বলিষ্ঠদীপ্ত চেহারায় মুগ্ধ হলো ওরা। জলি সহসা দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে পারলো না।
মলিই প্রশ্ন করলো–কেনো, আপনার বিশ্বাস হচ্ছেনা বুঝি?
হাসার চেষ্টা করে বললো বনহুর–বিশ্বাস না করে উপায় নেই। কারণ, তাকে যখন চোখে দেখিনি কোন দিন।
ভয় বিবর্ণ মুখে বললো মলি–সর্বনাশ, আপনি দস্যু বনহুরকে স্বচক্ষে দেখবার বাসনা রাখেন নাকি?
হাঁ, রাখি।
ভয় করে না আপনার?
সে তো বাঘ নয়। বললো বনহুর।
এবার জলি বললো–বাঘের চেয়েও সে ভয়ঙ্কর।
তাই নাকি? বললো বনহুর।
হাঁ, আপনি কি এ কদিনের পত্রিকা পড়েন নি? বললো মলি!
বনহুর যদিও সবগুলি পত্রিকা এবং সংবাদ সংগ্রহ করেছিলো বা পড়েছিলো তবু একটু না জানার ভান করে বললো বিশেষ কোন কারণে পত্রিকা দেখবার সময় আমার হয়ে উঠেনি।
মলি এবার বললো আসুন না আমাদের টেবিলে। প্লিজ আসুন। আমাদের বড্ড ভয় করছে।
বনহুর উঠে মলি আর জলির টেবিলে গিয়ে বসলো। জলি অপূর্ব সুন্দরী বটে, উজ্জ্বল গৌরবর্ণ গায়ের রঙ, মাথায় কৃষ্ণ কালো চুল। টানা টানা ডাগর দুটি চোখ, উন্নত নাসিকা, লম্বা গঠন-সুন্দরী না বলে উপায় নেই। নিঃসঙ্গ সন্ধ্যাটা বনহুরের কাছে যেন স্বপ্নময় হয়ে উঠলো। হেসে বললো বনহুর কেনো, আপনাদের সঙ্গে কেন…..
