জন বলে চলেছে–আমি দেখলাম, মুখে কালো রুমাল বাঁধা একটা লোক আমার পিঠে রাইফেল ঠেশে ধরেছে। আমি চীৎকার করতে যাবো, অমনি লোকটা মুখে হাত চাপা দিয়ে বললো চীৎকার করলেই মরবে। কাজেই আমি জীবনের ভয়ে চুপ করে গেলাম! যুবকটা আমাকে বললো তখন, ভয় নেই, আমি তোমাকে কিছুই বলবো না বা হত্যা করবো না, শুধু আমার কথামত তোমাকে কিছুদিন সরে থাকতে হবে। আমি এবার তাকে প্রশ্ন করলাম–কে তুমি? কি চাও? জবাব দিলো সে আমি কে, পরে জানতে পারবে। আর চাইনা কিছুই; শুধু দরকার—তোমার জিনিস-পত্র ব্যবহার করবো।
যুবকটা তারপর আমাকে আমার গাড়ীতে বসিয়েই নিয়ে গেলো নিজেই ড্রাইভ করে। তারপর এক পোড়োবাড়ীর গভীর মাটির তলায় একটা ঘরের মধ্যে আটকে রাখলো।
বলেন কি? বলে উঠলেন মিঃ রায়।
হাঁ, আমাকে আটকে রাখলো সে ঐ কক্ষটার মধ্যে।
মিঃ লাহিড়ী বললেন—আপনার সেখানে অসুবিধা হলো না?
ইন্সপেক্টার, কোন অসুবিধা আমার হয়নি সেখানে। যদিও সেদ্ধ পাক-শাক আমার পেটে পড়েনি, কিন্তু অজস্র ফল-মূল আমার খাবার জন্য সদা প্রস্তুত থাকতো। পানীয় এবং দুধ আমার সেখানে দেওয়া হয়েছিলো। তবু আমি নিজকে সম্পূর্ণ সুস্থ বোধ করতে পারিনি, কারণ নানা দুশ্চিন্তা আমাকে অহরহ যাতনা দিয়েছে। এমন কি আমাকে সেখানে সেভ করার সরঞ্জাম দেওয়া স্বত্ত্বেও আমি সেভ করতে পারিনি।
তারপর মিঃ জন?
তারপর বেশ কিছু দিন চলে গিয়েছে, আজ হঠাৎ সেই যুবক আমাকে মুক্ত করে দিয়ে বললো–এবার আমার কাজ শেষ হয়েছে আপনি যেতে পারেন। আমি তার পরিচয় জানতে চাইলে বললো সে-সব জানতে পারবেন। বলুন ইন্সপেক্টার, আপনি তার পরিচয় জানেন কি?
হাঁ মিঃ জন, জানি।
মিঃ জন ও এ্যানি এক সঙ্গে তাকালো মিঃ লাহিড়ীর মুখের দিকে।
মিঃ লাহিড়ী বললেন—আপনাকে আটকে রাখার মূলে রয়েছে একটি হত্যাকান্ড।
অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো মিঃ জন—হত্যাকান্ড?
হাঁ, হত্যাকান্ড।
তাহলে সেই যুবক খুনী?
না, আপনি শুনুন মিঃ জন, সব বলছি।
বলুন ইন্সপেক্টার?
মিস মালতী নিহত হয়েছে।
মিস মালতী নিহত! বলেন কি?
হাঁ, তারই হত্যারহস্য উদ্ঘাটন করার ব্যাপারে আপনাকে আটক রেখে রহস্যজাল ভেদ করেছে সেই যুবক। কারণ, আপনার চরিত্র তাকে এ হত্যারহস্য উদঘাটন করারব্যাপারে যথেষ্ট সাহায্য করেছে।
কে-কে তাকে হত্যা করেছে ইন্সপেক্টার?
তার পিতা বাসুদেব।
বাসুদেব। অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠে মিঃ জন।
হাঁ, বাসুদেব মিস মালতীর হত্যাকারী, এবং সে তার পিতা নয়।
পিতা নয়?
না।
কি কারণে বাসুদেব মালতীকে হত্যা করেছে?
সেই হীরক হার যা আপনি মিস মালতীর নিকটে গচ্ছিত রেখেছিলেন—
মিঃ লাহিড়ীর কথা শেষ হয় না, এ্যানি ক্ষিপ্তের ন্যায় বলে উঠলো–আমার হীরক হার মালতীর নিকটে গচ্ছিত….দুহাতে মাথা টিপে ধরে এ্যানি—একি বলছেন?
মিঃ লাহিড়ী বলে উঠেন—ব্যস্ত হবার কিছু নেই মিস এ্যানি। কারণ, আপনার হীরক হারটি পুনরায় আপনার হাতে ফিরে এসেছে….কথা শেষ করে মিঃ লাহিড়ী এ্যানির হীরক হার ছড়া তার সম্মুখে বাড়িয়ে ধরলেন–আপনার ভাগ্য ভালো মিস এ্যানি। তাই এতে ঘটনার পরও আপনি হীরক হার ফিরে পেলেন।
এ্যানির চোখে মুখে খুশীর উৎস। আনন্দিত মনে মিঃ লাহিড়ীর হাত থেকে হার ছড়া নিয়ে এ্যানি নিজের চোখের সামেন তুলে ধরলো। এতো খুশী সে বুঝি আর কোন দিন হয় নাই। বললো এবার সে-ইন্সপেক্টার, আপনাকে আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
মিঃ লাহিড়ী বলে উঠলেন—মিস এ্যানি, এ হার ছড়া ফিরে পাবার জন্য ধন্যবাদ পাবার পাত্র আমি নই।
তবে?
দস্যু বনহুর!
এক সঙ্গে এ্যানি আর মিঃ জন অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো-দস্যু বনহুর।
হাঁ, দস্যু বনহুর। তার অফুরন্ত চেষ্টা আর সহায়তায় মিস মালতীর হত্যা-রহস্য উদ্ঘাটন হয়েছে, এবং আপনার মূল্যবান হীরক হার ছড়া উদ্ধার পেয়েছে।
মিঃ জন বলে উঠেন—কি আশ্চর্য-দস্যু বনহুর?
হাঁ, দস্যু বনহুর। দস্যু বনহুরই আপনাকে আটক রেখেছিলো মিঃ জন।
মিস এ্যানির দুচোখে বিস্ময় ফুটে উঠলো। আনমনা হয়ে গেলো এ্যানি….কালো চশমা পরা সুন্দর একটি মুখ ভেসে উঠলো তার মানসপটে…ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে টেবিল থেকে চশমাটা তুলে নিলো হাতে।
০৩.
কান্দাই থেকে মহানগর হাজার হাজার মাইল দূরে।
কান্দাই আর মহানগরের প্রায় মাঝামাঝি হলো ঝিল শহর। বনহুর যখন ঝিল শহরে বিরাজ করছিলো তখন বনহুরের কার্যকলাপ এবং তার সমস্ত খবরা খবর মহানগরের জনগণের কানে কানে ছড়িয়ে পড়েছিলো। দস্যু বনহুরের দুর্ধর্ষ আচরণের কথা সবাই জ্ঞাত ছিলো। সেই দস্যুর আর্বিভাব সংবাদ যখন প্রতিটি পত্রিকায় প্রথম পৃষ্ঠায় বৃহৎ আকারে প্রকাশ পেলো, তখন মহানগরের প্রতিটি ঘরে ঘরে প্রত্যেকটি মানুষের প্রাণে জাগলো একটা ভীত ভাব। বনহুরকে তারা চোখে না দেখলেও তার সম্বন্ধে সকলের মনেই রয়েছে একটা ভয়ঙ্কর আতঙ্ক। দস্যু বনহুর মহানগরে পদার্পণ করেছে—খবরটা বিদ্যুৎ গতিতে মহানগরের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লো।
দোকানে, হোটেলে, ক্লাবে, জলসায় পথে-ঘাটে দস্যু বনহুরের সম্বন্ধে আলোচনা চলতে লাগলো। সকলের মনেই ভয়াতুর ভাব। না জানি সে কেমন দেখতে…..কেমন ভয়ঙ্কর তার চেহারা, এমনি কত কি। দস্যু বনহুর নাকি দিব্য দিনের আলোতেও লোকের বুকে ছোরা বসিয়ে দিতে দ্বিধা বোধ করেনা। পথে-ঘাটে কোন মেয়ে বের হবার জো নেই, সে নাকি প্রকাশ্যে তাদের চুরি করে নিয়ে যায়। কেউ বাধা দিতে পারে না তার কাজে। আরও গুজব ছড়ালো লোকের মুখে মুখে, দস্যু বনহুর নাকি নর-মাংস ভক্ষণ করে।
