০২.
মিঃ জনের গাড়ী এসে থামলো গাড়ী-বারান্দায়।
ছুটে এলো এ্যানি গাড়ী দেখতে পেয়ে, উৎফুল্ল কণ্ঠে ডাকলোডার্লিং কোথায় গিয়েছিলে…..কথা শেষ হয় না এ্যানির, বিস্ময় ভরা চোখে থমকে পাড়ায়।
মিঃ জন এ্যানির মুখের দিকে তাকিয়ে উফুল্ল হতে গিয়ে থ মেরে যায়—কারণ, এ্যানি তাকে চিনতে পারছে না। তার মুখে খোঁচা খোঁচা এক মুখ দাড়ি, মাথার চুলগুলো রুক্ষ, দেহটাও কেমন জীর্ণ হয়ে গেছে। মিঃ জন গাড়ী থেকে নেমে দাঁড়ালো।
এ্যানি পিছিয়ে গেলো কয়েক পা।
মিঃ জন বলে উঠলো—এ্যানি।
কে, কে তুমি? এ্যানির দুচোখে রাজ্যের বিস্ময়।
এ্যানি, আমি জন। আমাকে তুমি চিনতে পারছো না?
না…..জন, জন কই?
এ্যানি, তুমি বিশ্বাস করো আমিই জন।
এ্যানি অপলক নয়নে তাকালো, মুখে চোখে তার গভীর বিস্ময় ফুটে উঠেছে। বললো সে-তুমি জন…..কিন্তু…..
হাঁ, এ্যানি আমিই জন, আর যাকে তুমি এতদিন জন ভেবে এসেছিলে, সে জন নয়।
কে তবে সে?
আমিও জানি না এ্যানি, কে সে? চলো অনেক কথা আছে, সব শুনলে তুমি বুঝতে পারবে।
এ্যানির মন থেকে সন্দেহ দুর হয় না, সে তখনও কেমন একটা ভাব নিয়ে তাকাচ্ছিলো জনের মুখের দিকে।
জন বললো–চলো এ্যানি।
এ্যানি অনুসরণ করলো জনকে।
কক্ষের মধ্যে গিয়ে একটা সোফায় বসে পড়লো জন, বললো—এ্যানি, বসো।
এ্যানি জনের নিকট থেকে বেশ কিছুটা দূরত্ব রেখে একটা সোফায় বসে পড়লো।
জন নিজের খোঁচা খোঁচা দাড়ি ভরা চিবুকে একবার হাত বুলিয়ে নিয়ে বললো—এখনও তুমি আমাকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছোনা এ্যানি?
এ্যানি কোন জবাব না দিয়ে শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল জনের মুখের দিকে, মাঝে মাঝে এ্যানির দৃষ্টি জনের পা থেকে মাথা অবধি বিচরণ করে ফিরছিলো।
বললো জন–বলো, কবে তুমি লন্ডন থেকে এসেছে?
এ্যানি এবার জবাব দিলো জুনের পহেলা তারিখে।
জন একটু চিন্তা করে বললো—দেড় মাস হলো এসেছো এ্যানি?
হাঁ।
আর আমি এ বাড়ি ত্যাগ করেছি পুরো দুমাস হলো।
কেনো? আচম্বিতে প্রশ্ন করে বসে এ্যানি।
জন একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বলে—এ্যানি, আমার অদৃষ্টে যা ছিলো। তাই ঘটেছে। তোমার কাছে সব খুলে বলবো, তুমি বিশ্বাস করো—আমিই জন।
আর সে?
বললাম তো জানি না কে সে, কি তার পরিচয়…
জনের কথা শেষ হয় না; কক্ষে প্রবেশ করেন মিঃ লাহিড়ী এবং মিঃ রায়।
মিঃ লাহিড়ীকে দেখে উঠে দাঁড়ায় এ্যানি, কারণ তার সঙ্গে পূর্ব হতেই পরিচয় ছিলো এ্যানির।
এ্যানিকে উঠে দাঁড়াতে দেখে জনও আসন ত্যাগ করলো। জন ছিলো অত্যন্ত ঘরোয়া ধরনের যুবক, তাই সে মিঃ লাহিড়ী কিংবা মিঃ রায়ের সঙ্গে পরিচয় ছিলো না। জন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো পুলিশ অফিসার দুজনার মুখে।
এ্যানিও কেমন বিব্রত রোধ করছিলো, কারণ জনকেই সে এখনও সম্পূর্ণ চিনে উঠতে পারেনি।
মিঃ লাহিড়ী বুঝতে পারলেন এদের দুজনার মধ্যেই এখন একটা দ্বন্দ্ব চলছে। তিনি নিজেই পরিচয় দিলেন—আমি পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ লাহিড়ী আর ইনি ইন্সপেক্টর রায়। বসুন মিঃ জন, আপনার সঙ্গেই সাক্ষাৎ করতে এলাম।
মিঃ লাহিড়ী নিজেই আসন গ্রহণ করলেন।
অন্যান্য সকলেই আসন গ্রহণ করলো।
মিঃ জন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্ছে পুলিশ অফিসারদ্বয়ের মুখে।
এ্যানি নিশ্চুপ।
মিঃ রায় অবাক হয়ে জনকে দেখছেন। আসল জন আর নকল জনের মধ্যে কতখানি তফাৎ ছিলো। জুনও সুপুরুষ বটে, কিন্তু নকল জনের মত অতোখানি অদ্ভুত সুন্দর নয়। লম্বা চেহারা, উজ্জ্বল গৌর বর্ণ, মাথায়। কোঁকড়ানো একরাশ চুল। ওর চোখ দুটি কোন দিন দেখে নাই বা দেখবার সুযোগ ঘটেনি কারো। এর চোখ দুটি স্বাভাবিক অনুজ্জল।
মিঃ লাহিড়ী বললেন—হাঁ, কি বলছিলেন আপনারা?
জন বললো-ইন্সপেক্টার, আপনারা নিশ্চয়ই এ ব্যাপার জানেন, আমাকে এক অজ্ঞাত যুবক অখ্যাত এক গলির অন্ধকারে একটি পড়োবাড়ীর ভূগর্ভে আটক করে রেখেছিলো।
না, এ ব্যাপারে আমরা সম্পূর্ণ অজ্ঞ। মিঃ জন, আপনার নিকটে এ ব্যাপারটা আমি পুরোপুরিভাবে জানতে চাই। অবশ্য যদি আপনি কিছুমাত্র না গোপন করে বলেন?
মিঃ জন বললো—হাঁ, আমি কিছুমাত্র গোপন না করে সব বলবো এবং যতক্ষণ না বলতে পেরেছি ততক্ষণ আমি কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছিনা। এ্যানির দিকে তাকিয়ে বললো, এ্যানিও এখনো আমাকে জন বলে বিশ্বাস করতে পারনি।
আচ্ছা, তাহলে আপনার সব কথা আমাদের যেমন শোনার প্রয়োজন, তেমনি মিস এ্যানিরওকেমন, তাই না?
এ্যানি একবার মিঃ লাহিড়ীর মুখের দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি নত করে নিলো। মনোভাব—নিশ্চয়ই জানা দরকার।
জন বলতে শুরু করলো আজ থেকে প্রায় মাস দুই আগে একদিন আমি নিজের ঘরে টেবিলের পাশে বসে একখানা চিঠি লিখছিলাম, রাত তখন দেড়টার বেশী হবে। চিঠি খানা আমি লন্ডনে এ্যানির কাছেই লিখছিলাম। অনেক রাত–তবু চোখে ঘুম আসছে না, বার বার মনে পড়ছে এ্যানির কথা। এ্যানিকে লন্ডন ছেড়ে এসে মন আমার কিছুতেই সুস্থির হচ্ছিলো না। চিঠি লেখা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, নীচে নাম লিখে এবার উঠে দাঁড়াবো, ঠিক সেই মুহূর্তে আমার পিঠে একটা ঠান্ডা শক্ত কোন জিনিস অনুভব করলাম। সঙ্গে সঙ্গে ফিরে তাকালাম পিছনে। ভয়ে বিস্ময়ে আড়ষ্ট হয়ে গেলাম।
মিঃ লাহিড়ী এবং মিঃ রায় স্তব্ধ হয়ে শুনছেন।
মিস এ্যানির অবস্থাও তাই, তার চোখে প্রবল আগ্রহ আর উদ্দীপনা। জনের কথাগুলো যেন সে গিলছে বলে মনে হলো।
