জন বললো—মালতীর মৃত্যুর পূর্বেও এ হার তার কণ্ঠে ছিলো। মিঃ লাহিড়ী, নিহত মালতীর কণ্ঠে যে আঁচড়ের দাগ পাওয়া গেছে তা এই ছিন্ন হারের।
বাসুদেব আবার বললেন, এ হার মৃত্যুকালে মালতীর কণ্ঠে ছিলো, এটা সে মৃত্যুর কদিন আগে আমাকে রাখতে দিয়েছিলো।
না, এ হার মালতীর মৃত্যুর পূর্বেও তার কণ্ঠে ছিলো এবং এই হারের জন্যই তাকে হত্যা করা হয়েছে। জন হারছড়া স্বর্ণকারের হাতে দিয়ে বললো—দেখুন তো এটা নিখুঁত আছে কিনা?
স্বর্ণকার হারছড়া পরীক্ষা করে বললোনা, এটা নিখুঁত নেই। এট, থেকে একটি হীরা নেয়া হয়েছে।
বাসুদেব ফ্যাকাশে মুখে কিছু বলতে গেলো কিন্তু পারলো না।
হারখানা যখন মালতীর কণ্ঠ থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয় তখন মালতী নিজের দক্ষিণ হাত দিয়ে হারছড়া চেপে ধরেছিলো, তবু সেটা ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিলো এবং হারের একটি পাথরসহ খানিকটা চেন মালতীর হাতের মুঠায় আবদ্ধ হয়ে রয়েছিলো।
মিঃ লাহিড়ী বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললেন—কিন্তু কই, মৃত মালতীর হাতের মুঠোয় কোনো পাথর খন্ড বা কোনো চেন পাওয়া যায়নি তো?
আপনারা সেখানে পৌঁছবার পূর্বেই এক ব্যক্তি সেখানে পৌঁছেছিলো এবং মিস মালতীর হাতের মুঠা থেকে সে ঐ পাথরটা সরিয়ে নিয়েছিলো!
বাসুদেব এবার রাগতকণ্ঠে বললেন—মিথ্যা, সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। মৃত মালতীর হাতে কোনো হীরক হারের অংশ ছিলো না ইন্সপেক্টার।
মিঃ লাহিড়ী বললেন—এ কথা আপনি কি করে জানলেন মিঃ জন?
আমি সেই ব্যক্তি। এই দেখুন মিঃ লাহিড়ী…মিঃ জন পকেট থেকে একটি হীরা ও কিছুটা চেন বের করে বললো—এটাই ছিলো মিস মালতীর হাতের মুঠোয়।
মুহূর্তে বাসুদেবের মুখমন্ডল অমাবস্যার অন্ধকারের মত হয়ে উঠলো।
জন বলে চলেছে—হীরার হারখানা সম্পূর্ণ নিতে পারেনি খুনী, একখানা হীরা মালতী আঁকড়ে ধরে রেখেছিলো। আর হাঁ, মালতী শেষ পর্যন্ত খুনীকে চিনতে পেরেছিলো এবং সেই কারণেই খুনী তাকে হত্যা করেছে। সেই খুনী
অন্য কেউ নয়, মালতীর পিতার রুপধারী বাসুদেব শর্মা।
মিঃ জনের কথা শেষ হতে না হতে মিঃ লাহিড়ী পকেট থেকে বাঁশী বের করে ফুদিলেন, সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন পুলিশ কক্ষে প্রবেশ করলো। মিঃ লাহিড়ী বললেনবাসুদেবকে গ্রেপ্তার করো!
সঙ্গে সঙ্গে বাসুদেবের হাতে হাতকড়া লাগিয়ে দেওয়া হলো। কাফ্রি চাকরটা সেই সুযোগে পালাতে যাচ্ছিলো, মিঃ রায় তার ওপর বাঘের মত লাফিয়ে পড়লেন, তৎক্ষণাৎ তাকেও এরেষ্ট করা হলো।
মিঃ লাহিড়ী এবার বললেন মিঃ জন, আপনি সেদিন ওখানে যাবার কারণ কি?
আমি মালতীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম, কিন্তু তার একটু পূর্বেই তাকে হত্যা করা হয়েছিলো। আমি জানতাম সেই মুহূর্তে সত্যি কথা বললেও আপনারা কেউ আমাকে বিশ্বাস করতে পারতেন না বরং উল্টো আমাকে গ্রেপ্তার করে আটকে রাখতেন। তাই আমি হীরার হারটি মৃত মালতীর হাতের মুঠো থেকে খুলে নিয়ে আত্মগোপন করেছিলাম এবং শপথ শ্ৰহণ করেছিলাম মালতীর হত্যাকারীকে খুজে বের করবো। হত্যাকারীকে আবিষ্কার করতে গিয়ে আপনাদের অনেক সময় অসন্তুষ্টির কারণ হয়ে পঁড়িয়েছি, আমাকেও আপনারা খুনী বলে সন্দেহ করেছেন তাতেও আমি কিছুমাত্র উদগ্রীব বা বিচলিত হইনি।
মিঃ লাহিড়ী লজ্জ্বিত কণ্ঠে বললেন–আপনার অনুমান সত্য মিঃ জন, আমি সন্দেহপরবশ হয়ে বহু সময় আপনাকে অনুসরণ করেছি।
জন বললো—মিঃ লাহিড়ী, অরুণ বাবু সম্পূর্ণ নির্দোষ। তাকে অযথা বন্দী করে রেখেছেন। সে মালতী হত্যা ব্যাপারে ঘাবড়ে গিয়ে ভয় পেয়ে রাতের অন্ধকারে নিজের ছোরাখানাকেই গোপনে পুকুরের পানিতে নিক্ষেপ করতে গিয়েছিলো। আসলে সে মালতীকে সত্যই গভীরভাবে ভালবাসতো।
হাঁ, এবার তাকে মুক্তি দেবো মিঃ জন।
মিঃ লাহিড়ী স্বর্ণকারকে গ্রেপ্তার করতে যাচ্ছিলেন, জন বললো-ওকে এরেষ্ট করবার কোনো প্রয়োজন নেই, কারণ স্বর্ণকার সম্পূর্ণ নির্দোষ। এবং সে আমাকে এ ব্যাপারে যথেষ্ট সাহায্য করেছে। স্বর্ণকারের সাহায্য ছাড়া আমি হয়তো এতো শীঘ্র এই খুনের সমাপ্তি বা রহস্য উদঘাটনে সক্ষম হতাম না। কাজেই স্বর্ণকার মহাশয়কে আমার অশেষ ধন্যবাদ।
স্বর্ণকার এবার হাস্যেজ্জ্বল মুখে বললেন–আপনি ঠিক সময় আমাকে ঐ একটি হীরা আর চেনখন্ড দেখিয়ে ছিলেন বলেই আমি আসল খুনীকে বাকী। চারখানা হীরা সহ আবিষ্কার করতে সক্ষম হই এবং আপনার কথা অনুযায়ী কাজ করি। ওটা আমি কিনবো বলে তাকে কথা দেই এবং আপনাকে সংবাদ দিয়ে জানাই।
মিঃ লাহিড়ী জনের পিঠ চাপড়ে বললেন আপনার সুতীক্ষ্ণ বুদ্ধির কাছে আমাদের পুলিশ বাহিনীও নতি স্বীকার করলো মিঃ জন।
জন হাসলো। . মিস মালতীর হত্যারহস্য উদঘাটিত হলো।
বাসুদেব শর্মা ও কাফ্রি চাকরটাকে বন্দী করে নিয়ে পুলিশ ভ্যান এগিয়ে চললো।
জন মিঃ লাহিড়ী ও মিঃ রায়কে নিয়ে গাড়ীতে স্টার্ট দিলো।
পুলিশ অফিসে মিঃ লাহিড়ী এবং মিঃ রায়কে পৌঁছে দিয়ে ফিরে চললো জন।
বাড়ী পৌঁছেতেই এ্যানি ছুটে এলো জনের পাশে—হ্যালো ডালিং, কোথায় ছিলে তুমি এ কদিন?
জন চোখের কালো চশমাটা ঠিক করে নিয়ে বললো–মালটে হত্যারহস্য উদঘাটন করলাম।
ডালিং, তুমি নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছে তো?
হাঁ এ্যানি।
তবে এবার আমাদের আনন্দ করতে কোনো ভয় নেই?
এ্যানি, কিন্তু…কিছু বলতে গিয়ে জন থেমে গেলো।
