বাসুদেব জনকে লক্ষ্য করতেই জিনিসটা লুকিয়ে ফেললেন জামার পকেটে। কিন্তু জন সেটা দেখে ফেললো।
বাসুদেব জনকে দেখেই উঠতে যাচ্ছিলো।
জন রিভলবার উদ্যত করে ধরলো–খবরদার পালাতে চেষ্টা করবেনা।
বাসুদেব বিবর্ণ ফ্যাকাশে মুখে পুনরায় বসে পড়লেন।
জন উচ্চকণ্ঠে ডাকলো—ইন্সপেক্টার!
মিঃ লাহিড়ী এবং মিঃ রায় কক্ষে প্রবেশ করলেন।
স্বর্ণকার ফ্যালফ্যাল করে তাকাতে লাগলেন।
বাসুদেব বললেন–আমাকে এভাবে জব্দ করছো কেন জন?
জব্দ নয় মিঃ শর্মা, আপনাকে সম্মান দেখাতে এসেছি। প্রথমে জবাব দিন-এত রাতে এখানে কেন, কি কারণে এসেছেন?
বাসুদেব ঢোক গিলে জবাব দিলেন——আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার তোমাকে জানাতে রাজী নই।
ঠিক সেই মুহূর্তে ওদিক থেকে কাফ্রি লোকটা সরে পড়তে যাচ্ছিলো, জন ইংগিত করলো মিঃ রায়কে-ওকে লক্ষ রাখবেন যেন না পালায়।
মিঃ রায় মুহূর্তে সজাগ হয়ে দাঁড়ালেন, তার হাতেও পিস্তল ছিলো।
কাফ্রি চাকরটা কাঁচুমাচু মুখে বসে পড়লো বেঞ্চের ওপরে।
মিঃ লাহিড়ী অবাক হয়েছেন বাসুদেব মালতীর পিতাতাকে এরকম অপদস্ত করার কি মানে হয়ই তিনি যেন কিছু বুঝতে পারছেনা গম্ভীর মুখে তিনি দাঁড়িয়ে সব লক্ষ্য করতে লাগলেন।
মিঃ শর্মা ব্যক্তিগত ব্যাপার হলেও পুলিশের কাছে আপনাকে তা জবাব দিহি করতে হবে।
মিঃ লাহিড়ী বললেন—হাঁ, আপনাকে যখন যা জিজ্ঞাসা করা হবে সঠিক জবাব দেবেন আশা করি।
নিশ্চয়ই দেবো ইন্সপেক্টার।
জন দৃঢ়কণ্ঠে বললো—মালতীর হত্যাকারী স্বয়ং বাসুদেব।
বাসুদেব বিবর্ণ মুখে কম্পিত কণ্ঠে বললেন—মিথ্যা কথা!
জন বলে উঠলো–সম্পূর্ণ সত্য, আপনিই তাকে হত্যা করেছেন মিঃ শর্মা।
মিঃ লাহিড়ী বললেন—তার প্রমাণ?
প্রমাণ আছে মিঃ লাহিড়ী। তার পূর্বে আমি জানাতে চাই–মিস মালতী বাসুদেবের কন্যা নয়। বললো জন।
বাসুদেব ফেটে পড়লেনমালতী আমার কন্যা এ কথা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না।
মিঃ শর্মা, আপনার ঐ কাফ্রি চাকর বারো বছর আগে পাঁচ বছরের এত শিশুকন্যাকে চুরি করে এনে দেয়নি?
মিথ্যা—সব মিথ্যা! বাসুদেব যেন ফেটে পড়লেন।
জন এক টানে কাফ্রি চাকরটাকে সরিয়ে এনে তার বুকে রিভলবার চেপে ধরলো—বলো, মিস মালতী কার মেয়ে?
কাফ্রি চাকর একবার বাসুদেবের মুখে তাকিয়ে পুনরায় ফিরে তাকায় নিজের বুকে ঠেকানো রিভলবারের ডগায়।
জন বললোসঠিক জবাব না দিলে এই মুহূর্তে তোমাকে হত্যা করবো।
কাফ্রি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকালো কিছু বলতে গেলো, কিন্তু বাসুদেবের দিকে তাকিয়ে থেমে গেল সে।
মিঃ লাহিড়ী জনের এই আচরণে খুশী হতে পারছিলো না। কিন্তু নিশ্চুপ হয়ে দেখা ছাড়া উপায়ও ছিলো না কিছু বলার।
জন বললোআর দুমিনিট সময় দিলাম।
কাফ্রি এবার বলে উঠলো—হাঁ, আমি বারো বছর আগে মালতীকে চুরি করে এনেছিলাম।
কার মেয়ে সে? বললা, নচেৎ–
এক পুলিশ ইন্সপেক্টারের মেয়ে, ওর বাবার নাম যতীন্দ্র মোহন রায়।
আচম্বিতে বৃদ্ধ মিঃ রায় প্রতিধ্বনি করে উঠলো—যতীন্দ্র মোহন রায়ের কন্যা মালতী? বারো বছর আগে আমার প্রথমা কন্যা মাধুরী পাঁচ বছরের শিশু বাইরের বারান্দা থেকে হারিয়ে গিয়েছিলো সেই কামান্না শহর থেকে,
কাফ্রি বলে উঠলোহা বাবু, ওকে আমি কামান্না শহর থেকেই চুরি করে এনেছিলাম।
মিঃ রায় ছুটে এসে কাফ্রির গলাটিপে ধরলেন–ওরে শয়তান, নর পিচাশ…তুই আমার মাধুরীকে…।
জন মিঃ রায়কে ছাড়িয়ে দিয়ে বললেন—যা হবার হয়ে গেছে মিঃ রায়, এখন পূর্বের সেই শোক বিস্মৃত হয়ে নতুনভাবে এর বিচার করুন। এবার আপনারা স্পষ্ট বুঝতে পারছেন, মিস মালতী বাসুদেবের কন্যা নয়।
বাসুদেব নতমুখে বসে রইলেন।
মিঃ লাহিড়ীর চোখ দুটি তীব্র উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, বললেন—আশ্চর্য!
জন এবার বললো—এবার বুঝতে পারছেন? আরও পারবেন একটু পরে।
মিঃ লাহিড়ী পুনরায় বললেন কিন্তু মিস মালতীকে বাসুদেব যে হত্যা করেছে তার প্রমাণ?
প্রমাণ আছে মিঃ লাহিড়ী।
হঠাৎ বাসুদেব বলে উঠেন—তুমি তাকে হত্যা করেছে জন। যে হীরার হার তুমি তাকে দিয়েছিলে সেটা ফিরিয়ে নেবার জন্যই তুমি তাকে হত্যা করেছো এবং হার নিয়ে গেছো।
মিস মালতীকে যে হত্যা করেছে, সেই হার তার নিকটেই আছে একথা সত্য।
বাসুদেব কেমন যেন শিউরে উঠলেন। একটু নড়েচড়ে বসলেন তিনি।
মিঃ রায় বিষণ্ণ মুখে দাঁড়িয়েছিলেন, বার বার ঐ কাফ্রি চাকরটার দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকাচ্ছিলেন—এই মুহূর্তে কেউ বাধা না দিলে ওকে তিনি গলা টিপে হত্যা করতেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আজ সেই বারো বছর আগে হারিয়ে যাওয়া পাঁচ বছরের একটি শিশুকন্যার মুখ বার বার ভেসে উঠছিলো তাঁর চোখের সামনে। মিঃ রায় দাঁতে অধর দংশন করছিলেন।
জন এবার বাসুদেবকে টেনে তুলে দাঁড় করিয়ে দিলো এবং পর মুহূর্তেই তার পকেটে হাত দিয়ে একছড়া হীরার হার বের করে আনলো। এতোদ্রুত হস্তে এ কাজ করলো জন অবাক হলেন মিঃ লাহিড়ী।
জনের চোখে আজও সেই কালো চশমা রয়েছে, যা সে কোনো সময়ের জন্যও চোখ থেকে খোলে না।
জন সেই হারছড়া হাতে নিয়ে উঁচু করে ধরলো—এই হার ছাড়াই মালতীর মৃত্যুর কারণ।
অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলেন মিঃ লাহিড়ী-বাসুদেব তাহলে….
হাঁ, বাসুদেবই মালতীর হত্যাকারী।
মিথ্যা কথা। মালতী আমার কন্যা না হলেও তাকে আমি কন্যার মতই স্নেহ করতাম। কথা কয়টি বললেন বাসুদেব।
