মরিয়ম বেগম এলেন, সন্তানের ছবির পাশে মনিকে দেখে অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন তারপর জড়িয়ে ধরলেন মনিকে বুকের মধ্যে–দাদু! ওরে আমার নয়নের মনি, হৃদয়ের ধন–মরিয়ম বেগমের চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগলো ফোঁটা ফোঁটা অশ্রুবিন্দু।
মনিরার চোখও শুষ্ক ছিলো না, স্বামীর কথা স্মরণ করে বুকটা তার ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছিলো।
যাদুকর হরশংকর, তার অমূল্য রত্ন মনিকে হারিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো। যাদুর খেলা বন্ধ করে দিয়ে শহরময় চষে বেড়াতে লাগলো কোথায় তার মানু।
কখনও সাপুড়ের বেশে, কখনও বানর খেলোয়াড়ের ছদ্মবেশে, কখনও বা ভিখারীর বেশে হরশঙ্কর শহরের আনাচে কানাচে প্রতিটি বাড়ীতে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। কখনও বা নানা রকমের খেলনা নিয়ে বিক্রি করতো শহরের পথে পথে।
হরশংকরের চাতুরি মনিরার সুতীক্ষ্ণ বুদ্ধির কাছে পরাজিত হলো। কত সাধনা আর আরাধনার পর মনিরা তার নূরকে ফিরে পেয়েছে। এক মুহূর্ত মনিরা তার সন্তানকে নিজের কাছছাড়া করতো না। মনিরা জানতো, যাদুকর নূরকে হারিয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন ও উন্মত্ত হয়ে পড়বে কারণ তার সেরা খেলাটাই সে নূরকে দিয়ে দেখাতো। তাই নূর ওর অমূল্য সম্পদ। নিশ্চয়ই যাদুকর নূরের সন্ধানে শহরটাকে তন্ন তন্ন করে চষে ফেলবে। তাই মনিরা যতদূর সম্ভব নূরকে সাবধানে রাখতে চেষ্টা করতো।
মনিরা যখন সন্তানকে নূর বলে ডাকলো তখন সে কোনো জবাব দিলো না, মনিরা তাই ওকে জিজ্ঞাসা করেছিলো বাবা তোমাকে কি বলে ডাকতো ওরা?
কচি মুখে ভাঙ্গা ভাঙ্গা কন্ঠে জবাব দিয়েছিলো সে—মাম্মা আমাকে মনি বলে ডাকতো।
আর যাদুকর?
ঐ দাদা? যাদুকরকে নূর দাদা বলে ডাকাতো।
হাঁ, দাদা তোমায় কি বলে ডাকাতো?
দাদা ডাকতো মানু বলে।
মনিরা ওকে বুকে চেপে ধরে বললো তুমি আমার নূর। আমি তোমার নাম রেখেছিলাম নূর!
মাথা কাৎ করে বললো নূর–আচ্ছা।
অনেক সন্ধান করেও হরশংকর আর মানুকে খুঁজে পেলো না। শহরের নানা জায়গায় খুঁজে খুঁজে হয়রাণ পেরেশান হয়ে গেলো সে।
প্রায় এক সপ্তাহকাল কান্দাই শহর চষে ফিরে ক্লান্ত অবসন্ন হরশংকর, একদিন ফিরে চললো নিজের দেশে, যেখানে নূরী অহরহ চোখের পানিতে বুক ভাসাচ্ছে সেই গহন বনে।
হরশংকরকে দেখে ছুটে এলো নূরী-অনি, আমার মনিকে আমায় ফিরিয়ে দাও। আমি ওকে না দেখলে মরে যাবো যে!
হরশংকর অন্যদিন হলে অট্টহাসি হেসে উঠতো। আজ যেন সে হাসতে পারলো না, কেমন গম্ভীর মুখে বসে রইলো নিশ্চুপ হয়ে।
এরপর হরংশংকর নূরীকে নিয়ে বের হবে মনস্থ করলো। এবার যাদুর খেলা স্থগিত রেখে চলবে নাচ-গান এতেই মোটা পয়সা উপার্জন হবে তার। আর দূরদেশে নয়, নিজ দেশের মধ্যেই চালাবে সে তার ব্যবসা।
১৫.
পুলিশ অফিস।
জন গাড়ী রেখে নেমে পড়লো। পুলিশ অফিসে প্রবেশ করতেই মিঃ লাহিড়ী এবং মিঃ রায় তাকে অভ্যর্থনা জানালেন। অসময়ে জনকে পুলিশ অফিসে দেখে মিঃ লাহিড়ী কিছুমাত্র অবাক হলেন না, কারণ জন এমন আচম্বিতে আরও অনেক দিন পুলিশ অফিসে এসে হাজির হয়েছে। এটা যেন তার স্বভাব আর কি!
আজও মিঃ রায় এবং মিঃ লাহিড়ী কিছুমাত্র অবাক না হয়ে তাকে বসতে অনুরোধ জানালেন।
জন আসন গ্রহণ করেই বললো–এক্ষুণি আপনাকে আমার সঙ্গে যেতে হবে মিঃ লাহিড়ী।
কোথায়? জিজ্ঞাসা করলেন মিঃ লাহিড়ী।
পরে সব জানতে পারবেন। আপনার সঙ্গে মিঃ রায় ও কয়েক জন পুলিশ থাকবে।
মিঃ লাহিড়ী গম্ভীর কণ্ঠে বললেন—আপনার হেঁয়ালিভরা কথা অটে কিছু বুঝতে পারছি না মিঃ জন।
একটু হেসে বললো জনমালতী হত্যারহস্য আজ উদ্ঘাটন করতে চাই মিঃ লাহিড়ী। আজ আপনি খুনীকে গ্রেপ্তারে সক্ষম হবেন।
হোয়াট?
ইয়েস, ইন্সপেক্টার! আপনি বিলম্ব না করে এই মুহূর্তে তৈরী হয়ে নিন।
মিঃ লাহিড়ী মিঃ রায়ের দিকে লক্ষ্য করে বললেন—কয়েকজন পুলিশসহ তৈরী হয়ে নিন মিঃ রায়, মিঃ জনের সঙ্গে বেরুবো।
জন নিজেই ড্রাইভ করে চললো তার গাড়ীখানা। জনের গাড়ীতে মিঃ লাহিড়ী আর মিঃ রায়। পেছনে একটি পুলিশ ভ্যান—কয়েকজন পুলিশ রয়েছে তাতে!
শহরের বড় রাস্তা ধরে গাড়ীখানা উল্কাবেগে ছুটে চললো।
রাত প্রায় বারোটা হবে!
পথের জনতা অনেক কমে এসেছে।
দোকানপাট কতকগুলো বন্ধ হয়ে গেছে ইতিমধ্যে।
একটা স্বর্ণকারের দোকানের অদুরে এসে জন গাড়ী থামিয়ে ফেললো।
পূর্বেই বলা ছিলো জনের গাড়ীর প্রায় বিশ গজ দূরে পুলিশ ভ্যান থামাবে ঠিক তাই থেমে পড়লো।
জন মিঃ লাহিড়ীকে লক্ষ্য করে বললো—আপনারা বাইরে অপেক্ষা করুন আমি স্বর্ণকারের দোকানে প্রবেশ করবো। খুনী এই দোকানে অপেক্ষা করছে।
মিঃ লাহিড়ী বললেন খুনীর উপযুক্ত প্রমাণ না পেলে আপনাকে কৈফিয়ত দিতে হবে মিঃ জন।
নিশ্চয়ই দেবো মিঃ লাহিড়ী। কথা শেষ করে জন স্বর্ণকারের দোকানে। প্রবেশ করলো।
মিঃ লাহিড়ী এবং মিঃ রায় ওদিকের জানালার শার্শির পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। সেখান থেকে কক্ষের ভেতর পরিস্কার সব দেখা যাচ্ছিলো। মিঃ লাহিড়ী চমকে উঠলেন, স্বর্ণকারের দোকানে মিঃ বাসুদেব শর্মা।
এত রাতে নিহত মালতীর পিতা বাসুদেব স্বর্ণকারের দোকানে কি করছে? ভাল করে লক্ষ্য করতেই বিস্ময় জাগলো মিঃ লাহিড়ী এবং মিঃ রায়ের মনে।
বাসুদেব কোনো একটা জিনিস স্বর্ণকারের হাতে দিতে যাচ্ছিলেন ঠিক সেই মুহূর্তে জন সেখানে উপস্থিত হলো।
