ওদিকে হরশঙ্করের যাদুখেলায় মুগ্ধ দর্শকবৃন্দের করতালিতে হলঘর মুখরিত।
এদিকে বিশ্রামকক্ষ থেকে হরশঙ্করের সাথীগণ সবাই ওদিকে চলে গেছে, একা মনি শয্যায় কাৎ হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
মনিরা এতক্ষণ ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে প্রতীক্ষা করছিলো এই মুহূর্তটির। এবার সে অতি লঘু পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়ে মনির শয্যার পাশে দাঁড়ালো ঝুঁকে পড়ে দেখতে লাগলো মুনির মুখখানা। তারপর অতি সন্তর্পণে মনির দক্ষিণ হাতখানা উঁচু করে ধরলো চোখের সামনে এই তো সেই স্মরণীয় চিহ্ন যা আজও তার মনের পাতায় গভীরভাবে আঁকা হয়ে রয়েছে। মনিরা অতি ধীরে ধীরে মনির হাতখানা নামিয়ে রাখলো। পেয়েছে সে তার বহু দিনের হারানো রত্নকে। মনিরা কিছুতেই নিজকে সংযত রাখতে পারলো নালঘু হস্তে বুকে তুলে নিলো মনিকে।
কদিন অবিরত খেলা দেখিয়ে মনির শিশু দেহ ক্লান্তিতে অবসন্ন হয়ে পড়েছিলো, মনিরার কোমল হস্তের পরশে তার ঘুম ভাঙলো না।
মনিরা শিশু মনিকে বুকে তুলে নিতেই দরজার বাইরে কারও পদশব্দ শোনা গেলো।
মনিরা এই মুহূর্তে সম্বিৎ হারালো না, সে দ্রুত এবং অতি সন্তর্পণে দরজার একপাশে আত্মগোপন করলো।
একজন বলিষ্ঠ লোক প্রবেশ করলো সেই কক্ষে।
শিউরে উঠলো মনিরা এই মুহূর্তে যদি লোকটা তার অবস্থিতি জান? পারে তাহলে আর রক্ষা নেই নূরকেও হারাবে, নিজেও বিপদে পড়বে। মনিরা খোদার নাম স্মরণ করতে লাগলো।
লোকটা যেমনি ওপাশে মনির বিছানার দিকে এগিয়ে গেছে ঠিক সেই সময় মনিরা দরজার পাশ থেকে বেরিয়ে গেলো বাইরে। তারপর অতি আলগোছে আত্মগোপন করে একটা গাড়ীর পাশে এসে দাঁড়ালো। চারদিকে নজর বুলিয়ে নিয়ে ড্রাইভারকে বললো—ভাড়া যাবে?
ড্রাইভার বললো–হাঁ মাজী। আপ যাওগী?
হাঁ চলো। মনিরা শিশু মনিকে নিয়ে গাড়ীতে উঠে বসলো।
ড্রাইভার স্টার্ট দিলো গাড়ীতে। গাড়ী এবার উল্কাবেগে ছুটতে লাগলো।
ঘুম ভেঙে গেলো মনির গাড়ীর ভেতরে অন্ধকার থাকায় সে কিছুই দেখতে না পেলেও অবাক হলো বললো—আমাকে তোমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছো?
মনিরা বললো–বাড়ীতে।
তুমি কে? কচি মনি স্পষ্ট কণ্ঠে প্রশ্ন করে বসলো।
আমি-আমি তোর মা!
না, আমার মা তুমি নও। তুমি কে আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো?
গিয়ে দেখো বাবা।
এদিকে যখন মনিকে নিয়ে মনিরা গাড়ীতে ছুটে চলেছে, তখন স্বপ্নরাগ থিয়েটার হলের হরশঙ্করের বিশ্রামকক্ষে হুলস্থুল পড়ে গেছে। তাদের খেলার শিরোমণি মানু নেই।
হরশঙ্কর মনির নাম রেখেছিলো মানু।
মানুর অন্তর্ধানে হইহুল্লোড় পড়ে গেলো, হরশঙ্কর রাগে বোমার মত ফেটে পড়লো। তাজ্জব ব্যাপার—এত সতর্কতার মধ্যেও কি করে মানু হারালো! কোথায় গেলো, কে তাকে নিয়ে গেলো?
সেদিন আর তেমন করে খেলা জমলো না।
ওদিকে মনিকে নিয়ে মনিরার গাড়ী চৌধুরী বাড়ীর গাড়ী বারান্দায় পৌঁছতেই শশব্যস্তে ছুটে এলেন সরকার সাহেব ও নকীব।
মনিরা ততক্ষণে মনিকে কোলে করে গাড়ী থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে। তাড়াতাড়ি ব্যাগ খুলে দশ টাকার কয়েকটা নোট ড্রাইভারের হাতে গুঁজে দিয়ে দ্রুত অন্তপুরে প্রবেশ করলো।
সরকার সাহেব ও নকীব হতবাক হয়ে অনুসরণ করলো তাকে। সরকার সাহেব শিশুটিকে দেখেই চিনতে পেরেছিলেন, এই শিশুই কাল রাতে তাদের সকলের সামনে একটা বিরাট বাঘের সঙ্গে লড়াই করেছিলো।
আগে আগে চলেছে মনিরা কোলে তার শিশু মনি।
পেছনে বিস্ময়ভরা চোখে এগুচ্ছে সরকার সাহেব ও নকীব।
মনিরা ছুটে এলো মামীমার কক্ষে—মামীমা, দেখো দেখো কে এসেছে!
মনিরার কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েই মরিয়ম বেগম ব্যস্তভাবে এগিয়ে এলেন। মনিরার দিকে তাকিয়ে তার কোলে গত রাতের সেই শিশুটিকে দেখতে পেয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। বিস্ময়ের ঘোর কাটতেই বললেন-—একে তুই কোথায় পেলি মনিরা?
মামীমা, এ যে আমার নূর। একে তুমি চিনতে পারছো না?
পাগলী মেয়ে, তোর নূরকে হারিয়েছিস ছোট এক বছরের শিশু আর একে তুই চিনলি কি করে?
এই দেখো–মামীমা, মনির কচি হাতখানা তুলে ধরলো। এই সেই চিহ্ন যা আজও আমি ভুলতে পারিনি।
মরিয়ম বেগমের চোখের সামনে আর একটি কচি বাহু ভেসে উঠলো। আতুর ঘরে তার নিজের সন্তান মনিরের বাহুখানা। দাইমা নবজাত শিশুটিকে কোলে তুলে নিয়ে বলেছিলো—বেগম সাহেবা, আপনার ভাগ্য অতি প্রসন্ন। রাজটিকা নিয়ে রাজকুমার এসেছে আপনার ঘরে। এ মস্ত একজন হবে —মরিয়ম বেগম আজ সেই কথা স্মরণ করেন। এ যে তার দক্ষিণ বাহুর সংকেত চিহ্ন–তবে কি, তবে কি এটাই তার বংশের প্রতীক তার মনিরের সন্তান, মরিয়ম বেগম তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে দেখতে লাগলেন ওকে। হঠাৎ মরিয়ম বেগম অস্ফুট ধ্বনি, করে উঠলেন-মনিরা তোর হারানো ধন ফিরে পেয়েছিস সেই মুখ, সেই চোখ, সেই নাক, আমার মনিরের সব চেহারাই পেয়েছে–
শিশু মনি এসব দেখে হাবা বনে গেছে। অবাক হয়ে দেখছে এসব। ছোট্ট হলেও তার মন বা হৃদয় বলে তো একটা জিনিস আছে। শিশুকাল থেকে সে বন বাদাড়েই মানুষ হয়েছে সভ্য সমাজে মিশবার তেমন সুযোগ হয়নি এখনও। চৌধুরীবাড়ীর সাজসজ্জা, বিরাট বাড়ী নানা রকমের আসবাবপত্র আলোর ঝড় কত রকমের কারুকার্যখচিত ফুলদানি এসব শিশু মনির চোখে রাজ্যের বিস্ময় জাগালো। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে সব দেখতে লাগলো।
মনিরা মনিকে পেয়ে আকাশের চাঁদ যেন হাতে পেলো। সর্ব প্রথম মনিকে নিয়ে ছুটে গেলো মনিরা বনহুরের ছোট বেলার ফটোখানার পাশে। মনিকে দাঁড় করিয়ে বার বার তাকিয়ে দেখতে লাগলো বনহুরের ছোটবে–চেহারাখানা আর শিশু মনিকে। ডাকলো মামীমা, দেখে যাও। দেখে যা এসে, দেখে যাও এসে।
