খেলা শুরু হয়ে গেছে।
যাদুকর একপাশে উদ্যত চাবুক হাতে দন্ডায়মান।
বলিষ্ঠ লোকটা চাকাওয়ালা কাঠের বাক্সটার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।
বাক্সের মধ্যে শিকের ফাঁকে বিরাট বাঘটা হুম হুম করে গর্জন করছে।
দর্শকগণ ভয়ে কম্পিত হলো হঠাৎ বাঘটা যদি তাদের আক্রমণ করে বসে তখন কি হবে! তবু সবাই বুকে সাহস নিয়ে দুচোখে রাজ্যের ব্যাকুল আগ্রহভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো, খেলাটা তাদের দেখতেই হবে।
বলিষ্ঠ লোকটা কাঠের বাক্সের দরজা খুলে দিতে গিয়ে শিশুটিকে হাতের ইশারায় ডাকলো।
শিউরে উঠলো মনিরা, এও কি সম্ভব—এইটুকু কচি শিশু একটা বিরাট বাঘের সঙ্গে লড়াই করবেনা না, এ খেলা সে দেখতে পারবে না। কেন যেন তার বড্ড অস্বস্তি লাগছে।
যাদুকর এগিয়ে এলো, সঙ্গে সঙ্গে কাঠের বাক্সটার দরজাটা মুক্ত করে দিয়ে সরে দাঁড়ালো।
মুহূর্তে বাঘটা গর্জন করে বেরিয়ে এলো।
সঙ্গে সঙ্গে শিশু মনি বাঘটার গলা জাপটে ধরে ফেললো, চড়ে বসলো বাঘের পিঠে দুহাতে বাঘটার গলা চেপে ধরে চাপ দিতে শুরু করলো। শুরু হলো বাঘের সংগে শিশুর লড়াই।
যাদুকর মাঝে মাঝে তার চাবুক উঁচু করে সপাং করে একটা শব্দ করেছিলো বাঘটা তখন মাটিতে চীৎ হয়ে পড়ে যাচ্ছিলো শিশু মনি চেপে বসছিলো তার বুকের ওপর। অনেকক্ষণ ধরে শিশু আর বাঘটার লড়াই চললো—হঠাৎ এক সময় শিশু মনি পড়ে গেলো নীচে, অমনি বাঘটা ঝাপিয়ে পড়লো ওর বুকের ওপর।
দর্শকমন্ডলী হা, হা করে উঠলো–যারা এতক্ষণ স্তব্ধ নিঃশ্বাসে শিশু আর বাঘের খেলা দেখে হতবাক–অবাক হচ্ছিলো তারা আর্তনাদ করে উঠলো এবার।
সঙ্গে সঙ্গে মনিরা দুহাতে চোখ ঢেকে ফেললো।
তারপর আর কিছু মনে নেই মনিরার।
যখন মনিরার সংজ্ঞা ফিরে এলো, তখন সে দেখলো তার নিজের কক্ষে বিছানায় সে শুয়ে আছে। শিয়রে বসে রয়েছেন মরিয়ম বেগম দুচোখে তার রাজ্যের আকুলতা আর উদ্বিগ্নতা। একপাশে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ সরকার সাহেব ও নকীব। পাশে একটা চেয়ারে বসে ডাক্তার।
মনিরা চোখ মেলেই বলে উঠলো—মামীমা!
বলো মা?
আমার নূর কেমন আছে?
নূর! নূর কোথায়?
মনিরা তার হারিয়ে যাওয়া শিশু নূরের সম্বন্ধে মরিয়ম বেগমের নিকটে অনেক কথাই বলেছিলো। নূর কেমন আছে বলতেই মরিয়ম বেগম বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললেন—কোথায়, কোথায় তোমার নূর মনিরা?
মনিরা চারদিকে তাকিয়ে দেখে বললো—ঐ যে বাঘের সঙ্গে লড়াই করছিলো!
সে তো যাদুকরের ছেলে।
না, আমার নূর ছাড়া সে অন্য কেউ নয়! মামীমা, তুমি দেখোনি সেই মুখ সেই চোখ দক্ষিণ বাজুতে সেই অদ্ভুত চিহ্ন—মামীমা, আমার নূর ছাড়া সে অন্য কেউ নয়। বলো বলো মামীমা সে বেঁচে আছে-বাঘটা তাকে মেরে ফেলেনি তো?
নারে না, তুই অমন হয়ে পড়লি—তোকে নিয়েই আমরা অস্থির হয়ে পড়লাম-ওদিকে দেখবার সময় ছিলো না।
তাহলে তোমরা জানো আমার নূরের কি হলো?
ডাক্তার গম্ভীর কণ্ঠে বললেন—আপনি চুপ করে থাকুন। এখন বেশী কথা বললে খারাপ হবে।
না, আমি চুপ করে থাকতে পারবো না, আগে বলুন আমার নূর কেমন আছে?
কোথায় আপনার নূর? সে তো যাদুকরের ছেলে।
না, সে আমার নূর। কি করে বুঝলেন সে আপনার নূর?
আমি চিনবো না, আমার নূরকে চিনবো না সেই মুখ সেই চোখ, দক্ষিণ বাজুতে সেই চিহ্ন-আমার নূর ছাড়া ও আর কেউ নয়।
ডাক্তার এবারও বললেন–হুঁ, সে সুস্থ আছে।
সত্যি বলছেন?
হাঁ।
সেদিনের পর থেকে মনিরা কেমন যেন আনমনা হয়ে পড়লো, সব সময় যাদুকরের যাদুখেলা দেখতে যাবার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে।
কিন্তু মরিয়ম বেগম কিছুতেই তাকে যাদুখেলা দেখতে যাবার অনুমতি দিলেন না। মরিয়ম বেগমের বিশ্বাসমনিরা তার নিজের সন্তানের মত চেহারার ছেলেকে দেখে অমন আত্মহারা হয়ে পড়েছে! আসলে ওর ছেলে কোথায় হারিয়ে গেছে, এতটুকু ছেলে বেঁচে আছে না মরে গেছে তাই বা কে জানে। মনিরার এই ব্যথা করুণ ভাব মরিয়ম বেগমকেও বেশ চঞ্চল করে তুললো। মরিয়ম বেগম মনিরাকে যতই সাবধানে রাখুন না কেন একদিন সকলের অলক্ষ্যে মনিরা একটা টেক্সি ডেকে বেরিয়ে পড়লো।
খেলা শুরু হবার পূর্বে স্বপ্নরাগ হলের সামনে অসংখ্য ভীড় জমে উঠেছে। রাস্তার অগণিত গাড়ী সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে। শহরের সেরা লোকজনও বাদ যায়নি হরশংকরের যাদু খেলা দেখা থেকে।
মনিরার গাড়ী এসে থামলো স্বপ্নরাগ হলের সামনে, গাড়ীর ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে নেমে পড়লো মনিরা। জনস্রোতের মধ্যে মিশে গেলো সে।
অতি সন্তর্পণে আত্মগোপন করে হরশংকরের বিশ্রামকক্ষে প্রবেশ করলো মনিরা। হরশংকর তখন মঞ্চে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। অদূরে একটা শয্যায় শায়িত শিশু মনি একটা কিছু নিয়ে খেলা করছে সে। মনিরা লুকিয়ে পড়লো এক পাশের একটা খামের আড়ালে। হরশংকর এবার বেরিয়ে গেলো, যাবার সময় শিশু মনিকে লক্ষ্য করে বললো সেমানু, ঘুমাবে না খবরদার।
মনি ভয়ার্ত কণ্ঠে বললো—না, আমি ঘুমাবো না।
হরশংকর বেরিয়ে গেলো।
শিশু মনি শয্যায় বসে হাই তুলতে লাগলো—দ্বিপ্রহরে একটা শো হয়ে গেছে। মনি ক্লান্ত হয়েছে–এলিয়ে পড়ছে তার ছোট্ট শরীরটা। কিন্তু হরশংকরের ভয়ে সে ঘুমাতে পারছে না। ছোট মনি কতক্ষণ নিদ্রাহীন। থাকতে পারে কতক্ষণই বা হরশংকরের চাবুকের কথা তার স্মরণ থাকে একসময় হাতের খেলনাটা খসে পড়লো একপাশে, মনি এলিয়ে পড়লো বিছানায়।
