অদূরেই মনিরা বসে কি যেন সেলাই করছিলো। মামীমার কথায় নকীব বিজ্ঞাপনখানা তার হাত থেকে নিয়ে মনিরার হাতে দিয়ে বললো—এক যাদুকর এসেছে খুব সুন্দর খেলা দেখায়।
তাই নাকি? মনিরা বিজ্ঞাপনখানা নকীবের হাত থেকে নিয়ে দেখতে লাগলো। বিজ্ঞাপনে একটা ছোট্ট শিশু একটা বাঘের সঙ্গে লড়াই করছে, বড় ভাল লাগলো ওর কাছে। বললো সেমামীমা, সত্যি বড় অদ্ভুত এতটুকু তিন-চার বছরের একটা ছেলে বাঘের সঙ্গে লড়াই করবে এটা কম কথা নয়। যাবে মামীমা দেখতে?
ওসব আমার ভাল লাগে না মনিরা।
মামীমা, আমার বড় দেখতে ইচ্ছে করছে।
তাহলে সরকার সাহেবকে বলে দাও টিকিট করে আনতে।
মনিরা খুশী হয়ে নকীবকে বললো–সরকার সাহেবকে পাঠিয়ে দাও।
নকীব চলে গেলো।
যাদুর খেলা শুরু হবার অনেক পূর্বেই মামীমা ও সরকার সাহেব সহ মনিরা স্বপ্নরাগ থিয়েটার হলে গিয়ে হাজির হলো। আজ যেন মনিরাকে কোনো মায়ার আকর্ষণ প্রবলভাবে আকর্ষণ করে নিয়ে এসেছে এখানে। কেমন যেন একটা বিপুল আগ্রহ তার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। যাদুকরের বাচ্চা শিশুটাকে দেখবার জন্যই মনিরা ছুটে এসেছে আজ যাদুকরের যাদুখেলা দেখতে।
সামনে ভেলভেটের গভীর লাল পর্দা ঝুলছে। পর্দার ওপর আঁকা শিশু আর বাঘের লড়াইয়ের ছবি। বাঘটা নীচে পড়ে রয়েছে একটি শিশু বাঘটার গলা টিপে ধরেছে। অদ্ভুত দৃশ্য, মনিরার হৃদয়ে একটা অনুভুতি নাড়া দিয়ে যাচ্ছে। ব্যাকুল আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে মনিরা ঐ পর্দার ওপরে কালো কাপড়ে আঁকা ছবির দিকে।
একটা অদ্ভুত ধরনের বাঁশির সুর ভেসে আসছিলো পর্দার ওপাশ থেকে। গোটা হলঘরের মধ্যে সেই সুরের আবেশ মোহ সৃষ্টি করে তুলেছিলো। দর্শকগণ তন্দ্রাচ্ছন্নের মত তাকিয়েছিলো লাল পর্দাটার দিকে।
এমন সময় পর্দা নড়ে উঠলো।
আকুল আগ্রহে তাকালো সবাই সেইদিকে।
ছুরি দিয়ে চিরে দুফাঁক করার মত ধীরে ধীরে দুদিকে সরে গেলো লাল পর্দাটা। সামনে স্পষ্ট দেখা গেলো লম্বা একটা টেবিল। টেবিলে কাপড়ে ঢাকা রয়েছে কোনো একটা জিনিস। টেবিলের পাশে দাঁড়ানো বলিষ্ঠ অদ্ভুত চেহারার একটা লোক। লোকটার শরীরে গাঢ় লাল রঙের কোট-প্যান্ট। সবকিচুই লাল, এমনকি গলার টাইটাও লাল টকটকে! যাদুকরের চোখ দুটোও যেন তার পোশাকের সংগে খাপ খেয়ে গেছে, লাল গোলাকার দুটি চোখ। মাথার ক্যাপ রয়েছে ক্যাপটার দুপাশ দিয়ে যতটুকু চুল বেরিয়ে আছে তাও লাল দেখা যাচ্ছে। লোকটার শরীরের রঙ তামাটে। দক্ষিণ হাতে একটি কঙ্কালের টুকরা।
যাদুকর এবার কঙ্কালের টুকরাখানা নিয়ে উঁচু করে ধরলো। একবার টেবিলে কাপড় ঢাকা জিনিসটার ওপর বুলিয়ে নিয়ে বললো—এই কাপড়ের নিচে কি আছে আপনারা কেউ জানেন না। আমি কাপড়টা তুলে ফেলছি দেখুন–
কাপড়টা তুলে ফেললো, সবাই দেখলো একটি বালিকা মৃতের ন্যায় টেবিলে শায়িত। বালিকা নিদ্রিত না জাগরিত ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
দর্শকগণ সবাই একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে সেইদিকে। যাদুকর নিদ্রিত বালিকাটিকে পুনরায় কাপড়চাপা দিলো। এবার যাদুকর হাড়খানা নিয়ে একবার কাপড়-ঢাকা বালিকার দেহের ওপর বুলিয়ে নিলো, তারপর কাপড়খানা তুলে ফেললো, আশ্চর্য হয়ে সবাই দেখলো-টেবিল শূন্য-একটি লম্বা বলিশ পড়ে রয়েছে টেবিলটার ওপরে। যাদুকর এবার বালিশটা ঢেকে নিয়ে হাড়খানা বুলিয়ে বললো—আপনারা বালিশটাকে কিসের আকারে দেখতে চান?
একজন দর্শক বলে উঠলো—কুকুরের আকারে।
অন্য সকলেই বললো-হাঁ, আমরা সবাই একমত।
যাদুকর হাসলো, তারপর কাপড় ঢাকা বালিশটার ওপরে হাড়-খানা বুলিয়ে বিড় বিড় করে কি যেন মন্ত্র পাঠ করলো। তারপর তুলে ফেললো কাপড়খানা!
বিস্ময়ের ওপর বিস্ময় সবাই স্তব্ধ দৃষ্টি মেলে দেখলো টেবিলে শুয়ে রয়েছে একটি কুকুর। কাপড়খানা তুলে ফেলতেই কুকুরটা ঝাপটা দিয়ে উঠে দাঁড়ালো।
দর্শকের করতালিতে ভরে উঠলো হলঘর।
আরও বিস্ময়কর অনেক খেলা দেখালো যাদুকর হরশঙ্কর।
হলঘর স্তব্ধ।
দর্শকগণ নির্বাক নয়নে খেলা দেখছিলো, এমন খেলা তারা কোনোদিন দেখেনি।
মনিরা ব্যাকুল আগ্রহে প্রতীক্ষা করছিলো—সেই শিশু বাঘের সঙ্গে লড়াইর দৃশ্যটা দেখবার জন্য।
সবশেষ খেলা সেটা।
সমস্ত দর্শক বিপুল আগ্রহ নিয়ে প্রতীক্ষা করছিলো।
মঞ্চে দাঁড়িয়ে যাদুকর তার বাঁ হাতে সেই কঙ্কালের টুকরাখানা আর দক্ষিণ হাতে একটা চাবুক।
একটা শিস দিলো যাদুকর।
অল্পক্ষণের মধ্যেই একজন বলিষ্ঠ লোক একটা তিন চার বছরের শিশুসহ মঞ্চে উপস্থিত হলো। পেছনে চাকাওয়ালা একটা কাঠের বাক্স টেনে
আনছে আর একজন বলিষ্ঠ লোক।
শিশুটিকে এনে দাঁড় করানো হলো।
দর্শকমন্ডলী একসঙ্গে তাকিয়ে আছে। মনিরা শিশুর দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলো, বিস্মিত হলো সে। হৃদয়ে একটা আলোড়ন শুরু হলো তার। এ মুখখানা যেন তার কোনো পরিচিত মুখের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। এক মাথা সুন্দর কোঁকড়ানো চুল। ছোট্ট দেহ হলেও সুন্দর নধর চেহারা। উজ্জ্বল গৌর বর্ণ। গভীর নীল দুটি চোখ। মনিরা কেমন যেন আনমনা হয়ে যাচ্ছে। নিজেই সে বুঝতে পারছে না তার এমন লাগছে কেন। অপলক নয়নে তাকিয়ে আছে মনিরা শিশুটির দিকে। অভূতপূর্ব একটা আকর্ষণ মনিরাকে হাতছানি দিচ্ছে। প্রবল বাসনা জাগছে তার মনে। একটি বার ঐ শিশুটিকে বুকে নিতে পারলে তার সমস্ত হৃদয় যেন জুড়িয়ে যেতো। কিন্তু মনিরা ভেবে পায় না কেন তার এমন হচ্ছে। ঐ ক্ষুদ্র মুখখানার সঙ্গে তার মনিরের মুখের হুবহু মিল সে যেন খুঁজে পাচ্ছে। না না তার ভুল নেই তার স্বামীর মুখখানাই যেন ঐ শিশুর মুখে লুকিয়ে রয়েছে। মনিরার মনে ভীষণ এক অশান্ত আলোড়ন শুরু হলো।
