আচ্ছা অরুণবাবু হারটা কি মালতী সব সময় পরতো?
না, কোনো কোনো বিশেষ দিন ছাড়া ঐ হার সে পরতো না এবং হারছড়া সে অতি সাবধানে ব্যাঙ্কে রেখে আসতো, এমনকি কোনোদিন রাতে ঐ হার নিজের বাসায় রাখতো না।
কেন, তার বাবা বাসুদেবকেও সে বিশ্বাস করতো না কি?
না, সে কথা নয়। মালতী ঐ মূল্যবান হারছড়া বাসায় বা সরাইখানায় রাখা নিরাপদ মনে করতো না। যদিও অনেক সময় বাসুদেব বলেছেন-হারছড়া তাঁর কাছে রাখলে কোনো ভয় নেই চুরি যাবার।
হুঁ, মিস মালতীর এত সাবধানতা সত্ত্বেও একবার হারছড়া চুরি গিয়েছিলো না অরুণবাবু?
হাঁ গিয়েছিলো।
কিছুক্ষণ পর পুনরায় ফেরত পায় তাই না?
এ কথা আপনি কি করে জানলেন?
আরও জানি—সেইদিনই মালতী নিহত হয়।
আপনি–আপনি—
আমি সব জানি!
মুহূর্তে অরুণ বাবুর মুখমন্ডল ফ্যাকাশে হয়ে যায়। মিঃ লাহিড়ীর মুখে ভাবও বেশ ভাবাপন্না হয়ে ওঠে। ভূ-কুঞ্চিত করে তাকান জনের মুখের দিকে।
জন বলে ওঠে—চলুন মিঃ লাহিড়ী। অরুণ বাবুর কাছে আমার যা জানবার ছিলো জানা হয়ে গেছে।
পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ লাহিড়ী ও জন হাজত কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো বাইরে।
জন বললো মিস মালতীর পোষ্টমর্টেম রিপোটখানা একটু দেখতে চাই।
মুখোভাব পূর্বের ন্যায় গম্ভীর করে বললেন মিঃ লাহিড়ী—আচ্ছা চলুন।
পুলিশ অফিস থেকে জন যখন ফিরলো তখন ভোর হয়ে গেছে। সূর্যের আলোয় ঝকমক করছে গোটা পৃথিবী।
১৪.
হরশঙ্কর আজকাল নূরীকে নাচ শিক্ষা দিচ্ছে। তার কথামত নাচতে না পারলে চাবুকের আঘাতে জর্জরিত করে তোলে তাকে। নানাভাবে যন্ত্রণা অর কষ্ট দেয়া হয়। অন্যান্য মেয়ের চেয়ে নূরী অনেক সুন্দরী, নূরীকে নাচিয়ে। হরশঙ্কর বেশী পয়সা উপার্জন করবে তাই ওকে মেরেপিটে সুন্দরভাবে নতুন নতুন নাচ শেখাচ্ছে।
নূরীর নাচ শিক্ষা চলছে—আর মনিকে নিয়ে দেখানো হচ্ছে নানা রকম যাদুখেলা। মনিকে নিয়ে শহরে শহরে যায় হরশঙ্কর বহু দূরদেশেও চলে যায়। নৌকা-ষ্টিমারে জাহাজে। কখনও ট্রেনে বা প্লেনেও যায় হরশঙ্কর। সে তো আর সাধারণ যাদু খেলোয়াড় নয়। তার খেলা অতি ভয়ঙ্কর, অতি সাংঘাতিক। পয়সাও পায় সে প্রচুর। দেশ হতে দেশান্তরে তার বিচরণ। হরশঙ্করের অসাধ্য কোনো কাজ নেই। যে যুবক বা যুবতীর সাথে একবার নিভৃতে তার দেখা হয়েছে তাকেই সে মায়াজালের আবেষ্টনীতে আবদ্ধ করে ফেলেছে। বহু বালক-যুবতী-শিশুকে সে ফুসলিয়ে নিয়ে এসে অন্য জায়গায় বিক্রি করে মোটা পয়সা পেয়েছে। যাকে সে বাধ্য করতে পেরেছে বা যাকে দিয়ে পয়সা উপার্জন করা যাবে বলে মনে করেছে তাকে রেখে দিয়েছে নিজের যাদুর প্রাচীরে ঘেরা গহন বনের মধ্যে। যেখানে সাধারণ লোক বা জীবজন্তু প্রবেশে সক্ষম নয়।
দিন যায়। নূরী সুন্দরভাবে নাচ শিখে ফেলে, অদ্ভুত সে নাচ। সাধারণ নারীর পক্ষে সে ধরনের নাচ অসম্ভব।
হরশংকর একদিন মনিকে সঙ্গে করে প্লেনযোগে রওয়ানা দিলো দূরদেশে। আরাকান, হাবলুন হয়ে একদিন কান্দাই শহরে পৌঁছলো হরশংকর আর মনি। অবশ্য সঙ্গে তাদের আরও কয়েকজন তোক ছিলো-এরা হরশংকরের সঙ্গী বা সাথী।
কান্দাই-এ হই হই রই রই পড়ে গেলো, বিশ্ববিখ্যাত যাদুকর হরশঙ্কর যাদুর খেলা দেখাতে এসেছেন কান্দাই শহরে।
শহরের সেরা থিয়েটার হলে হরশংকর তার খেলা দেখাবেন। বেলা চারটা থেকে টিকিট বিক্রি হচ্ছে। হল লোকে লোকারণ্য।
সন্ধ্যার পর খেলা শুরু হবে।
সংবাদটা একসময় চৌধুরীবাড়ীতেও গিয়ে পৌঁছলো। নকীব একটা বিজ্ঞাপন নিয়ে হাজির হলো মরিয়ম বেগমের সামনে আম্মা, কান্দাই এ একজন খুব নামকরা যাদুকর এসেছে। সে নাকি অনেক অদ্ভুত খেলা দেখায়। একটা ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে এসেছে যাদুকর। এই দেখো বাচ্চাটার ছবিও রয়েছে বিজ্ঞাপনে। ছেলেটা বাঘের সঙ্গে লড়াই করবে।
মরিয়ম বেগম বিজ্ঞাপনটা হাতে নিয়ে দেখলেন। সেই যে বনহুর বলে যাবার পর থেকে মনমরা হয়ে গেছেন, দুনিয়ার কোনো কিছুই তিনি মন প্রাণে গ্রহণ করতে পারেন না। মনিরার অবস্থাও মরিয়ম বেগমের চেয়ে কম। নয় কিন্তু তবু সে মনটাকে শক্ত করে নিয়েছিলো; মামীমাও ভেঙ্গে পড়েছেন, সেও যদি মুষড়ে পড়ে তাহলে চলবে কি করে। তার মন বলছে বনহুর বেঁচে আছে, একদিন ফিরে সে আসবে। কিন্তু এসে যদি সে তাদের কাউকে না দেখে সে ফিরে আসার আগেই তারা যদি মরে যায়–না না, বেঁচে থাকতে হবে, মরলে তার চলবে না। তার বনহুর আসবে কত আশা কত বাসনা নিয়ে মনিরার মনে সেই আশার স্বপ্ন তাকে বেঁচে থাকার প্রেরণা যোগায়।
মরিয়ম বেগমকে সান্ত্বনা দেয় মনিরা, মামীমা তুমি হারিয়েছো তোমার সন্তান, আর আমি হারিয়েছি স্বামী-পুত্র দুজনকেই। ভেঙ্গে পড়লে সব শেষ হয়ে যাবে-নিঃশেষ হয়ে যাবে সবকিছু। সে যদি কোনোদিন ফিরে আসে তখন কি হবে? কে তাকে সামলাবে তোমার ছেলে যে বড়ই আঘাত পাবে সেদিন।
মরিয়ম বেগম বলেছিলেন আমার মনির বেঁচে আছে?
হাঁ, মামীমা, মন বলছে সে বেঁচে আছে।
এরপর থেকে মরিয়ম বেগম ভেতরে ভেতরে গুমড়ে কেঁদে মরলেও প্রকাশ্যে আর তেমন করে কাঁদাকাটি করতেন না, পাষাণের মত হৃদয়কে শক্ত করে নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মনকে কঠিন করলেও অন্তরে দুঃসহ জ্বালা দগ্ধীভূত করছিলো।
আজ নকীব বিজ্ঞাপনটা তার হাতে এনে দিলে তিনি একবার দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে মনিরাকে বললেন—দেখতো কি এটা?
