না না, তা করবো না।
বলুন তবে!
মালতীকে আমি ভালবাসতাম।
শুধু কি ভালবাসতেন, না তার সঙ্গে অন্য কোনো রকম সম্পর্ক–মানে আপনাকে প্রথমেই বলেছি কোনো রকম দ্বিধা করবেন না আমার কাছে।
হাঁ, মালতী বলেছিলো সে আমাকে বিয়ে করবে এবং সে কারণেই আমি তাকে ভালবাসতাম ও তার বাড়ীতে থাকতে রাজী হয়েছিলাম।
জন আর একবার মিঃ লাহিড়ীর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে নিলো।
মিঃ লাহিড়ীও অরুণবাবুর কথাগুলো অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে শুনে যাচ্ছিলেন।
জন বললো-শুধু কি মিস মালতীর কথাতেই আপনি তার বাসায় থাকতে রাজী হয়েছিলেন?
না, তার বাবা বাসুদেবও আমাকে ওখানে থাকবার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলেন।
আপনি কি একাই মালতীর বাড়ীতে থাকতেন?
না, একটা কাফ্রি চাকরও থাকতো। সে নিচের তলায় ঘুমাতো।
আর আপনি?
আমি–আমি একটু ইতস্ততঃ করে বললো অরুণ বাবু—আমি মালতীর পাশের কামরায় থাকতাম। তবে আমাকে প্রায় রাতেই বাইরে কাটাতে হতো।
কেন?
বাসুদেব নানা কাজে আমাকে বাইরে পাঠাতেন।
তখন মালতীর কাছে, মানে ঐ বাসায় কে থাকতো?
ঐ কাফ্রি চাকরটা। আমি কোনো কোনো দিন রাতে ফিরে আসতাম।
জন কি যেন ভাবলো, তারপর বললো—মিঃ লাহিড়ী আপনি মনোযোগ সহকারে এর কথাগুলো শুনে যাবেন।
হাঁ, মিঃ জন আমি আপনাদের উভয়ের কথা বার্তাই অতি মনোযোগ সহকারে শুনে যাচ্ছি।
ধন্যবাদ মিঃ লাহিড়ী! পুনরায় ফিরে তাকায় জন অরুণ বাবু মুখের দিকে——আচ্ছা অরুণ বাবু?
বলুন?
মিস মালতী সরাইখানা থেকে কত রাতে বাসায় ফিরতো?
তার কোন ঠিক সময় ছিলোনা। কারণ সে কোনো কোনো রাত দুটো-তিনটে পর্যন্ত সরাইখানায় কাটাতো।
শুধু কি নাচ গানের জন্যই সরাইখানায় তাকে অত রাত পর্যন্ত রাখতে তার বাবা বাসুদেব?
অরুণবাবু মাথা নত করলো, কোনো জবাব দিলো না?
জন ও মিঃ লাহিড়ী দৃষ্টি বিনিময় করলো। উভয়ের মুখেই মৃদু হাসির আভাস ফুটে উঠে মিলিয়ে গেলো।
মিঃ লাহিড়ী বললেন—অর্থের লোভে মানুষ কতদূর নীচ হতে পারে! আপন কন্যাকেছিঃ ছিঃ ছিঃ।
জন মিঃ লাহিড়ীর কথার কোনো জবাব না দিয়ে অরুণ বাবু বললো—এসব জেনেও আপনি মালতীকে বিয়ে করতে রাজী ছিলেন?
অরুণ বাবু কোনো জবাব না দিয়ে একবার মিঃ জনের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে নিলো। পুনরায় দৃষ্টি নত করে সে।
মিঃ লাহিড়ী গম্ভীর কণ্ঠে বললেন—উনি যা প্রশ্ন করছেন তার জবাব দিন অরুণবাবু। লজ্জার স্থান এটা নয়।
অরুণ বাবু পুনরায় চোখ তুললো।
জন বললো মালতীর চরিত্রহীনতার কথা জেনেও আপনি তাকে ভালবাসতেন?
হাঁ, ওকে আমার ভাল লাগতো।
সেটা কি ওর অর্থ, না ওকে?
ওকে।
তাই বুঝি কোনো ঘৃণা ছিলো না ওর ওপর?
হাঁ, যাকে ভালবাসা যায় তাকে ঘৃণা করা যায় না।
অদ্ভুত মানুষ আপনি অরুণবাবু। একটু হেসে বললো জনআমিও একদিন মালতীকে গভীরভাবে ভালবাসতাম, সমস্ত অন্তর দিয়ে ভালবাসতাম। আমার ভাবী স্ত্রী মিস এ্যানি আমার নিকটে একটা হীরার হার গচ্ছিত রেখে লন্ডন গিয়েছিলো ওর বাবার সঙ্গে। মিস মালতীর সঙ্গে আমার যখন ভালবাসা গভীরভাবে জমে ওঠে তখন আমি এ্যানির সেই গচ্ছিত হীরার হার তাকে উপহার দেই।
তারপর একদিন লন্ডন থেকে আমার ডাক এলো। চলে গেলাম। যবার সময় মালতী আমাকে অনেক কথাই বলেছিলো। সে বলেছিলো জন তুমি ফিরে না আসা পর্যন্ত আমি তোমার প্রতীক্ষা করবো যদিও তুমি অন্য মেয়েকে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছো তবু আমি তোমাকে অন্তর দিয়ে। ভালবাসি ও চিরদিন বাসবো। কিন্তু আমি লন্ডন থেকে ফিরে জানতে পারলাম—সে তার পিতার সরাইখানার নাচনে ওয়ালী হয়েছে। কন্যার যৌবন বিক্রি করে বাসুদেব অর্থ উপার্জন করছে। কথাটা শোনার পর আমার মস্ত মন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিলো, আমি আর মালতীর পাশে যেতে পারিনি অবশ্য সেই একদিন এসেছিলো আমার সঙ্গে দেখা করতে। হাঁ, আমি শেষ পর্যন্ত তাকে তার বাড়ীতে পৌঁছে দিয়েও এসেছিলাম কিন্তু আগের মত সচ্ছ মন নিয়ে তাকে আর ভালবাসতে পারিনি।
মিঃ লাহিড়ী হঠাৎ প্রশ্ন করে বসলেন আপনার ভাবী স্ত্রীর গচ্ছিত সেই b্যবান হীরার হার কি মিস মালতীর নিকটেই রয়ে গেলো?
হাঁ, ওটা আমি আর ফেরত নিতে পারলাম না।
মিঃ লাহিড়ী সন্দিগ্ধ দৃষ্টি নিয়ে তাকালেন জনের মুখের দিকে।
জন অরুণ বাবুকে প্রশ্ন করলেন-অরুণ বাবু, ঠিক করে বলুন দেখি, আপনি সেই হীরার হার দেখেছিলেন?
হাঁ দেখেছিলাম, এমন কি মৃত্যুর দিনও ঐ হার তার গলায় ছিলো।
মিঃ লাহিড়ী বললেন—কিন্তু কি আশ্চর্য কই মৃত্যুকালে তার কণ্ঠে তো কোনো হার ছিলো না। তবে পোষ্টমর্টেম রিপোর্টে জানা গেছে মিস মালতীর গলায় একটা আঁচড়ের চিহ্ন ছিলো।
সেই চিহ্নই হলো মিস মালতীর নিহতের কারণ।
তাহলে কি ঐ হারছড়া—
হাঁ ইন্সপেক্টার, ঐ হারছড়াই মালতীর মৃত্যু ঘটিয়েছে।
কঠিন হয়ে উঠলো মিঃ লাহিড়ীর মুখমন্ডল-এ হার আপনিই তাকে দিয়েছিলেন?
সে কথা তো বলেছি। এ সন্দেহ মিথ্যে নয় ইন্সপেক্টার। আপনাকে ধন্যবাদ না দিয়ে পারছি না যে আপনি এতদিনও আমাকে এরেষ্ট না করে নিশ্চপ আছেন। একটু থেমে বললো জন–আমি হার নিলে তাকে হত্যা করতে হতো না, আমার বাসায় যখন সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলো তখন তার কণ্ঠে হার ছিলো কিন্তু আমি অতখানি নীচ হতে পারিনি। যাক, একথা মুখে বলে বিশ্বাস করানো বাতুলতা ছাড়া আর কিছু নয়।
