সেই কথা জানাতেই আমি এসেছি মিঃ দেব।
কি, এত সাহস তোমার। মালতীকে তুমিই তাহলে হত্যা করেছো?
হত্যা করিনি, কিন্তু মালতীকে যখন হত্যা করা হয় তখন আমি সেখানেই ছিলাম।
বাসুদেবের মুখমন্ডল কালো হয়ে উঠলো—আমার কন্যার হত্যাকান্তে, তুমি ছিলে সেখানে অথচ হত্যাকারীকে তুমি–
হাঁ, আমিই তাকে পালাবার সুযোগ দিয়েছি।
কেন? কেন?
হারছড়া পরে তার কাছে পাবো এই আশায়।
তাহলে আমার কক্ষে কেন এসেছো জন?
হারছড়া এখন আপনার কক্ষেই আছে কিনা—
না না, আমার কক্ষে কেন সেই হার থাকবে। জন, তুমি ভুল করছো। আমার কন্যাকে আমি হারিয়েছি, তার চেয়ে কোনো জিনিসই আমার কাছে মূল্যবান নয়।
এমন সময় সিঁড়িতে জুতার শব্দ শোনা গেলো। জন একবার দরজার দিকে তাকিয়ে দ্রুত যে পথে এসেছিলো সেই পথে প্রস্থান করলো।
হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন বাসুদেব শর্মা।
কক্ষে প্রবেশ করলেন মিঃ লাহিড়ী ও দুজন পুলিশ। পেছনে হোটেলের ম্যানেজার রজতবাবু।
রজতবাবু বললেন–এই কিছুক্ষণ আগেও কেউ ছিলো। মিঃ লাহিড়ী বললেন—বাসুদেব বাবু, এখানে কেউ এসে ছিলো?
হাঁ, এই মুহূর্তে মালতীর হত্যাকারী এখানে এসে আমাকে হত্যা করতে যাচ্ছিলো।
হোয়াট?
হাঁ, ইন্সপেক্টার আর একটু হলেই আমার মৃতদেহ আপনারা দেখতে পেতেন।
এসব কি বলছেন মিঃ শর্মা!
হাঁ, সব সত্য। ইন্সপেক্টার মালতীর হত্যাকারী আর কেউ নয়জন জনই তাকে হত্যা করেছে।
জন!
হাঁ, ইন্সপেক্টার! জনই আমার কন্যাকে হত্যা করেছে।
মিঃ লাহিড়ীর মুখমন্ডল কুঞ্চিত হয়ে এলো, তিনি একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়ে বললেনজন মালতীর হত্যাকারী একথা আপনাকে কে বললো? সে নিজেই কি বলেছে?
না নিজে বলেনি, নিজে কেউ বলেওনা।
তবে?
তার কথাবার্তায় প্রকাশ পেয়েছে।
কি রকম?
প্রথমতঃ জন আমার পরিচিত লোক, সে গোপনে পেছনের জানালা দিয়ে আমার কক্ষে প্রবেশ করার কোনো কারণ থাকতে পারে না। দ্বিতীয়তঃ জনের হাতে গুলীভরা রিভলবার ছিলো। তৃতীয়তঃ জন নাকি মালতীকে একছড়া হীরার হার উপহার দিয়েছিলো। সে হার ছিলো অত্যন্ত মূল্যবান। সে ঐ হার পুনরায় নিতে এখানে এসেছিলো! হার আমার নিকেট না পাওয়ায় সে আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়।
তারপর?
জন বলে, মালতীকে যখন হত্যা করা হয় তখন সে নাকি সেই স্থানে উপস্থিত ছিলো।
একথা সে নিজে স্বীকার করেছে? হাঁ করেছে।
এটাই কি আপনার জনকে মালতীর হত্যাকারী বলে সন্দেহ হওয়ার কারণ?
এছাড়াও জনের সবকিছুই আমার কাছে বেশ রহস্যজনক বলে মনে হলো ইন্সপেক্টার।
রজতবাবু বললেন—জন তাহলে সরাইখানার সম্মুখভাগ দিয়ে না এসে পেছনের শার্শী খুলে এসেছিলো কেন?
হাঁ, সবতো শুনলেন। বললেন বাসুদেব।
এমন সময় কাফ্রি চাকরটা হাঁপাতে হাপাতে এসে বললো–হুজুর হুজুর,–একটা লোক সরাইখানার পেছনে দাঁড়িয়েছিলো আমি তাকে দেখে ফেলায় সে ছুটে পালিয়ে গেলো।
মিঃ লাহিড়ী বিষ্ময়ভরা কণ্ঠে বললেন পালিয়ে গেলো!
হা, স্যার,কোট-প্যান্ট পরা একটা সাহেবের মত লোক। এখনও সে বেশী দূর যেতে পারেনি হুজুর–
মিঃ লাহিড়ী প্রশ্ন করলেন কোন দিকে গেছে বলতে পারো?
নিশ্চয়ই পারি। দক্ষিণ দিকে গেছে লোকটা।
মিঃ লাহিড়ী আর বিলম্ব না করে দলবল নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
বাসুদেব এতক্ষণে নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচলেন। একে কন্যাশোকে তিনি মুহ্যমান, তার ওপর এসব উপদ্রব তাঁর মনটাকে একেবারে যেন ছেচে দিয়েছে!
মিঃ লাহিড়ী অনেক সন্ধান করেও জন বা অন্য কাউকে সরাইখানার আশেপাশে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখলেন না।
অফিসে ফিরতেই মিঃ রায় জানালেন—মিঃ লাহিড়ী, মিঃ জন আপনার সাক্ষাৎ কামনায় বহুক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছেন।
বিস্মিত হলেন মিঃ লাহিড়ী—তিনি এইমাত্র বাসুদেবের মুখে শুনে এলেন—জন নাকি একটু আগেই তার ওখানে হামলা, দিয়েছিলো। অবাক হলেও তিনি কথাটা প্রকাশ করলেন না। জনকে লক্ষ্য করে বললেন—হ্যালো মিঃ জন, আমি একটু বাইরে কাজে গিয়েছিলাম।
জন গম্ভীর মুখে বললো—যাক, এসেছেন ভালই হলো—আমি অরুণ বাবুর সঙ্গে একটু সাক্ষাৎ করতে চাই।
আসুন মিঃ জন!
জনকে নিয়ে মিঃ লাহিড়ী হাজত কক্ষে এলেন।
জন অরুণ বাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে। লম্বা ছিপছিপে গঠন, মাথায় কোঁকড়ানো চুল, গায়ের রঙ ফর্সা, মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়িবেশ কদিন শেভ করা হয়নি। চোখ দুটোতে করুণ চাউনি।
মিঃ লাহিড়ী বললেন—আপনার যা বলবার তাড়াতড়ি বলে নিন মিঃ জন।
ইয়েস! আমি সামান্য কটি কথা ওকে জিজ্ঞাসা করবো। অরুণ বাবুকে লক্ষ্য করে বললো জন-অরুণ বাবু, আপনার সঙ্গে তেমন করে আমার পরিচয় নেই। আমি মিস মালতীর পুরোনো বন্ধু জন।
অরুণ বাবু অস্ফুট কণ্ঠে উচ্চারণ করলো আপনি জন!
হাঁ আমি জন। দেখুন আপনাকে আমি কয়েকটা প্রশ্ন করবো। আপনি যদি সঠিক জবাব দেন তাহলে মালতীর হত্যা রসহস্য উদ্ঘাটন হবে আপনি যদি সত্যই নির্দোষ হন তাহলে আপনার মুক্তির পথও পরিস্কার হবে।
বলুন। আগ্রহভরাদৃষ্টি নিয়ে তাকালো অরুণ বাবু মিঃ জনের মুখের দিকে।
জন একবার মিঃ লাহিড়ীর মুখের দিকে তাকিয়ে নিয়ে বললো—আচ্ছা মিঃ অরুণ বাবু, মিস মালতীর সঙ্গে আপনার কত দিনের পরিচয়?
একটু ভেবে নিয়ে বললো অরুণবাবুবছর তিন হবে।
তার সঙ্গে আপনার কেমন সম্বন্ধ ছিলো? লজ্জা বা সংকোচ করবেন না, যদিও মিস মালতী আমারও বান্ধবী ছিলো।
