চলি? উঠে পড়লেন মিঃ লাহিড়ী।
জন নিজের কামরায় গিয়ে দরজা বন্ধ করলো। বার দুই হাই তুলে হাতঘড়ির দিকে তাকালো তারপর একখানা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়লো। প্যান্টের পকেট থেকে ডায়রীখানা বের করে মেলে ধরলো চোখের সামনে।
হঠাৎ একসময় জনের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। ডায়রীর পাতায় এক জায়গায় বারবার পড়তে লাগলো সে। তারপর ডায়রীখানা পকেটে রেখে কিছুক্ষণ ধীর পদক্ষেপে কক্ষে পায়চারী করলো। তার মুখোব স্বচ্ছ দীপ্তময়, একটা পাষাণভার যেন তার বুক থেকে নেমে গেছে বলে মনে হলো। ঠোঁটের কোণে একট। তীক্ষ্ণ হাসির রেখা ফুটে উঠেছে।
এবার শয্যায় গিয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লো জন, অল্পক্ষণেই ঘুমিয়ে পড়লো সে।
বেলা হয়ে গেছে অনেক—–এখনও জনের ঘুম ভাঙলো না! অঘোরে ঘুমাচ্ছে সে। কক্ষে প্রবেশ করলো এ্যানি। খাবার টেবিলে বসে চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে তবু জনের সাক্ষাত না পেয়ে এ্যানি চলে এলো জনের কক্ষে।
জন পাশের টেবিলে তার কালো চশমাটা খুলে রেখে উবু হয়ে শুয়ে ছিলো বালিশটা আঁকড়ে ধরে।
এ্যানি গিয়ে বসলো জনের পাশে, পিঠে হাত রেখে ডাকলো—ডার্লিং, এত ঘুমাচ্ছো! ওঠো!
জনের ঘুম ভেঙে গেলো আচম্বিতে কিন্তু সে নিশ্চুপ ঘুমের ভান করে শুয়েই রইলো। এ্যানি মাথাটা রাখলো জনের পিঠের ওপর—ওঠো, ডালিং!
উ হুঁ, শরীরটা বড় খারাপ লাগছে।
এ্যানি তাড়াতাড়ি সোজা হয়ে বসে জনকে টেনে এদিক করতে গেলো কিন্তু জন। কিছুতেই পাশ ফিরলো না, বললো এবার—এ্যানি, প্রিয়ে, আর একটু ঘুমোতে দাও।
অনেক বেলা হয়েছে, ছিঃ এত ঘুমায় না!
এ্যানি!
বলো?
লক্ষ্মীটি, আমাকে আর একটু ঘুমাতে দাও।
বেশ আমি যাচ্ছি। যাবার সময় টেবিল থেকে কালো চশমাটা কাপড়ের নীচে লুকিয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেলো।
জন এবার পাশ ফিরে হাত বাড়ালো টেবিলে চশমাটার জন্য কিন্তু একি? চশমা কোথায়? জন বিপদে পড়লো। তাড়াতাড়ি বাথরুমে প্রবেশ করে ড্রেসিং আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালো, চোখটা তার এখনও সম্পূর্ণ সারেনি।
১৩.
বাসুদেব সরাইখানার দোতলার একটা কক্ষে থাকতেন; এটাই তাঁর বিশ্রামকক্ষ। মাঝে মাঝে কন্যা মালতীর বাড়ী বেড়াতে যেতেন কিংবা কখনও তাকে রাখতে যেতেন বাসুদেব স্বয়ং। কিন্তু মালতী নিহত হবার পর। আর বাসুদেব মালতীর শূন্য বাড়ীতে যাননি। কন্যার শেষ নিঃশ্বাস যে বাড়ীর হাওয়ায় মিশে রয়েছে, যে বাড়ীর শুষ্ক মেঝে তার কন্যার বুকের রক্তে রাঙা হয়ে উঠেছিলো, সে বাড়ী তাঁর কাছে অসহ্য।
আজকাল বাসুদেব, সব সময় তার নিজের ঘরেই থাকেন। কখনও বিশেষ প্রয়োজনে এসে বসেন তিনি সরাইখানার গদিতে।
ভাবগম্ভীর প্রবীণ ব্যক্তি বাসুদেব কন্যার মৃত্যুতে সত্যিই একেবারে মুষড়ে পড়েছেন। পুলিশ অফিসারগণ আসনে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে, যেটুকু না বললে নয় তাই তিনি বলেন।
সেদিন অনেক রাতে বাসুদেব বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছিলেন। সরাইখানা সম্পূর্ণ নীরব হয়ে যায়নি, নীচে খানাপিনা নাচ গান তখনও চলছে।
হঠাৎ বাসুদেবের জানালার শার্শী খুলে কক্ষে প্রবেশ করলো জন, দক্ষিণ হাতে তার উদ্যত রিভলবার।
বাসুদেব পদশব্দে মুখ ফেরাতেই চমকে উঠলেন, অস্ফুট কণ্ঠে বললেনজন, তুমি!
দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে এলো জনহাঁ আমি, চিনতে তাহলে ভুল হয়নি মিঃ দেব?
সাত বছর পর তোমাকে দেখলাম কিন্তু কি কারণে তুমি এখানে এসেছো?
একটা জরুরী কাজে।
তা সামনে দিয়ে না এসে পেছনের জানালা দিয়ে কেন?
বহুদিন পর কিনা সরাইখানার সবাই আমাকে দেখলে অবাক হবে–তাই আত্মগোপন করে এলাম।
কিন্তু ওটা কেন তোমার হাতে? জনের হাতের রিভলবারখানা দেখান বাসুদেব।
হাসে জন—যে প্রশ্ন করবো সঠিক জবাব না দিলে এটার দরকার হতে পারে!
বাসুদেবের মুখমন্ডল ভয়ে বিবর্ণ হয়ে উঠলো, আমতা আমতা করে বললেনকি এমন প্রশ্ন করবে জন?
আপনার কন্যা সম্বন্ধে দুচারটা কথা।
সে জন্য রিভলবার দেখাতে হবে না জন। মালতীর সম্বন্ধে তুমি যা জিজ্ঞাসা করবে তাই বলবো, মা মালতী আমাকে শোকসাগরে ভাসিয়ে রেখে গেছে। রুমালে চোখ মোছেন বাসুদেব।
সত্যই বাসুদেব কন্যাকে হারিয়ে উন্মাদের মত হয়ে পড়েছেন। একমাত্র কন্যা ছিলো তাঁর সম্বল।
জন বললোআমি যখন লন্ডন যাই তখন আপনার কন্যা মিস মালতীর নিকটে আমার একছড়া হীরার হার রেখে যাই, সেটার জন্য আজ আমি এসেছি।
বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলে ওঠেন বাসুদেব হীরার হার!
হাঁ, পাঁচখানা হীরার খন্ড সেই হারে গাঁথা ছিলো।
একটু চিন্তা করে বললেন, বাসুদেব—হাঁ, আমি সেই রকম এক ছড়া হার তার গলায় দেখেছিলাম। আমি তাকে সেই হার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করায় সে বলেছিলো তোমার কথা–তুমি নাকি তাকে ওটা উপহার দিয়েছে। দিয়েছিলাম, কিন্তু আজ সে নেই—কাজেই ওটা আমি ফেরত নিতে এসেছি।
বাসুদেবের চোখ দুটোতে ক্রুদ্ধ ভাব ফুটে উঠলো, বললেন—সে হারের কথা আমি জানিনা। হারের ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন করলে আমি তার জবাব দিতেও রাজী নই।
জন রিভলবারখানা একবার ঘুরিয়ে নিলো হাতের মধ্যে। কক্ষের স্বল্পালোকে রিভলবারখানা চকচক করে উঠলো।
বাসুদেব ঢোক গিলে বললেন—সে নিহত হবার পর হারের সন্ধান আমি জানি না।
জন হাসলো-জানেন না, কিন্তু মালতী নিহত হওয়ার সময়ও সেই হার তার গলায় ছিলো মিঃ দেব।
এ কথা তুমি কি করে জানলে জন? নিশ্চয় তুমি তাকে হত্যা করেছো?
