শয্যায় উপবিষ্ট যুবক কোনো কথা উচ্চারণ করলো না, একবার তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বসলো। যুবকের চেহারা, সুন্দর, বলিষ্ঠ, দীপ্তময়, মাথায় কোঁকড়ানো একরাশ চুল, প্রশস্ত ললাটে, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি মুখোভাব গম্ভীর উদাস।
জন যুবকের পাশে এসে বসলো—পিঠে হাত রেখে ডাকলো বন্ধু, কেমন আছো?
এবারও কোনো জবাব দিলো না যুবক, মাথা নীচু করে নীরবে বসে রইলো।
শয্যার পাশেই একটা চৌকোনা টেবিল, টেবিলে নানা রকম ফলমূল সাজানো। জন একথোকা আঙ্গুর তুলে নিয়ে একটা ছিঁড়ে মুখে ফেললো, তারপর চিবুতে চিবুতে বললো—কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো?
যুবক তবু নিরুত্তর। জন হেসে বললো আর কটা দিন–কথার ফাঁকে চোখের কালো চশমা খুলে টেবিলে রাখলো।
যুবক তাকালো জনের মুখের দিকে।
হাসলো জন, তারপর পকেট থেকে একটা চেঁক বের করে বাড়িয়ে ধরলো—এখানে সই দাও বন্ধু।
না, আমি সই দেবো না।
তোমার একটা পয়সাও বাজে নষ্ট করবো না।
কি করবে তুমি এত টাকা?
সমস্ত হিসেব পাবে।
না, আমি কিছুতেই সই দেবো না।
দেবে না?
না!
জন প্যান্টের পকেট থেকে বের করলো একটা ছোট্ট রিভলবার চেপে ধরলো যুবকের বুকে—সই না দিলে আর কোনোদিন তুমি পৃথিবীর আলো দেখতে পাবে না বন্ধু!
যুবক ফ্যাল ফ্যাল করে তাকালো জনের মুখের দিকে। তারপর চোখ। নামিয়ে তাকালো রিভলবারের দিকে, এবার ধীরে ধীরে জনের হাত থেকে পেনটা নিয়ে চেকে সই করলো সে।
চেকটা পকেটে ভাঁজ করে রেখে জন উঠে দাঁড়ালো—আবার দেখা হবে। গুডবাই!
জন রিভলবারখানা পকেটে রেখে দ্রুত বেরিয়ে গেলো।
পথের পাশে গাড়ীখানা অপেক্ষা করছিলো, জন গাড়ীতে উঠে ষ্টার্ট দিলো।
নিজ বাড়ীর গাড়ী-বারান্দায় গাড়ী পৌঁছতেই জন লক্ষ্য করলো—তার হলঘরের দরজার ওপাশে কেউ যেন আত্মগোপন করলোজন ঘরে প্রবেশ করে সুইচ টিপে আলো জ্বালালো। তারপর ওদিকের দরজা খুলে ধরলোআসুন মিঃ লাহিড়ী।
সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকার থেকে সরে এলেন পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ লাহিড়ী। তাঁর মুখোভাব কিছুটা বিব্রত, হতভম্ভ।
জন হেসে বললো—নিশ্চয় আমার জন্য অপেক্ষা করছেন!
মিঃ লাহিড়ী কক্ষে প্রবেশ করে বললেন—হাঁ, মানে আপনার কাছে একটু দরকার ছিলো, তাই
আসুন, আমি একটা কাজে বাইরে গিয়েছিলাম।
মিঃ লাহিড়ী আসন গ্রহণ করে বললেন–এত রাতে বাইরে আপনার কি এমন জরুরী কাজ ছিলো, মিঃ জন?
সব কথাই তো বলা যায় না, তবে আপনাকে বলা উচিত মনে করি।
বলুন?
আমার এক অন্তরঙ্গ বন্ধু আজ পনেরোবিশদিন হলো অসুস্থ হয়ে পড়েছে, তাকে দেখতে গিয়েছিলাম।
ওঃ–মিঃ লাহিড়ী একটা শব্দ করলেন!
এবার জন নিজের সিগারেট কেসটা মিঃ লাহিড়ীর সামনে বাড়িয়ে ধরে বললো—নিন।
মিঃ লাহিড়ী একটা সিগারেট তুলে নিতে নিতে বললেন—এত রাতে আপনাকে বিরক্ত করা আমার উচিত হলো না মিঃ জন!
না, পুলিশের লোকের আবার সময় অসময় আছে নাকি! যখনই আপনি প্রয়োজন বোধ করবেন তখনই অনুগ্রহ করে আসবেন খুশী হবো।
ধন্যবাদ মিঃ জন।
জন একটা সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে বললো-মিঃ লাহিড়ী মিস মালতী হত্যারহস্য উদঘাটনে কতদূর অগ্রসর হয়েছেন, জানতে পারি কি?
না, তেমন বেশী এগুতে পারিনি। তবে হাঁ, খুব শিগগির মালতী হত্যারহস্য উদঘাটিত হবে এটা সুনিশ্চয়!
অরুণ বাবু এখনও হাজতে আছেন?
হাঁ, অরুণ বাবু এখনও হাজতে।
কেন, কেউ কি তাকে জামিনে মুক্ত করে নেয়নি? মিঃ বাসুদেবও কি তার জামিনের আবেদন করেননি?
না, তিনি মিস মালতী হত্যার পর কেমন যেন স্তব্ধ হয়ে গেছেন। হাজার হলেও কন্যার মৃত্যুশোক কম নয়, বৃদ্ধ বয়সে এমন একটা অঘটন তাকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে।
আচ্ছা মিঃ লাহিড়ী, আমি একবার অরুণ বাবুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাই, কয়েকটা প্রশ্ন করবো!
স্বাচ্ছন্দে মিঃ জন!
ধন্যবাদ।
মিঃ লাহিড়ী এবার মাথা চুলকান, তারপর বলেন—মিঃ জন, আপনি আমার একটা প্রশ্নের ঠিক জবাব দেবেন?
নিশ্চয়ই, বলুন?
আচ্ছা মিঃ জন, মিস মালতীর সংগে আপনার কেমন সম্বন্ধ ছিলো? অবশ্য এ প্রশ্ন আমি আগেও আপনাকে করেছি, পুনরায় করছি!
হাঁ, করবেন, একবার কেনো প্রয়োজনে দশবার করবেন। তার সঙ্গে আমার বান্ধবীর সম্বন্ধ ছিলো।
আপনি তাকে গভীরভাবে ভালবাসেননি?
হাঁ। বাসলে আমি এ্যানিকে বিয়ে করবার পাকা কথা দিতে পারতাম না।
এবার আপনি লন্ডন থেকে ফিরে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি কেন?
এ্যানিকে বিয়ে করবার পাকা কথা দিয়ে অন্য একজন যুবতীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আমার বিবেকে বেধেছে।
সে আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলো—একথা সত্য?
হাঁ সত্য।
সেদিন আপনি তাকে সরাইখানায় পৌঁছে দিয়ে আসেননি?
না, সে নিজেই—একটু থেমে বললো জন-আমি তাকে পৌঁছে দিয়েছিলাম, কিন্তু সরাইখানায় নয়-তার নিজ বাড়ীতে।
তখন কি অরুণ বাবু বাড়ীতে ছিলো?
না, কেউ ছিলো না! মিস মালতীকে আপনি কি বাড়ীর ভেতরে পৌঁছে দিয়েছিলেন না বাড়ীর সদর দরজা থেকেই বিদায় নিয়েছিলেন।
জন নিশ্চুপ হয়ে কি যেন ভাবলো, তারপর বললো—মালতী আমাকে ছেড়ে দেয়নি, আমি তার সংগে তার কক্ষে গিয়েছিলাম।
কতক্ষণ অপেক্ষা করেছিলেন আপনি সেখানে?
মিনিট পনেরো–কিন্তু–আপনি কি আমাকে সন্দেহ করছেন মিঃ লাহিড়ী?
আমরা পুলিশের লোক—সন্দেহ করা আমার স্বভাব। মিঃ জন, আজ আমি চললাম, কাল আপনি থানায় আসবেন?
হাঁ, আমাকে যেতে হবে একটু, কারণ অরুণ বাবুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা আমার একান্ত প্রয়োজন।
