গহন বনে নূরী ছটফট করলেও শান্তভাবে গোপনে সে এখানকার রহস্যজাল ভেদ করবার চেষ্টা করতে লাগলো। হরশংকরের মনোভাব সে বুঝে নিলো কিছুদিনের মধ্যেই! নূরী একদিন হরশংকরকে বললো-আপনার মনঃতুষ্টির জন্য আমি সব করতে পারি। আপনি পুরুষ তাও আমি জানি, কেন আমার কাছে আপনি নারীর রূপ ধরে আসেন?
হরশঙ্কর নূরীর কথায় আশ্চর্য হলো, তার এই নিখুত নারীর ছদ্মবেশেও এই যুবতী তাকে চিনতে পেরেছে শুনে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইলো হরশঙ্কর। তারপর কি যেন ভেবে বললো–তোমার অদ্ভুত বুদ্ধিবল দেখে আমি খুশী হয়েছি সুন্দরী। সঙ্গে সঙ্গে নিজের শরীর থেকে নারীর পোশাক খুলে ছুড়ে ফেলে দিলো দূরে, তারপর নূরীর দিকে দুহাত বাড়িয়ে বললো সুন্দরী, তোমাকে আমি প্রথম দেখেই মুগ্ধ হয়েছিলাম। কিন্তু আমি নিজকে অতি কঠিনভাবে সংযত রেখে এতদিন শুধু তোমার অপূর্ব রূপসুধা পান করেই এসেছি, তোমাকে স্পর্শ করিনি। এসো, আজ তুমি আমার বাহুবন্ধনে। এসো প্রেয়সী–
নূরী ভেতরে শিউরে উঠলেও মুখে হাসি টেনে বললো–তোমার বলিষ্ঠ দীর্ঘ চেহারা আমাকেও মুগ্ধ করেছে, কিন্তু আমার মনিকে না পেলে আমি কিছুতেই তোমাকে–কথা শেষ না করে মাথা নত করলো।
দুষ্ট যাদুকর ক্রুদ্ধ হলো, মনিকে সে মায়াজালের আবেষ্টনীতে স্মৃতিচ্যুত করে রেখেছে, কোনো রকমেই তাকে নূরীকে দেখানো সম্ভব নয়। ক্রুদ্ধকণ্ঠে বললো সে সুন্দরী, তোমার মনি নেই।
মনি নেই!
না।
কোথায় আমার মনি?
তার রূপ পালটে গেছে।
তার মানে?
মনি তোমাকে দেখলে আর চিনতে পারবে না বা তোমার নিকটে আসতে চাইবে না।
না না, তা হতে পারে না, মনিকে আমি চাই। এনে দাও, এনে দাও আমার মনিকে।
অসম্ভব! তুমি তাকে কোনোদিনই পাবে না।
আমি তোমাকে হত্যা করবো শয়তান! নূরী দুহাতে হরশঙ্করের গলা টিপে ধরলো জোরে।
অতি সচ্ছ সহজভাবে হাসতে লাগলো হরশঙ্কর নূরীর হাত দুখানা তার গলায় যেন পুষ্পহারের মত অনুভূত হলো। হরশঙ্কর ধরে ফেললো নূরীকে। নূরী ভীষণভাবে কামড়ে দিলো যাদুকরের হাতে। যাদুকর যন্ত্রণায় ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো বটে কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার দৃষ্টি অগ্নিবাণের মত নূরীর চোখে এসে লাগলো নূরী ধীরে ধীরে সংজ্ঞা হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো।
যাদুকর হরশঙ্কর হেসে উঠলো হাঃ হাঃ করে, তারপর কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলো।
নূরীর যখন জ্ঞান ফিরলো তখনও সে মেঝেতেই পড়ে আছে। উঠে বসলো নূরী। বেরিয়ে এলো কুটিরের বাইরে, চারদিকে তাকিয়ে দেখলো—
কোথাও কেউ নেই। নূরী এগুলো সামনের দিকে। একি! চারপাশে বেড়াজাল কেন! বাধা পেলো নূরী। বেড়া পার হবার জন্য অনেক চেষ্টা করলো-কিন্তু কিছুতেই সক্ষম হলো না! নূরী জানে তাকে যাদুর বেড়াজালে আবদ্ধ করা হয়েছে। অনেক চেষ্টা করেও সে বাইরে যেতে পারলো না। মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লো নূরী। হঠাৎ মনির কণ্ঠের শব্দ তার কানে এলো। চমকে উঠলো নূরী, সামনে তাকাতেই দেখতে পেলো বেড়ার একপাশে দাঁড়িয়ে মনি চোখ রগড়াচ্ছে।
নূরী মনিকে দেখামাত্র ছুটে গেলো তার দিকে, উচ্ছ্বসিতভাবে ডাকলোমনি হাত বাড়ালো মনিকে কোলে নেবার জন্য। কিন্তু মনি নূরীর দিকে তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলো। বিস্মিত ব্যথিত নূরী, ডেকে উঠলো–মনি, মনি-মনি ফিরেও তাকালো না নূরীর দিকে। ঠিক সেই মুহূর্তে একটা অট্টহাসির শব্দ ভেসে এলো পেছন থেকে-হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ–
চমকে ফিরে তাকালো নুরী, সঙ্গে সঙ্গে আড়ষ্ট হলো সে। তার পেছনে দাঁড়িয়ে বিকট স্বরে হাসছে হরশঙ্কর। মনি নূরীর কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে। নিয়েছে বলেই তার এই অদ্ভুত হাসি হাসি যেন থামতে চায় না।
হরশঙ্কর বিদ্রুপের সুরে বললো–নাওনা তোমার মনিকে।
নূরী চিত্রাপিতের ন্যায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সামনে বিপরীত দিকে মুখ ফিরিয়ে মনি—এখনও মনি চোখ রগড়াচ্ছে আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
নূরী দুহাত বাড়িয়ে কোলে নিতে গেলো—মনি কিছুতেই নূরীর কোলো এলো না-কেঁদে উঠলো সে চীৎকার করে। কাঁদতে লাগলো মনি হাত-পা ছুড়ে। হরশঙ্কর এগিয়ে এসে হাত বাড়াতেই মনি তার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লো।
দুহাতের মধ্যে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠলো নূরী।
হরশঙ্কর মনিকে নিয়ে ততক্ষণে চলে গেছে সেখান থেকে।
নূরীর মাথাটা কেমন যেন বনবন করে ঘুরে উঠলো। মাটিতে বসে পড়লো সে।
১২.
নিজের কক্ষে বসে আপন মনে ডায়ারীর পাতা উল্টাছিলো জন। আজ কদিন অবিরত কক্ষের প্রতিটি কাগজপত্র আর বাক্স স্যুটকেস তন্ন তন্ন করে কিসের যেন অনুসন্ধান করছে সে। আজও তার চারপাশে স্তুপাকার কাগজপত্র। ঘরময় জিনিসপত্র ছাড়ানো মাঝখানে একটা চেয়ারে বসে ডায়রী দেখছিলো জন অতি নিপুণ দৃষ্টি মেলে ডায়রীর পাতায় দেখছিলো, এমন সময় কক্ষে প্রবেশ করে এ্যানি!
চমকে ফিরে তাকায় জন, এ্যানিকে দেখতে পেয়ে দ্রুত ডায়রীখানা লুকিয়ে ফেলে।
এ্যানি এসে বসলো জনের চেয়ারের হাতলে, দুহাতে জনের কণ্ঠ বেষ্টন করে বলে—ডার্লিং তুমি সারাক্ষণ শুধু এ ঘরেই কাটাবে? তা ছাড়া এ কি হয়েছে তোমার ঘরের অবস্থা?
আর বলো না এ্যানি, বিশেষ দরকারী একটা জিনিস হারিয়ে ফেলেছি, খুঁজে পাচ্ছিনে।
সঙ্গে সঙ্গে মিঃ জনের কণ্ঠ ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে বসলো এনি–আমার জিনিসটা হারাওনি তো?
মাথা চুলকায় মিঃ জন—আরে না না, ওটা ঠিক আছে।
