যাদুকর হরশঙ্কর শুধু যাদুকরই নয়—বনাঞ্চলে যেমন তার আধিপত্য, তেমনি শহরেও তার বিচরণ সর্বত্র।
সপ্তাহে হরশঙ্কর দুদিন তার যাদুর খেলা দেখাতে শহরে যেতো। মনি নিতান্ত শিশু, কাজেই প্রায় দিনই বিভিন্ন ছেলে নিয়ে যেতো সে দেশ হতে দেশান্তরে। কোন শহর বা নির্দিষ্ট জায়গায় হরশঙ্কর স্থায়ীভাবে থাকতো না। নানা বেশে নানা দেশে সে যাদুর খেলা দেখাতে চলে যেতো।
বিশেষ করে রাতের বেলায় সে যাদু খেলা দেখাতো। তার কয়েকজন অনুচর ছিলো যখন হরশংকর খেলা দেখাতো তখন তার নানা ছদ্মবেশে থাকতো তার আশেপাশে। হরশঙ্করের যাদু খেলায় যখন দর্শকগণ আচ্ছন্ন। হয়ে পড়তো, ঠিক সেই মুহূর্তে তার সঙ্গীরা হরণ করতো তাদের মূল্যবান সামগ্রী।
কয়েকজন যুবতীও ছিলো হরশংকরের বনের কুটিরে। তাদের নিয়ে মাঝে মাঝে সে শহরে নাচ দেখাতো ও খেলা দেখিয়ে পয়সা উপার্জন, করতো।
নূরীকেও হরশংকর সেইভাবে তৈরী করে নিতে চেষ্টা করছিলো। নিজে নারীর ছদ্মবেশে নানা কৌশলে তাকে বশীভূত করছিলো। কিন্তু নূরী সাধারণ মেয়ে নয়, তাকে আয়ত্তে আনা যাদুকর হরশংকরের কাজ নয়। যাদুকর। হরশংকর বেশীদিন নূরীর কাছে আত্মগোপন করে নারীর ছদ্মবেশে থাকতে পারলো না। একদিন ধরা পড়ে গেলো সে নূরীর কাছে।
সেদিন নূরীকে কাছে টেনে বললো মায়ারাণী বেশী হরশংকর তোমাকে আমি বোনের মত ভালবাসি। তুমি আমাকে ভালো বাসতে চেষ্টা করো। তোমার লাল টুকটুকে সুন্দর মুখখানা আমাকে উন্মত্ত করে তুলেছে কথার ফাঁকে সে নূরীকে আকর্ষণ করছিলো।
চমকে উঠছিলো নূরী—এ তো কোন নারীর কোমল হাতের স্পর্শ নয়। ভয়ে সংকুচিত হয়ে সরে গিয়েছিলো নূরী মায়ারাণীর পাশ থেকে। হেসেছিলো মায়ারাণী!
নূরী ওর চোখ দুটির দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠেছিলো, বুঝতে পেরেছিলো মায়ারাণী নারী নয়—পুরুষ।
এরপর থেকে নূরী সব সময় মায়ারাণীকে এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করতো, ও এলেই বিব্রত বোধ করতো নূরী।
কিন্তু নূরী ভয়ে ভীত হবার মেয়ে নয়। সে দুর্দান্ত ভয়ংকর মেয়ে, নানা ছলনায় কৌশলে পালাবার পথ খুঁজতো কিন্তু মনিকে না নিয়ে যাবে না—এই তার শপথ।
একদিন গভীর রাতে নূরীর হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেলো। শুনতে পেলো পাশে কোথাও নুপুরের শব্দ হচ্ছে। শয্যা ত্যাগ করে উঠে পড়লো নূরী, কুটিরের ঝাপ সরিয়ে উঁকি দিলো বাইরে। অবাক হয়ে দেখলো—একটা খাটিয়ার ওপরে বসে আছে একটা লোক, লোকটার হাতে চাবুক! সামনে নৃত্যরত একটি যুবতী। নৃত্যরত যুবতীর অনতিদূরে কয়েকটা মশাল জ্বলছে। মশালের আলোতে নূরী দেখলো, খাটিয়ায় বসা লোকটা যেন তার পরিচিত বলে মনে হচ্ছে। কোথায় দেখেছে ভূকুঁচকে ভাবতে লাগলো সে, হঠাৎ মনে পড়লো এ তো মায়ারাণীর মুখ। নূরীর চোখের সামনে লোকটার মুখ মিশে সেখানে ভেসে উঠলো। একটি অসাধারণ নারীমুখ। আজ সব পরিস্কার হয়ে গেলো নুরীর কাছে। তার ধারণা সত্যি মায়াঁরাণী আসলে নারী নয়, সে পুরুষ বুঝতে পারলো নূরী।
আরও অবাক হলো নূরী——যুবতীকে মাঝে মাঝে লোকটা চাবুক দ্বারা। আঘাত করছে। মেয়েটি মাটিতে পড়ে যাচ্ছে, আবার উঠে নাচতে চেষ্টা করছে।
নূরীর সে রাতে আর ঘুম হলো না, কে এই মায়ারাণী বেশী শয়তান। নিশ্চয়ই লোকটা ভেলকিবাজি জানেনইলে এক এক সময় এক এক রূপ সে ধরে কি করে! আর সব কিছুর এমন পরিবর্তনই বা করে কেমন করে মনে পড়লো প্রথম দিনের কথা, সন্ন্যাসী বাবাজীর নিষেধ সত্ত্বেও মনির সন্ধানে নূরী এসেছিলো পশ্চিম দিকে। হঠাৎ তার সামনে দেখতে পেয়েছিলো সুন্দর একটি ফুলের বাগান, কত রকমের ফুলের সমারোহ সে বাগানে। বিমুগ্ধ নূরী হঠাৎ একটা ফুল ছিঁড়ে ফেলে ছিলো ভুল করে, সঙ্গে সঙ্গে একরাশ ধোঁয়া তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিলো। তারপর একটা তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব তার সমস্ত সত্তাকে লুপ্ত করে দিয়েছিলো তখন, দেখতে পেয়েছিলো তার চারপাশে যেন প্রকান্ড প্রকান্ড দেয়াল, কোনোদিকে পালাবার পথ খুঁজে পাচ্ছিলো না। কিন্তু তারপর আবার দেখেছিলো একটা অন্ধকার কক্ষে বন্দিনী সে। আজ দেখছে সে কক্ষও কোথায় উধাও হয়েছে। একটা কুটিরের মধ্যে আটক রয়েছে। নূরীর কাছে সব যেন কেমন ঘোলাটে হয়ে এসেছে। সে বুঝতে পেরেছে নিশ্চয়ই যাদুর নাগপাশে তাকে বন্দী করা হয়েছে।
১১.
শিশু মনির অবস্থা আরও দুর্বিষহ। তাকে একটা বৃদ্ধার নিকটে রাখা হয়েছে। শুধু মনিই নয়, আরও কয়েকজন শিশু বালককেও সেই বৃদ্ধা দেখাশোনা করে। মনিহত বৃদ্ধাকে দেখলেই ভয়ে কুঁকড়ে যায়, কাঁদতে শুরু করে সে। বৃদ্ধার চেহারা অতি ভয়ংকর আর বিশ্রী। নাকটা চ্যাপ্ট—মাথাটা মস্ত বড় মাথায় আধাপাকা মোটা মোটা একগাদা চুল। শরীরটা জমাট পাথরের খোদাই করা মূর্তির মত শক্ত। মাঝে মাঝে খড়িমাটির মত সাদা দাঁত বের করে কথা বলে। মনি কিছুতেই ওকে সহ্য করতে পারে না।
ওকে দেখলেই মনি প্রাণফাটা চীৎকার করে ওঠে, তবু বৃদ্ধা জোর করে ওকে কোলে তুলে নেয়, মিছামিছি আদর করতে চেষ্টা করে—দুধ-কলা খেতে দেয়। ছোট্ট মনি কিছুই বোঝে না, বৃদ্ধাকে দেখলে ভয়ে চুপসে যায় আর সেই মুহূর্তে হরশংকর এসে ডাকলে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার কোলে। হরশংকর মনিকে নানাভাবে যাদুর দ্বারা নিজের বশীভূত করে নিয়েছে যা বলে হরশংকর শিশু হলেও মনি তাই করে। মনিকে নিয়ে যাদুর খেলা দেখাতে গেলে দর্শক হয় বেশী। তার কারণ, মনি শিশু হলেও খেলা দেখিয়ে দর্শকদেরকে অবাক ও মুগ্ধ করে। তাছাড়া মনির অপূর্ব সুন্দর চেহারাও দর্শকগণকে মুগ্ধ করে। মনি হরশংকরের যাদু খেলায় লাকি হয়ে দাঁড়ালো।
