মালতী! মালতী আমার এক পরিচিত যুবতী।
বাঁকা চোখে তীব্রকণ্ঠে বললো এ্যানি—শুধু কি পরিচিত না অন্য কোনো সম্বন্ধ ছিলো তোমার সঙ্গে তার?
এ্যানি!
তুমি তাহলে কেন বললানি এতদিন তার কথা?
এমন সামান্য কথাও তোমাকে বলতে হবে এটা আমার ধারণার বাইরে।
জন, তোমার ব্যবহার তো এমন ছিলো না। তোমার কথাবার্তা আমার কাছে বড্ড নীরস বলে মনে হচ্ছে। আমি জানি, তুমি আমাকে ছাড়া এ পৃথিবীর কাউকে ভালবাসতে পারো না।
হাঁ এ্যানি। চলো রাত অনেক হলো—শোবে চলো।
এ্যানি জনের হাত ধরে উঠে দাঁড়ালো–চলো ডার্লিং।
জন এগুলো, এ্যানির হাতের মুঠোয় তার হাতখানা।
জনের হাত ধরে কক্ষে প্রবেশ করলো এ্যানি। শয্যায় নিজের দেহটা এলিয়ে দিয়ে বললেন, তুমি শোবে না?
আমার কাজ আছে এ্যানি, তুমি ঘুমোও।
ডার্লিং, তুমি কেমন যেন হয়েগেছ। শয্যায় উঠে বসলো এ্যানি।
জন তখন দরজার দিকে পা বাড়িয়েছে।
এ্যানি জনের দক্ষিণ হাত চেপে ধরলো–চলে যাচ্ছো?
হাঁ।
জন, তোমার কি হয়েছে বলো তো? এসো, অনেক কথা আছে তোমার সঙ্গে। এ্যানি জনের হাত ধরে টেনে এনে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে নিজে বসে পড়লো তার পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে। তারপর বঙ্কিল গ্রীবা দুলিয়ে বললোকি বলেছিলে মনে নেই তোমার?
জন চোখের কালো চশমাটা ঠিক করে নিয়ে বলে—এদিকে নানা ঝামেলায় সব ভুলে গেছি এ্যানি। তুমি আমাকে ক্ষমা করো।
অভিমানে এ্যানির মুখমন্ডল আরক্ত হয়ে আসে। রাগত কণ্ঠে বলে ওঠে—তুমি কি মানুষ। জন, আমি ভেবেছিলাম সত্যি তুমি আমাকে ভালবাসো——কিন্তু সব তোমার ছলনা—সব মিথ্যা, ভুয়ো।
এ্যানি!
না, আজই আমি চলে যাবো এখান থেকে।
এ্যানি শান্ত হও।
না না, আমি তোমার কোন কথাই শুনতে চাইনে। কি ভয়ঙ্কর লোক তুমি। দাও ফিরিয়ে দাও তুমি আমার সেই জিনিসটা।
জন নির্বাক হয়ে বসে থাকে, এ্যানি কথায় সে কোনো জবাব দেয় না।
এ্যানি ক্ষিপ্তের ন্যায় চীৎকার করে উঠলো এবার আমি সব বুঝতে পেরেছি, তুমি সেই মালতীকে ভালবেসেছিলে!
এ্যানি যদি তাই মনে করো, তবে সত্যি তাই।
কি বললে, জানো আমার সঙ্গে তোমার কি সম্বন্ধ?
জানি! বিয়ে করবো কথা দিয়েছিলাম যদি না করি?
জন! চীৎকার করে ওঠে এ্যানি–দাও, আমার জিনিসটা তবে ফিরিয়ে দাও তুমি।
দেবো।
এখনিই দাও, আমি চলে যাবো তোমার এখান থেকে।
জন ধীরে ধীরে নমনীয় হয়ে এলো, নরম গলায় বললো—এ্যানি, তুমি একি ছেলেমানুষি করছো! যেখানে আমাদের বিয়ের কথা পাকা হয়ে গেছে।
না, আমি তোমার কোনো কথা শুনবো না। তুমি আমার জিনিস ফেরত দাও। . এ্যানি, তুমি বিশ্বাস করো আমি তোমাকে ছাড়া কাউকে ভালোবাসিনি, বাসতে পারিনা। এ্যানি, তুমি আমাকে মাফ করে দাও। জন
এ্যানির হাত দুখানা চেপে ধরে বিনীতভাবে কথাগুলো বললো।
এ্যানির মুখোভাব পরিবর্তন হয়ে এলো, গলার স্বর শান্ত করে বললোজানি, জানি বলেই তো আমি ছুটে এসেছি তোমার পাশে! একটু থেমে পুনরায় বললে—কিন্তু তোমার অবহেলা ভার আমাকে…
এ্যানি, আমি একটা দুশ্চিন্তায় আছি, তাই তোমার সঙ্গে ঠিক পূর্বের মত আচরণ করতে পারছিনে। জানো এ্যানি, মিস মালতীর হত্যা ব্যাপারে পুলিশ আমাকেও সন্দেহ করছে, এবং সদা আমার ওপর তাদের সতর্ক দৃষ্টি রয়েছে।
কেন পুলিশ তোমাকে সন্দেহ করছে? তুমি যে বললে—মালতীর সঙ্গে, তোমার কোন সম্বন্ধ ছিলো না?
না এ্যানি, তুমি বিশ্বাস করো, মিস মালতীকে আমি সব সময় এড়িয়ে চলতাম। কিন্তু মালতী আমার পেছনে জোঁকের মত লেগে থাকতো। আমি তাকে ঘৃণা করতাম।
জন, সত্যি বলছো?
সম্পূর্ণ সত্যি এ্যানি।
ডার্লিং!
এ্যানি!
ডালিং, তুমি ঐ কালো চশমা খুলে ফেলল। এ্যানি জনের কণ্ঠ বেষ্টন করে ধরে।
জন ধীরে ধীরে এ্যানির কোমল বাহু দুটি সরিয়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়—এ্যানি, আমার জরুরী একটা কাজ আছে। এক্ষুণি বাইরে যাবো।
উঁ হুঁ, আমি তোমাকে ছেড়ে দেবো না, ডার্লিং!
প্রিয়ে তুমি জানো না কত জরুরী আমার কাজ। চলি-গুডবাই!
অস্ফুট কণ্ঠে বললো এ্যানি—গুডবাই!
জন বেরিয়ে গেলো।
এ্যানি বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে পড়লো বিছানায়।
১০.
নূরী আর মনি মায়ারাণীর মায়াজালে বন্দী। শত চেষ্টা করেও নূরী নিজেকে উদ্ধার করতে পারলো না কিংবা মনির সাক্ষাৎ পেলো না। চোখের পানিতে নূরীর বুক ভেসে গেলো, তবু মায়ারাণীর মনে মায়া হলো না।
অদ্ভুত এক নারী এই মায়ারাণী। আসলে সে নারী নয়, যাদুকর হরশঙ্কর নারীর রূপ নিয়ে নূরীর নিকট হাজির হতো, তাকে নানা ভাবে ভোলাতে চেষ্টা করতো। কখনও বা যাদুর দ্বারা আচ্ছন্ন করে রাখতো।
মাঝে মাঝে হরশঙ্কর মনিকে নিয়ে শহরে যেতো, নানা যাদুর খেলা দেখাতো, সুযোগ পেলে মানুষকে হত্যা করে তার যথাসর্বস্ব লুটে নিতো। অতি পিচাশ পাপাচার এই হরশঙ্কর। নারীর রূপে নূরীকে নানা ছলনায় ভোলাতে চেষ্টা করলেও হরশঙ্কর নূরীকে সংস্পর্শ করতে পারলো না।
দিনের পর দিন নূরী এই গহন বনে একটি অন্ধকারময় কুটিরের মধ্যে অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করে চললো। একদিকে মনির অদর্শন, অন্যদিকে এই বন্দিনী অবস্থা।
যাদুকর হরশঙ্কর শুধু নূরী আর মনিকেই বন্দী করেনি, তার কবলে আরও অনেক নারী ও শিশু নরক জ্বালা ভোগ করছে তীব্র কষ্ট ভোগের পর কেউ এখনও বেঁচে আছে, কেউ চিরদিনের জন্য বিদায় নিয়েছে ধরণীর বুক থেকে।
