হঠাৎ নূরীর কানে ভেসে এলো মনির কান্নার শব্দ। উচ্ছ্বসিতভাবে কাঁদছে মনি, কেউ যেন ওকে মারছে বা কোনো রকম কষ্ট দিচ্ছে।
নূরী ক্ষিপ্তের ন্যায় ছুটে গেলো সেইদিকে, যেদিক থেকে ভেসে এসেছিলো কান্নার শব্দটা, কিন্তু একি! শব্দটা ঠিক কোন্ দিক থেকে আসছে বোঝা যাচ্ছে না। নূরী থমকে দাঁড়ালো, সামনে সুউচ্চ একটা প্রাচীর তার পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে আছে। মনির কান্না যেন ঐ প্রাচীরটার ওপাশ থেকেই আসছে বলে মনে হচ্ছে তার। নূরী অনেক চেষ্টা করেও প্রাচীর পার হতে পারলো না। নূরী যতই দেখছে ততই আশ্চার্য হচ্ছে মায়াজাল সে কোনোদিন বিশ্বাস করতো না, আজ বিশ্বাস না করে পারলো না। পৃথিবীতে যাদু বা মায়াজালও রয়েছে। কে এই মায়ারাণী যার যাদুবলে এত সব হতে পারে। নূরীও কম মেয়ে নয়, সে দেখে নেবে মায়ারাণীর মায়াজাল ছিন্ন করতে পারে কিনা।
ততক্ষণে মনির কান্নার শব্দ থেমে গেছে। কেমন যেন একটা গম্ভীর নীল রশ্নি তার চারদিকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। কোথায় সেই কক্ষ, নূরী দেখলো এবার একটা গোলাকার প্রাচীর ঘেরা জায়গায় সে নিজে দাঁড়িয়ে আছে।
মায়ারাণীর মায়াজালে বন্দিনী নূরী।
পৃথিবীর সঙ্গে তার কোনো সম্বন্ধই নেই, কোথায় এসেছে, কোথায় আছে, সে নিজেই বুঝতে পারছে না। সব সময় নূরী অনুভব করে তার চারপাশে কোন অশরীরী আত্মার দীর্ঘশ্বাস। কেউ যেন অতি লঘু পদক্ষেপে তার চারদিকে হেঁটে বেড়ায়। কখনও কখনও নূরী তার আশেপাশে অনতিদূরে শুনতে পায় ফিস ফিস কণ্ঠস্বর। ভয়ে নূরী পালাতে চায়, কিন্তু কোথায় পালাবে। যে দিকে যায় সেইদিকেই সে দেখতে পায় সুউচ্চ প্রাচীর তার পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে আছে। এক পাও এগুতে পারে না নূরী, বসে পড়ে মাথায় হাত দিয়ে। সব যেন কেমন এলোমেলো হয়ে গেছে, সে জীবিত আছে কিনা, তাই সন্দেহ জাগে তার মনে।
০৯.
মিঃ লুই এর তিনতলা বাড়ী।
শহরের সেরা ধনবান ব্যক্তি মিঃ লুই। সংসারে তার একমাত্র সন্তান জন খাড়া আর কেউ নেই। মিঃ লুই গত কয়েক মাস হলো ব্যবসার ব্যাপারে জার্মানে অবস্থান করছেন, বাড়ীতে রয়েছে শুধু জন ও দুজন কর্মচারী।
জন একটু আলাদা ধরনের যুবক, সব সময় একা নির্জনে থাকতে ভালোবাসে। সংসারের যত কাজকর্ম বা অন্যসব তত্ত্বাবধান করে তার কর্মচারী দুজন। নির্জন কক্ষে জন সিগারেটের পর সিগারেট নিঃশেষ করে চলে, আর মোটা মোটা, বই পড়ে। লন্ডন থেকে ফিরে আসার পর সে বাইরে বের হওয়া এক রকম প্রায় ছেড়েই দিয়েছে। মনের মত কাউকে পায় না। তাই সে নিজেকে ডুবিয়ে রাখে নানা রকম বই-পুস্তকের মধ্যে। মাঝে মাঝে বাসুদেবের সরাইখানায় দেখা যেতো মিঃ জনকে, গভীর রাতে যখন সরাইখানার লোকজন বিদায় গ্রহণ করতো তখন মিঃ জনের নতুন ঝকঝকে নীল রঙের বিরাট গাড়ী এসে দাঁড়াতো বাসুদেবের সরাইখানার সামনে। পর পর দুটো হর্নের আওয়াজ হতো—অমনি ছুটে বেরিয়ে আসতো মালতী, সুমিষ্ট কণ্ঠে ধ্বনি করে উঠতো—হ্যালো জন, এসে গেছে?
জন নেমে আসতো গাড়ী থেকে, উভয়ে হাত ধরে এগিয়ে যেতে সরাইখানার একটি নির্দিষ্ট কক্ষে, তারপর চলতো নাচ-গান, হাসি-গল্প। মালতীর কাছে জন একেবারে যেন পালটে যেতো, কোথায় চলে যেতো তার গুরুগম্ভীর ভাব।
এবার জন লন্ডন থেকে ফিরে আসার পর বাসুদেবের সরাইখানায় একটি দিনের জন্যও যায়নি বা মালতীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেনি। মালতী জনের লন্ডন থেকে ফিরে আসার সংবাদ পেয়ে নিজেই গিয়ে দেখা করে এসেছিলো তার সঙ্গে!
সেই মালতীর আকস্মিক মৃত্যু জনকে বিচলিত করবে তাতে অবান্তর কি আছে?
আজও গভীর রাতে জন মালতীর মৃত্যু-রহস্য নিয়েই গভীরভাবে চিন্তা করছিলো। সিগারেটের পর সিগারেট নিঃশেষ করে চলেছে সে।
হঠাৎ একটা শব্দ শোনা গেলো তার জানালার শার্শীর পাশে। খুট করে একটা শব্দ। চমকে উঠলো জন, হাতের সিগারেটটা, এ্যাসট্রের ওপর রেখে উঠে দাঁড়ালো, নিঃশব্দে এগিয়ে চললো জানালার দিকে। স্পষ্ট দেখলো—
একটা আবছা কালো মূর্তি দ্রুত সরে গেলো জানালার পাশ থেকে।
জন কুঞ্চিত করে কিছু ভাবলো, পুনরায় ফিরে এলো নিজের আসনে, সুন্দর ললাটে ফুটে উঠলো গভীর চিন্তারেখা।
ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে চললো। জনের চোখে ঘুম নেই। প্রতিহিংসার একটা তীব্র জ্বালা তার অন্তরে দাহ সৃষ্টি করে চলেছে। মালতীর হত্যাকারী কে, তাকে খুঁজে বের করতেই হবে…।
পায়চারী করছে জন, মালতীকে সে ভালবাসতো ঠিকই। সরাইখানার নর্তকী বলে ঘৃণাও করতো সে মনে মনে–তাই বলে তার হত্যা চিন্তা করতে পারে না সে কোনো সময়! জন এবারে ড্রয়ার খুলে ফেললো–দ্রুতহস্তে কাগজপত্র বের করে কি যেন খুঁজতে লাগলো, পর পর কয়েকটা ড্রয়ার খুলে হঠাৎ একটা ডায়রী তুলে নিলো হাতে। মুহূর্তে জনের চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।
ডায়রী খানা নিয়ে ফিরে এলো জন নিজের শয্যায়। টেবিল ল্যাম্পের সলতে বাড়িয়ে দিয়ে ডায়রী খানা মেলে ধরলো চোখের সামনে।
পরদিন জন একটা টেলিগ্রাম পেলো, তার ভাবী পত্নী মিস এ্যানি আসছে, সন্ধ্যায় এরোড্রামে তাকে রিসিভ করে আনতে যেতে হবে।
টেলিগ্রাম পাবার পর জনের সুন্দর মুখমন্ডল গম্ভীর হয়ে উঠলো। দাঁতে অধর দংশন করে কি যেন ভাবতে লাগলো সে। তারপর একসময় ড্রইংরুমে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দিলো। দেয়ালে টাঙ্গানো তার নিজের ছবিখানার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো, নির্বাক নয়নে তাকিয়ে রইলো ছবিখানার দিকে।
