সন্ন্যাসীর আহ্বানে ঘুম ভেঙ্গে গেলো নূরীর। সচকিতভাবে উঠে পাশে তাকাতেই অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো—মনি কোথায়?
সন্ন্যাসীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো-বৎস, মনি মায়াজালে আবদ্ধ হয়েছে।
নূরী উম্মাদিনীর ন্যায় ছুটে চললো সন্ন্যাসী বাবাজীর নিকটে। আছাড় খেয়ে পড়লো তার পায়ের কাছে—বাবাজী এখন উপায়?
কোনো উপায় নেই আর মনিকে উদ্ধারের—কারণ, সে এখন মায়ারাণীর মায়াজালে আবদ্ধ হয়েছে।
নূরী আকুলভাবে কেঁদে উঠলো—তাকে আর ফিরে পাবো না তাহলে গুরুদেব?
বৎস, আমি পূর্বেই বলেছিলাম,এ বনের সর্বত্র আমার আধিপত্য রয়েছে শুধু পশ্চিম দিকে ছাড়া, ঐ দিকে আমার কোনো বল খাটবে না।
নূরী ব্যাকুল কণ্ঠে বললো—কিন্তু মনিকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারবো। বলুন গুরুদেব, আমি কি করে তাকে ফিরে পেতে পারি?
সন্ন্যাসী বাবাজী এবার বলে উঠলেন—পশ্চিম ছাড়া তোমার মনি যেখানেই যেতো, সে কেমন আছে কি করছে সব তোমাকে বলতে পারতাম বৎস, এখন আমি অক্ষম।
তবে আমিও ঐ পশ্চিমে যাবো, দেখবো আমার মনি কোথায়, কেমন আছে?
সর্বনাশ! ওদিকে তুমি যেও না, গেলে আর কোনোদিন ফিরে আসতে পারবে না।
০৮.
সন্ন্যাসী বাবাজী যতই নিষেধ করুন, নূরী মনির জন্য অত্যন্ত অধীর হয়ে পড়লো। সর্বক্ষণ চোখের পানিতে বুক ভাসিয়ে চললো। একদিন নির্জন . প্রভাতে নূরী বনের পশ্চিম দিক লক্ষ্য করে রওনা দিলো–মরতে হয় সেও মরবে, তবু মনির সন্ধান নেবে সে।
ঘন বনের অন্তরালে নূরী এগিয়ে চললো। সে জানে, ওখানে গেলে আর কোনোদিন ফিরে আসতে পারবে না, এই তার জীবনের শেষ অধ্যায়—তবু নূরী নির্ভীকভাবে এগুচ্ছে।
পেছন থেকে ভেসে এলো সন্ন্যাসী বাবাজীর কণ্ঠস্বর—যেও না, যেও না, বিপদ রয়েছে।
নূরী দুহাতে কান চেপে ধরলো, তারপর দ্রুত পা চালালো।
কিছুদুর এগুতেই সামনে তাকিয়ে দেখলো নূরী সুন্দর একটি বাগান, ফুলে ফুলে ভরে রয়েছে বাগানটা। নূরী মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইলো বাগানটার দিকে, ক্ষণিকের জন্য ভুলে গেলো নূরী মনির কথা।
নিজের অজ্ঞাতেই নূরী প্রবেশ করলো বাগানে। সামনে একটি সুন্দর ফুল গাছ দেখে একটি ফুল ছিঁড়ে ফেললো হঠাৎ সে। সঙ্গে সঙ্গে একরাশ ধূয়া আচ্ছন্ন করে ফেললো নূরীর চারদিকে। নূরী চীৎকার করে উঠলো-একি হলো একি হলো! মুহূর্তে অনুভব করলো সে তার হাত দুখানা লৌহশিকলে আবদ্ধ করা হয়েছে।
প্রাণপণ চেষ্টা করেও নূরী হাত দুখানাকে মুক্ত করে নিতে সক্ষম হলো মী।
তারপর একসময় নূরী দেখলো, তার চারদিকের ধূম্ররাশি ক্রমান্বয়ে মিশে আসছে। এবার পরিষ্কার দেখতে পেলো—যেখানে সে দাঁড়িয়েছিলো সেখানে কোন বাগান নেই, একটা অন্ধকার কক্ষে সে বন্দিনী। হাত-পা শৃঙ্খলাবদ্ধ! আকুল কণ্ঠে চীৎকার করতে গেলো কিন্তু একটু শব্দও তার মুখ দিয়ে বের হলো না। নূরী এবার বুঝতে পারলো, সন্ন্যাসী বাবাজীর কথা মিথ্যে নয়, সে মায়ারাণীর মায়াজালে আবদ্ধ হয়েছে। কি করবে নূরী। একে মনির জন্য মন তার আকুল, তারপর নিজের অবস্থাও মহাসঙ্কটময়। মনিকে উদ্ধার করতে এসে সেও বন্দিনী হলো। চারদিকে তাকালো নূরী-নিঃশ্বাস যেন তার বন্ধ হয়ে আসছে-কিন্তু কোথায় মনি।
নুরী যখন মনির জন্য এবং নিজের অবস্থা ভেবে আকুল হয়ে কাঁদছে, ঠিক সেই মুহূর্তে দেখলো একটি নারীমূর্তি তার সামনে এসে দাঁড়ালো, সাদা ধবধবে পরিচ্ছদে দেহ তার আবৃত –মাথায় মুকুটহাতে একটা পণ্ডের মত কিছু রয়েছে। চোখ দুটো কাজল টানা, জ দুটি ধনুকের মত বাঁকা–অদ্ভূত দেখতে নারীমূর্তিটা।
নূরীর সামনে দাঁড়িয়ে নারীমূর্তি বললো—কেঁদে আর কোনো লাভ হবে না, আর কোনোদিন তুমি মায়ারাজ্য থেকে বাইরে যেতে পারবে না। অট্টহাসি হেসে উঠলো নারীমূর্তি-হাঃ হাঃ হাঃ–_ নুরী শিউরে উঠলো, করুণ চোখে তাকালো নারীমূর্তির দিকে, তারপর মিনতির সুরে বললো–আমার মনি কোথায়? আমার মনি?
আবার হেসে উঠলো নারীমূর্তি অদ্ভুতভাবে তোমার মনি…হাঃ হাঃ হাঃ, তোমার মনিকেও আর কোনোদিন ফিরে পাবে না।
কি বললে, মনিকে আর কোনোদিন ফিরে পাবো না?
না না। জানো এ কোন্ রাজ্যে তুমি এসেছো?
জানি মায়ারাণী, আমি এখন তোমার মায়ারাজ্যে এসেছি।
হাঁ, তুমি আমার বন্দিনী।
আমার অপরাধ?
আমার মায়ারাজ্যে যে প্রবেশ করবে তাকেই আমার বন্দী হতে হবে।
বলো আমার মনি কোথায়?
সেও বন্দী।
পিশাচী, এতটুকু শিশুকে তুমি বন্দী করেছো?
আমার কাছে শিশু বা যুবক-বৃদ্ধ বলে কিছু নেই—আমার ঐ মায়া–বাগানে যে প্রবেশ করবে, সে-ই আবদ্ধ হবে আমার মায়াজালে! শুধু তুমি নও, তোমার মত শত শত নর-নারী যুবক-বৃদ্ধ-শিশু আমার মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে মায়ারাজ্যে বন্দী হয়ে রয়েছে। এখানে কারও সাধ্য নেই কাউকে মুক্ত করে নিয়ে যায়।
নূরী অবাক হয়ে মায়ারাণীর কথাগুলো শুনে যাচ্ছিলো। এসব কি শুনছে সে। পৃথিবীতে কি এমন জিনিস আছে যা যাদুবিদ্যা বা মায়াজালে মানুষকে এভাবে আচ্ছন্ন করতে পারে! এমন তো সে কোনোদিন শোনেনি বা দেখেনি। একি অদ্ভুত ব্যাপার সে দেখছে? শুধু দেখছে নয়, মন-প্রাণে উপলদ্ধি করছে। নূরী ভাবে, কি করে এই মায়ারাণীর মায়াজাল থেকে মুক্তি পাবে।
নূরী যখন আপন চিন্তায় বিভোর তখন হঠাৎ মায়ারাণী ধীরে ধীরে হাওয়ায় মিশে গেলো। বিস্ময়স্তব্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো নূরী-মায়ারাণী যে স্থানটিতে অদৃশ্য হলো সেইদিকে।
