জন আসন গ্রহণ করলো।
মিঃ লাহিড়ী পুনরায় নিজ আসনে বসে সিগারেট কেসটা বের করে মেলে ধরলেন জনের সম্মুখে–গ্রহণ করুন।
জন মিঃ লাহিড়ীর সিগারেট কেস থেকে একটি সিগারেট তুলে নিয়ে বললো-ধন্যবাদ।
সিগারেটটা ঠোঁটের ফাঁকে চেপে ধরে অগ্নিসংযোগ করে ম্যাচের কাঠিটা বাড়িয়ে ধরলো জন মিঃ লাহিড়ীর দিকে।
মিঃ লাহিড়ী কথা শুরু-করবার আগেই বললো জন মিস মালতীর হত্যাকান্ড আপনার নিকট কেমন মনে হয়?
মিঃ লাহিড়ী কিছুক্ষণ জনের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন—মিঃ জন, আপনি যদি কিছু মনে না করেন আমি আপনাকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞাসা করবো?
নিশ্চয়ই করুন। একটু থেমে বললো জন–মিস মালতীর হত্যা আমাকে বিচলিত করেছে ইন্সপেক্টার।
শুনেছি আপনি নাকি তাকে ভালোবাসতেন।
হাঁ ইন্সপেক্টার, আমি তাকে গভীরভাবে ভালোবাসতাম। একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে গেলো জন।
মিঃ লাহিড়ী তাকিয়ে দেখলেন জনের মুখ ব্যথাকরুণ হয়ে উঠেছে। এবার বললেন তিনি আমার যতদূর বিশ্বাস আপনার প্রিয়াকে যে হত্যা করেছে তাকে আমরা গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি।
ক্রুদ্ধ, হিংস্র হয়ে উঠলো জনের মুখমন্ডল, বললো—সত্যি বলছেন?
হাঁ মিঃ জন, সত্যি বলছি।
আশ্চর্য, আপনি এত সহজেই হত্যাকারীকে গ্রেপ্তারে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু যাকে আপনারা গ্রেপ্তার করেছেন সেকি সত্যিই হত্যাকারী—এ সম্বন্ধে
আপনি নিশ্চিত?
কতকটা তাই।
কিভাবে আপনি তাকে হত্যাকারী বলে নিশ্চিত হলেন?
কোথায় মিঃ লাহিড়ী জনকে প্রশ্ন করবেন তা নয়, জনই মিঃ লাহিড়ীকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে চললেন।
মিঃ লাহিড়ী জনের বুদ্ধিদীপ্ত কণ্ঠস্বরে এবং তার মধুময় ব্যবহার ও কথাবার্তায় মুগ্ধ হলো অতি স্বাচ্ছন্দে জনের প্রশ্নের জবাব দিয়ে চললেন। বললেন মিঃ লাহিড়ী–আমরা যাকে গ্রেপ্তার করেছি তাকে আপনি নিশ্চয়ই জানেন, তার নাম অরুণ বাবু!
হাঁ তাকে আমি জানি, যদিও তাকে দেখিনি কোনোদিন কিন্তু তার নাম আমি মিস মালতীর মুখে অনেকবার শুনেছি। আচ্ছা, এবার বলুন মিঃ লাহিড়ী, তাকে সন্দেহ করার কি কারণ থাকতে পারে?
মিঃ লাহিড়ী এবার বললেন—প্রথম কারণ, অরুণ ও মিস মালতী উভয়ে একই বাড়ীতে বাস করতো। দ্বিতীয় কারণ, যেদিন মিস মালতী নিহত হয় সেদিন অরুণ বাসায় বা সরাইখানায় ছিলো না। তৃতীয় কারণ, অরুণ বাবু হত্যারাত্রে গোপনে একখানা ছোরা লুকিয়ে পুকুরের পানিতে নিক্ষেপ করতে যাচ্ছিলো এবং সেই মুহূর্তে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আচ্ছা ইন্সপেক্টার, আপনার কি মনে হয় মিঃ অরুণ যে ছোরাখানা পুকুরের পানিতে নিক্ষেপ করতে যাচ্ছিলেন সেই ছোরা দিয়েই মিস মালতীকে হত্যা করা হয়েছে?
না, তেমন কোন প্রমাণ এখনও আমরা সংগ্রহ করতে পারিনি, তবে সেই ছোরাখানা দিয়েই যে মিস মালতীকে খুন করা হয়েছে এটা সঠিক। নাহলে অরুণ বাবু রাতের অন্ধকারে আত্মগোপন করে ছোরাখানা পুকুরের পানিতে নিক্ষেপ করতে যেতো না।
এর অন্য কোনো কারণও তো থাকতে পারে।
সে অবশ্য ঠিক কিন্তু যতদূর সম্ভব সে-ই খুনী।
ইন্সপেক্টার, আপনারা যদি সম্মত হন তবে এই মালতী হত্যা রহস্য উদ্ঘাটনে আমি আপনাদের সহায়তা করতে পারি।
আনন্দভরা কণ্ঠে মিঃ লাহিড়ী বললেন–নিশ্চয়ই। এটা তো খুশীর কথা। তাছাড়া মালতীর বাবা বাসুদে বাবু শুনলে তিনিও আনন্দিত হবেন।
সত্যি ইন্সপেক্টার, মালতীর হত্যা আমাকে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ও উত্তেজিত করে তুলেছে। জন কথার ফাঁকে দাঁতে দাঁত পিষলো। একটু থেমে পুনরায় বললো—মালতীর পোষ্টমর্টেমের রিপোর্টখানা আমাকে অনুগ্রহ করে দেখাবেন?
নিশ্চয়ই। মিঃ জন, আপনার মত একজন মহান ব্যক্তিকে আমরা সঙ্গী হিসেবে পেলে উপকৃত হবো। আপনি আমাদের সহায়তায় এগিয়ে আসছেন, আমরা ও পুলিশ বাহিনী এ ব্যাপারে আপনাকে যথাসাধ্য সহযোগিতা করবো।
ধন্যবাদ ইন্সপেক্টার। কথাটা বলে জন উঠে দাঁড়ালো। আবার দেখা হবে। গুডবাই।
ইন্সপেক্টার এবং অন্যান্য পুলিশ অফিসার উঠে তাকে বিদায় সম্ভাষণ, জানালেন।
জন বেরিয়ে গেলো।
আসন গ্রহণ করে বললেন মিঃ লাহিড়ী-ধনবান লুই-এর পুত্র জন এতদিন লন্ডনে ছিলেন, সবে ফিরে এসেছেন। কিন্তু কি আশ্চর্য, উনারও পরিচয় ছিলো বাসুদেবের মেয়ে মালতীর সঙ্গে।
মিঃ রায় বললেন মিস মালতীর সঙ্গে শহরের প্রায় ধনবান ব্যক্তিরই পরিচয় ছিলো, অবশ্য এটা তার বাবা বাসুদেবেরই সহযোগিতায় হয়েছে।
মিঃ লাহিড়ী বললেন–এতোবড় একটা সরাইখানার মালিক হয়ে বাসুদেব শর্মা নিজ কন্যাকে অর্থের লোভে ব্যভিচারে লিপ্ত করেছিলো। সুন্দরী যুবতীর লোভে পুরুষ পতঙ্গের দল ছুটে আসতো তার সরাইখানায়।
মৃত মালতীর মৃত্যু রহস্য নিয়ে পুনরায় মিঃ লাহিড়ী তাঁর সঙ্গীদের সঙ্গে আলোচনায় লিপ্ত হলেন।
০৭.
একদিন দ্বিপ্রহরে কুটিরের মধ্যে ঘুমিয়ে আছে নূরী, মনিও ঘুমিয়ে ছিলো পাশে। হঠাৎ মনির ঘুম ভেঙ্গে গেলো। খেজুর পাতার শয্যায় উঠে বসলো মনি, তাকালো নূরীর ঘুমন্ত মুখের দিকে। দেখলো মাম্মি ঘুমাচ্ছে।
দুষ্ট মনি নিঃশব্দে বেরিয়ে এলো বাইরে। পা পা করে এগিয়ে চললো সামনের দিকে। কুটিরের মধ্যে নূরী ঘুমিয়ে আছে, কেউ তাকে বাধা দেবার নেই। ছোট্ট মনি আপন মনে চলতে লাগলো।
মনি সোজা বনের পশ্চিম দিকে এগুচ্ছে। বয়স তার বেশী নয়-মাত্র তিন বছরে পা দিয়েছে মনি, বুদ্ধি বলতে কিছুই তেমন হয়নি। কিছুদূর এগুনোর পর মনি দেখলো, তার সামনে সুন্দর একটা ফুলের বাগান, নানা রকম ফুল ফুটে রয়েছে সেখানে। মনি আলগোছে প্রবেশ করলো বাগানের মধ্যে। একটা সুন্দর ফুল দেখে মনি যেমনি ফুলটা ছিঁড়ে ফেললো, অমনি একটি ধুম্ররাশি আচ্ছন্ন করে ফেললো গোটা বাগানটাকে। মনির হাত থেকে ফুটা খসে পড়লো, কেঁদে উঠলো মনি। কে একজন নারী মূর্তি তখন মনিকে কোলে তুলে নিয়েছে।
