ইন্সপেক্টার একবার সকলের অলক্ষ্যে অরুণ বাবুর মুখমন্ডল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ্য করলেন। তারপর লাশ মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করে তখনকার মত বিদায় গ্রহণ করলেন।
ইন্সপেক্টার সংগীদের নিয়ে চলে যেতেই অরুণ বাবু বলে উঠলো–একি, শটে গেলো কাকাবাবু?
সরাইখানার মালিক বাসুদেব তখনও কাঁদছিলেন। একমাত্র কন্যার মৃত্যু তার অন্তরে যেন শেলবিদ্ধ করেছে। বাববার তিনি রুমালে চোখ মুছছিলেন। অরুণ বাবুর কথায় তাকালেন তার দিকে, একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বললেন-সবই জানেন সেই সর্বজ্ঞ।
কাফ্রি চাকরটা তাকালো অরুণ বাবুর দিকে, তারপর বললো-এ ঘরে বেশীক্ষণ থাকতে মন আমার চাইছে না। কেমন যেন ভয় ভয় করছে।
অরুণ বাবু বলে উঠলো–চলুন কাকাবাবু, আমারও বড় অস্বস্তি লাগছে।
প্রৌঢ় ভদ্রলোক একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বললেন—চলো।
সবাই কক্ষ ত্যাগ করে বেরিয়ে গেলো।
অরুণ বাবু চলে যাবার সময় একবার কক্ষের চারদিকে লক্ষ্য করে দেখে নিলো, তারপর নিঃশব্দে অনুসরণ করলো সরাইখানার মালিক প্রৌঢ় ভদ্রলোককে।
সবাই কক্ষ ত্যাগ করতেই আলমারীর আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো বনহুর, চোখেমুখে তার একটা উন্মাদনা।
০৫.
কক্ষে অরুণ বাবু অস্থিরভাবে পায়চারী করছে। চোখে তার ঘুম নেই। দেয়ালঘড়িটা ঠক্ ঠক্ শব্দ করে আপন মনে নিজের গন্তব্য পথে এগিয়ে চলেছে।
অরুণ বাবুর ললাটে গভীর চিন্তার ছাপ ফুটে উঠেছে। চোখ দুটোতে কেমন জ্বালাময় চাহনি। মনের অস্থিরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে তার মুখোভাবে। কি যেন ভাবছে, কখনও মাথার চুল ধরে টানছে, কখনও বা অধর, দংশন করছে।
এক সময় অরুণ বাবু ঘরের টেবিলের ড্রয়ার খুলে ফেললো, বের করলো সুতীক্ষ্ণ ধার একখানা ছোরা-তুলে ধরলো চোখের সামনে। তারপর অতি সতর্কতার সঙ্গে জামার আড়ালে ছোরাখানা লুকিয়ে ফেলে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
ঠিক সেই মুহূর্তে একটা ছায়ামূর্তি সরে গেলো জানালার একপাশে।
অরুণ বাবু চারদিক তাকিয়ে দেখে নিলো। তারপর দরজা খুলে বেরিয়ে এলো বাইরে। অন্ধকারে দ্রুত এগিয়ে চললো।
ছায়ামূর্তি ধীরে ধীরে অতি সংগোপনে অরুণ বাবুকে অনুসরণ করলো।
অরুণ বাবু টানা বারান্দা ধরে কিছুদূর এগিয়ে থমকে দাঁড়ালো তাকালো চারদিকে, তারপর অতি দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামতে লাগলো।
পেছনে অনতিদূরে আত্মগোপন করে এগিয়ে চলেছে একটি ছায়ামূর্তি।
অরুণ বাবু বাড়ীর সামনে বাগানটার মধ্যে এসে দাঁড়ালো পুনরায় সচকিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকালো পেছনে। এবার বাগানস্থ পুকুরঘাটে এসে দাঁড়িয়ে পড়লো অরুণ বাবু। ছোরাখানা দ্রুত জামার আড়াল থেকে বের করে নিয়ে যেখনি সে পুকুরের পানিতে নিক্ষেপ করতে যাবে অমনি পেছন থেকে ছায়ামূর্তি স্থপ করে চেপে ধরলো অরুণ বাবুর হাতখানা।
চমকে ফিরে তাকালো অরুণ বাবু, মুখমন্ডল তার বিবর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে। অন্ধকার হলেও অরুণ বাবু চিনতে পারলে, অস্ফুট কণ্ঠে বললো–ইন্সপেক্টার!
গম্ভীর কণ্ঠে পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ লাহিড়ী বললেন—হাঁ, আমি। এবার আপনার সব চেষ্টা ব্যর্থ হলো তো?
অরুণ বাবু থমমত খেয়ে বললো–আপনি বিশ্বাস করুন, আমি মালতীকে খুন করিনি।
মিঃ লাহিড়ী হুইসেলে ফু দিলেন, সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন পুলিশ এসে অরুণ বাবু আর ইন্সপেক্টারের সম্মুখে দাঁড়ালো।
মিঃ লাহিড়ী বললেন–বন্দী করো একে।
ইতিমধ্যে অরুণ বাবুর হাত থেকে ছোরাখানা মিঃ লাহিড়ী কেড়ে নিয়েছিলেন।
অরুণ বাবু হঠাৎ এভাবে বন্দী হবে ভাবতেও পারেনি। ভেবেছিলো সে ছোরাখানা পুকুরের পানিতে নিক্ষেপ করে নিজে নির্দোষ হবে। কিন্তু পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ লাহিড়ী অতি চতুর ব্যক্তি, তিনি লাশ মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করে নিজেও দলবল নিয়ে বিদায় গ্রহণ করলেন বটে, কিন্তু একেবারে চলে গেলেন না। সবার অলক্ষ্যে লুকিয়ে পুনরায় ফিরে এলেন এই বাড়ীখানাতে। গোপনে অনুসরণ করলেন সন্দিগ্ধ ব্যক্তিকে।
মিঃ লাহিড়ী যা ভেবেছিলেন তাই, অরুণ বাবুকেই তার প্রথম থেকে সন্দেহ হয়েছিলো।
পুলিশ ইন্সপেক্টার যখন অরুণ বাবুকে বন্দী করে নিয়ে চললেন, তখন হঠাৎ একটা হাসির শব্দ তাদের কানে এলো। মুহূর্তে ফিরে তাকালো সবাই, কিন্তু কোথা থেকে এই হাসির শব্দ ভেসে এলো কেউ বুঝতে পারলো না।
০৬.
পুলিশ অফিসে গত রাতের মালতী হত্যা রহস্য নিয়ে আলোচনা হচ্ছিলো। মিঃ লাহিড়ী, পুলিশ অফিসার মিঃ রায় ও থানা অফিসার মিঃ আলী ছিলেন সেখানে।
অরুণ বাবুই যে মিস মালতীর হত্যাকারী এ ব্যাপারে মিঃ লাহিড়ী একেবারে নিঃসন্দেহ হয়ে পড়েছেন। কারণ, তিনি স্বচক্ষে দেখেছিলেন, অরুণ বাবু রাতের অন্ধকারে পুকুরের পানিতে একখানা ছোরা নিক্ষেপ করতে যাচ্ছিলেন।
মিঃ লাহিড়ী এবং অন্যান্য পুলিশ অফিসার যখন এই হত্যা ব্যাপার নিয়ে আলোচনায় রত ঠিক সেই মুহূর্তে কক্ষে প্রবেশ করে এক যুবক। সুন্দর সুপুরুষ। শরীরে মূল্যবান পোশাক।
মিঃ লাহিড়ী এবং অন্যান্য পুলিশ অফিসার বিস্ময়ভরা চোখে তাকালেন যুবকের দিকে।
লাহিড়ী কিছু জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিলেন কিন্তু তার পূর্বেই যুবক বলে উঠলো—আমি মিঃ লুই—এর পুত্র মিঃ জন।
মিঃ লাহিড়ী উঠে দাঁড়িয়ে সহাস্যে বললেন–আপনি মিঃ জন?
হাঁ, আমি মিস মালতীর হত্যা সংবাদ জানতে পেরে এসেছি।
বসুন মিঃ জন। লাহিড়ী মিঃ জনকে সাদরে অভ্যর্থনা জানালেন।
