আপনার কন্যা নিহত হওয়ার সংবাদ কি করে পেলেন?
এখানে একটি চাকর থাকে, সেই ছুটে গিয়ে আমাকে সংবাদ দেয়। ইরে রহমত, এদিকে আয়।
একটা জমকালো লোক কক্ষে প্রবেশ করে একপাশে দাঁড়ালো। লোকটা নিগ্রো বা ফ্রি বলে মনে হলো।
পুলিশ ইন্সপেক্টার লোকটার আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে বললেন–তুমি এ বাড়ীতে থাকো?
হাঁ। কাফ্রি লোকটা জবাব দিলো।
ইন্সপেক্টার পুনরায় প্রশ্ন করলেন—তুমি মিস মালতীর হত্যা সম্বন্ধে কি জানো বলো?
কাফ্রি খাঁটি বাংলায় বললো—আমি আজ সকাল সকাল ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কারণ–যুবকের দিকে তাকিয়ে বললোঊনিও ছিলেন না, একা একা কি করবো। দিদিমণির খাবার সাজিয়ে রেখে শুয়ে পড়েছিলাম।
তোমার দিদিমণি কখন বাসায় ফিরে এসেছিলো জানো?
জানি। সিঁড়িতে পায়ের শব্দ শুনে জেগে পড়েছিলাম। মনে করেছিলাম, দিদিমণির খাবার এবং অন্য সব কিছু তো গুছিয়ে রেখেছি, তবু যদি ডাকেন তবে উঠে পড়বো। কিন্তু তিনি আর ডাকলেন না। আমিও উঠলাম না। চুপ করে শুয়ে থেকেই শুনতে পেলাম সিঁড়িতে একসংগে দুজন লোকের পায়ের শব্দ।
দুজন লোকের পায়ের শব্দ?
হাঁ স্যার। আমার মনে হলো অরুণ বাবু আর মালতী দিদি এক সংগে ফিরে এলেন। কাফ্রি লোকটা যুবকটির দিকে আর একবার তাকালো।
বনহুর আড়ালে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারলো, যুবকটির নাম অরুণ বাবু। আলমারীর আড়ালে আত্মগোপন করতে গিয়ে মশার কামড়ে পা দুটো জ্বালা করছে। কিন্তু উপায় নেই একটু নড়বার। রুদ্ধ নিঃশ্বাসে ওদের কথাবার্তা শুনছে বনহুর।
পুলিশ ইন্সপেক্টার এবার যুবকে লক্ষ্য করে বললেন অরুণ বাবু, আপনি কি মিস মালতীর সংগে ফিরে এসেছিলেন? সত্যি কথা বলবেন।
সত্য কথাই বলবো আমি তার সংগে ফিরে আসিনি। গম্ভীর স্থির কণ্ঠস্বর অরুণ বাবুর।
তবে কে এসেছিলো মিস মালতীর সঙ্গে? প্রশ্ন করলেন ইন্সপেক্টার।
অরুণ বাবু পূর্বের ন্যায় স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো—সে কথা নিহত মালতী ছাড়া কেউ জানেনা।
হুঁ। অস্ফুট শব্দ করলেন পুলিশ ইন্সপেক্টার।
আড়ালে দাঁড়িয়ে বনহুরের ভূকুঞ্চিত হলো।
এবার ইন্সেপক্টার প্রশ্ন করলেন কাফ্রি চাকরটাকেএসড়িতে উঠাকালে মালতী এবং দ্বিতীয় ব্যক্তির কথাবার্তা শুনতে পাওনি?
না স্যার। সিঁড়িতে তাদের কোনো কথাবার্তা শুনতে পাইনি। তবে একটু পরে দিদিমণির কক্ষে অরুণ বাবুর গলার স্বরের মত আওয়াজ পেয়েছিলাম একটু।
অরুণ বাবু বলে উঠলেন–মিথ্যে কথা! আমি কিছুক্ষণ পূর্বে আমার কাজ সেরে সরাইখানায় ফিরে মালতীর হত্যাকান্ডের কথা জানতে পারি এবং উনার সঙ্গে চলে আসি। মালিককে দেখিয়ে বললো–অরুণ বাবু।
ইন্সপেক্টার এবার কাফ্রি চাকরটাকে প্রশ্ন করলেন–তুমি মালতীর হত্যা ব্যাপারে কখন জানতে পেরেছিলে?
কাফ্রি চট করে বললো–আমি একটু ঘুমিয়ে পড়েছি, হঠাৎ একটা আর্তনাদে আমার ঘুম ভেঙে গেলো। আর্তনাদের শব্দটা দিদিমণির বলেই মনে হলো–ছুটে গেলাম সিঁড়ি দিয়ে, ওপরে গিয়ে হতবাক হলাম, দেখলাম দিদিমণির রক্তাক্ত দেহ মেঝেতে পড়ে আছে।
পুলিশ ইন্সপেক্টার বললেন–তারপর?
কাফ্রি একবার সকলের অলক্ষ্যে অরুণ বাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে নিলে, অরুণ বাবুও তাকিয়েছিল তার দিকে। দিষ্টি বিনিময় হতেই চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল সে আমি কখন কি করবো ভেবে না পেয়ে ছুটলাম, সরাইখানার দিকে।
আলমারীর আড়ালে দাঁড়ালো বনহুর, দাঁতে দাঁত পিষলো, কারণ কাফ্রির কপাট। সম্পূর্ণ মিথ্যা। সে ভালোভাবে লক্ষ্য করেছে—এ বাড়ী থেকে দুজন লোকটা ট্যাক্সিতে পালিয়েছে। এ ছাড়া অন্য কেউ এ বাড়ীর বাইরে যায়নি। কাফ্রি চাকরটা একেবারে মিথ্যা কথা বানিয়ে বললো।
পুলিশ ইন্সেপেক্টর বললেন–তুমি যখন সরাইখানায় গিয়ে পৌঁছলে, তখন সেখানে কি অরুণ বাবু ছিলেন?
না, ছিলেন না। আমি দিদিমণির হত্যাকান্ডের কথা মালিককে জানিয়ে বেরিয়ে আসছি, এমন সময় অরুণ বাবু সেখানে উপস্থিত হলেন।
ইন্সপেক্টর গম্ভীরভাবে একটু ভেবে নিয়ে সরাইখানার মালিককে লক্ষ্য করে বললেন–মিঃ শর্মা, আপনি কি জানেন আপনার কন্যার সঙ্গে আর কোনো ব্যক্তির বিশেষ ঘনিষ্ঠতা বা নিবিড় যোগাযোগ ছিলো?
বাসুদেব শর্মা ব্যথাকাতর কণ্ঠে বললেন–আমার কন্যা মালতীর তেমন কোনো বন্ধু-বান্ধব ছিলো না। সে সব সময় অরুণের সঙ্গেই ওঠা–বসা করতো।
আপনি খুব ভালভাবে চিন্তা করে বলুন আর কারও সঙ্গে তার মেলামেশা ছিলো কি না?
বেশ কিছুক্ষণ মৌন থেকে বললেন বাসুদেব ছিলো, সে হচ্ছে ধনবান মিঃ লুই এর পুত্র জন। জনকে এক সময় মালতী গভীরভাবে ভালবাসতো। জনও ভালোবাসতো মালতীকে। কিন্তু জন লন্ডনে চলে যাবার পর মালতী একমাত্র অরুণ ছাড়া আর কারও সঙ্গে তেমন ঘনিষ্ঠভাবে মিশতো না।
ইন্সপেক্টর বললেন-জন কি এখন লন্ডনেই অবস্থান করছে?
না, সে কিছুদিন হলো ফিরে এসেছে।
এখনও কি সে আপনার কন্যার সংগে পূর্বের ন্যায় মেলামেশা করতো?
না, লন্ডন থেকে ফিরে আসার পর সে মালতীর সঙ্গে দেখাই করতে আসেনি। মালতীই নাকি গিয়েছিলো তার সঙ্গে দেখা করতে। শুনেছি সে মালতীর সঙ্গে খুব ভাল ব্যবহার করেনি।
পুলিশ ইন্সপেক্টর মিঃ লাহিড়ী একটা শব্দ করলেন। তারপর বললেন-মালতী ফিরে এসে কিছু বলেছিলো আপনাকে?
হাঁ। বলেছিলো, জন নাকি কোন মেয়েকে বিয়ে করবে বলে কথা দিয়েছে। একটু থেমে বললেন বাসুদেব–মালতী জনকে গভীরভাবে ভালোবেসেছিলো। সেদিন ওর ওখান থেকে ফিরে গোটা রাত কেঁদে কেঁদে কাটিয়েছিলো মা আমার। একটু থেমে বললেন পুনরায়—জনের সুন্দর চেহারাই আমার মালতীর কাল হয়েছিলো ইন্সপেক্টর।
