চাকার হাওয়া বেরিয়ে গেলো। গাড়ী কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে থেমে পড়লো। বনহুর দ্রুত ছুটলো গাড়ীর দিকে।
লোকগুলোও সজাগ ছিলো গাড়ী থেমে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে নেমে পড়লো, তারপর একটা বাড়ীর আড়ালে অদৃশ্য হলো।
বনহুর গাড়ীর নিকটে পৌঁছে হতবাক হলো।
আলখেল্লাধারী ও গাড়ীর ড্রাইভার উভয়েই কোনো বাড়ীর অন্তঃপুরে আত্মগোপন করেছে।
ঘন বাড়ীঘর আর দালানকোঠা থাকায় শয়তানদ্বয় পালাতে সক্ষম হলো, নইলে বনহুরের হাতে তাদের রক্ষা ছিলো না।
বনহুর এবার দ্রুত ছুটে চললো সেই পূর্বের বাড়ীটার দিকে। যে বাড়ী থেকে পূর্বে একটা করুণ আর্তনাদ ভেসে এসেছিলো।
বনহুর প্রাচীর বেয়ে উপরে উঠলো, তারপর পাইপ বেয়ে উঠতে লাগলো। দোতলা হলেও বেশ উঁচু বাড়ীখানা। বনহুর অনেক চেষ্টায় উঠে পড়লো। তারপর রেলিং টপকে প্রবেশ করলো দোতলার বারান্দায়। সতর্কভাবে চারদিকে তাকিয়ে দেখলো। গোটা বাড়ীটা নিস্তব্ধ। বনহুর আর বিলম্ব না করে কক্ষের দরজায় এসে ধাক্কা দিলো, সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে গেলো।
কক্ষে প্রবেশ করতেই স্তম্ভিত হতবাক হলো সে।
কক্ষের মেঝেতে লুকিয়ে পড়ে আছে একটি রক্তাক্ত যুবতী। যুবতীর বুকের রক্তে মেঝের কার্পেট লালে লাল হয়ে গেছে।
বনহুর যুবতীর মুখের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো,
একি! এ যে সেই যুবতী!
সন্ধ্যায় সরাইখানায় এই যুবতীই অর্ধ উলঙ্গ অবস্থায় নেচেছিলো এবং যার গলা থেকে বনহুর মূল্যবান হারছড়া গোপনে খুলে নিয়েছিলো। কিন্তু একে হত্যা করলো কে? কি কারণ রয়েছে এর হত্যার পেছনে? এতবড় বাড়ীতে যুবতী একাই বা থাকে কেন এর কি কেউ নেই?
বনহুরের মনে নানা প্রশ্নে উঁকি দিচ্ছে। নিহত যুবতীকে ভাল করে লক্ষ্য করতে লাগলো সে। দেখলো যুবতীর বুকে গভীর ক্ষত ছোরার আঘাতে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এখনও ক্ষত দিয়ে তাজা লাল টকটকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।
বনহুরের দৃষ্টি হঠাৎ চলে গেলো যুবতীর গলায়। একটা আঁচড়ের লাল দাগ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সেখানে। যুবতীর হাতখানা মুষ্টিবদ্ধ দেখে বনহুর দ্রুতহস্তে ওর হাতের মুঠি খুলে ফেললো। চমকে উঠলো বনহুর, নিহত যুবতীর মুঠার মধ্যে দেখতে পেলো চেনের খানিকটা অংশ, একটা মূল্যবান পাথরও রয়েছে চেনের সঙ্গে। বিদ্যুতের আলোতে চেনের পাথরটা ঝকমক করে উঠলো। বনহুরের স্মরণ হলো-সন্ধ্যায় যুবতীর গলায় এই হারছড়াই সে দেখেছিলো এবং এটাই সে খুলে নিয়েছিলো। হারে অন্ততঃপক্ষে এই রকম পাঁচখানার. বেশী পাথর ছিলো এও বেশ মনে আছে তার।
বনহুরের নিকটে যুবতীর হত্যা-রহস্য এবার পরিস্কার হয়ে এলো। দুঃখ, হলো তার হারছড়া তখন যদি ফিরিয়ে না দিতো তাহলে আজ এই মুহূর্তে যুবতীর মৃত্যু ঘটতো না।
বনহুর যুবতীর হাতের মুঠা থেকে মালার টুকরোখানা নিয়ে দাঁড়ালো, শপথ করলো সে—এই যুবতীর হত্যাকারীকে সে খুঁজে বের করবেই, এবং নিজ হাতে এর শাস্তি তাকে দেবে।
বনহুর উঠতে যাবে—এমন সময় সিঁড়িতে দ্রুত বুটের শব্দ শোনা গেলো।
বনহুর এবার বুঝতে পারলো, কোনো লোক এই হত্যার সন্ধান পেয়েছে। এখন তারা যদি এসে তাকে এখানে এই অবস্থায় দেখে ফেলে তাহলে আর রক্ষা নেই। তাকেই যুবতীর হত্যাকারী বলে জানবে। মুহূর্ত বিলম্ব না করে বনহুর একটা আলমারীর পেছনে লুকিয়ে পড়লো।
সঙ্গে সঙ্গে কক্ষে প্রবেশ করলো কয়েকজন পুলিশ অফিসারসহ এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক ও এক যুবক। বনহুর দেখতে পেয়েই চিনতে পারলো প্রৌঢ় লোকটি অন্য কেউ নয়, সরাইখানার মালিক যাকে তখন বনহুর মালাছড়া দিয়ে এসেছিলো আর যুবকটিকেও তখন সে দেখেছিলো সরাইখানার একটি টেবিলের পাশের চেয়ারে।
পুলিশ অফিসারাগণ ও প্রৌঢ় ভদ্রলোক যুবতীর লাশের নিকটে এসে দাঁড়ালেন। প্রৌঢ় ভদ্রলোক বারবার রুমালে চোখ মুছতে লাগলেন। পুলিশ অফিসার একজন—বোধ হয় পুলিশ ইন্সপেক্টার হবেন, তিনি ঝুঁকে পড়ে লাশ পরীক্ষা করে দেখতে লাগলেন।
প্রৌঢ় ভদ্রলোক বলে উঠলেন—না জানি কোন দুশমন আমার কন্যা মালতীকে খুন করেছে।
বনহুর এবার বুঝতে পারলো, নিহত যুবতী সরাইখানার মালিকের কন্যা, নাম মালতী। কিছুটা অবাকও হলো বনহুর প্রৌঢ় ভদ্রলোকের রুচির পরিচয় পেয়ে। নিজ কন্যার দ্বারা এভাবে অর্থ উপার্জন ছাড়া তার কি কোনো উপায় ছিলো না? কিন্তু সঙ্গের যুবকটি কে? যে এখনও একটি কথাও উচ্চারণ করেনি। লাশটার একপাশে দাঁড়িয়ে স্থিরচোখে তাকিয়ে আছে সে।
পুলিশ ইন্সপেক্টার লাশ পরীক্ষা শেষ করে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন, কুঞ্চিত করে বললেন আপনার কন্যার হত্যাকান্ড অত্যন্ত রহস্যজনক।
প্রৌঢ় ধরা গলায় বললেন-হাঁ স্যার, সেই রকমই মনে হচ্ছে।
ইন্সপেক্টর বললেন-আপনি এবার সব কথা আমার কাছে স্পষ্টভাবে বলুন। কারণ, আপনার বলার বিবরণে নির্ভর করবে আপনার কন্যার মৃত্যু-রহস্য উদঘাটন।
প্রৌঢ় বলল–বলুন কি জানতে চান।
ইন্সপেক্টার একটা সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে একমুখ ধোঁয়া ছুড়ে বললেন–আপনার কন্যা কি এ বাড়ীতে একাই থাকতো?
না। যুবকটির দিকে তাকিয়ে বললেন প্রৌঢ় ভদ্রলোক-ও নীচের তলায় থাকে। আজ সে ছিলো না, সরাইখানার একটা জরুরী কাজে তাকে বাইরে পাঠিয়েছিলাম।
আপনি কোথায় থাকেন?
আমি–আমাকে সরাইখানার কাজে প্রায়ই সেখানে থাকতে হয়। আমি সরাইখানার একটি কামরায় থাকি।
