বনহুরকে দেখে সরাইখানার মালিক সসম্মানে অভ্যর্থনা জানালো।
বনহুর একটা চেয়ারে গিয়ে বসলো। তাকিয়ে দেখতে লাগলো সরাইখানার চারদিকে। প্রত্যেকটা টেবিলের পাশে জটলা পাকিয়ে লোকজন বসে আছে। মাঝে মাঝে দুচারজন নারীও রয়েছে।
সব টেবিলেই মদের বোতল আর নানা রকম ফলমূল সাজানো। বনহুর সরাইখানায় প্রবেশ করতেই কক্ষস্থ সবাই একবার তার দিকে তাকিয়ে দেখলো। অবশ্য বনহুরকে এ সরাইখানায় তারা এই প্রথম দেখলো। তাই আশ্চর্য হলো অনেকেই।
কয়েকটা যুবতী বসেছিলো, তারা বনহুরকে দেখে নিজেরা মুখ চাওয়া চাওয়ি করে নিলো। সবাই বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে আছে বনহুরের দিকে।
একটি অর্ধ উলঙ্গ নারী নাচতে শুরু করলো।
একপাশে বাদ্যকরগণ দাঁড়িয়ে বাজনা বাজাচ্ছে।
বনহুরের সামনে এক বোতল মদ আর কিছু মাংস ও ফলমূল এনে সাজিয়ে রাখলো।
বনহুর অত্যন্ত ক্ষুধার্ত ছিলো, খেতে শুরু করলো।
কিন্তু যখন স্মরণ হলো, তার পকেট তো শূন্য, তখন কুঞ্চিত করে ভাবতে লাগলো। খেয়েছে এখন পয়সা দিতে হবে তো?
পয়সার চিন্তায় বেশ অশ্বস্তি বোধ করলো। সে দস্যু হতে পারে, লুটতরাজ করে নিতে পারে, বিপাকে পড়লে খুন করতেও তার বাধে না। কিন্তু সে তো পয়সা ছাড়া খেতে পারে না। বনহুর অন্যমনস্কভাবে চিন্তা করছে। ঠিক সেই মুহূর্তে নাচনেওয়ালী নাচতে নাচতে তার পাশে এসে দাঁড়ালো, অদ্ভুত ভঙ্গিতে ঝুকে পড়লো বনহুরের দিকে।
বনহুর তাকালো, দেখনো নাচনেওয়ালীর গলায় ঝকঝক করছে একছড়া হার। মূল্যবান হার ছড়ার দিকে তাকিয়ে বনহুর উঠে দাঁড়ালো। হাত বাড়ালো নাচনেওয়ালীর দিকে।
নাচনেওয়ালী বনহুরের চেহারায় মুগ্ধ হলো। দুহাত বাড়িয়ে বনহুরের জামার আস্তিন চেপে ধরে নাচার ভঙ্গিতে ঝুঁকে পড়লো।
সেই ফাঁকে অদৃশ্য হলো নর্তকীর কণ্ঠের হার।
বনহুর এসে বসলো টেবিলের পাশে।
নর্তকীর নাচ তখন শেষ হয়ে গেছে। অনেকেই বেরিয়ে যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালো। তাদের সংগে বনহুরও উঠে দাঁড়ালো।
সরাইখানার মালিক একপাশে গদি আঁটা সোফায় বসে আলবোলা টানছিলো।
বনহুর ভীড় ঠেলে বেরিয়ে যাবার সময় চট করে হারছড়া সরাইখানার মালিকের হাতে গুঁজে দিয়ে দ্রুত সরে পড়লো।
সরাইয়ের মালিক হারছড়া হাতে নিয়ে অবাক হয়ে দেখছে, আর ভাবছে, সামান্য ভুরিভোজনে একটা মূল্যবান হার–ব্যাপার কি?
সরাইখানার মালিক হারছড়া হাতে নিয়ে দেখছে, এমন সময় নর্তকীর করণ অর্তিকণ্ঠ শোনা গেলো আমার হার কি হলো! আমার হার কি হলো?
সরাইখানার মালিক নর্তকীর দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ভরা চোখে দেখলো তার গলা শুন্য, হার নেই। সব বুঝতে পারলো এটাই নর্তকীর হার। আশ্চর্য, এ হার নতুন আগন্তুক লোকটির নিকটে কি করে গেলো এবং সে না নিয়ে তার হাতে দিয়ে গেলো কেন ভাবতে লাগলো সরাইয়ের মালিক। তারপর হারটা ফিরিয়ে দিলো সে নর্তকীর হাতে।
বনহুর পথ চলেছে। রাতের মত ক্ষুধা পূরণ হয়ে গেছে তার। এখন বিশ্রামের প্রয়োজন। বহু পথ আজ সে হেঁটে এসেছে। এক রাজ্য ছেড়ে অন্য রাজ্যে।
শিথিল পা দুখানা টেনে টেনে চলছিলো বনহুর। এখনও তার সঙ্গী রাইফেলটা রয়েছে।
রাত বেড়ে আসছে।
একটা নির্জন পথ ধরে এগুচ্ছিলো বনহুর। মাঝে মাঝে দুএকটা পথিক তার পাশ কেটে চলে যাচ্ছিলো।
এখানে কেউ তাকে চেনে না, যদি কেউ জানতো এ লোক স্বাভাবিক পথিক নয়, তাহলে আঁতকে উঠতো। কিন্তু এদেশের কেউ বনহুরকে চেনেনা জানে না।
বনহুর আপন মনে এগিয়ে চলেছে।
অন্য একটা সরাইখানা পেলে উঠে পড়বে, রাতের মত একটু আশ্রয় তার চাই।
হঠাৎ বনহুরের কানে ভেসে এলো একটা নারীকন্ঠের তীব্র করুণ আর্তনাদ–আঃ, আঃ, আঃ–ক্রমে থেমে এলো শব্দটা।
বনহুরের জড়তা মুহূর্তে ছুটে গেলো, সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে তাকালো চারদিকে।
বনহুর লক্ষ্য করলো পথের ধারে একটা বাড়ীর দোতলা থেকে এই শব্দটা এসেছে। বাড়ীটা মস্তবড়। দ্বিতলের একটা কক্ষে আলো দেখা যাচ্ছে।
বনহুর স্থির হয়ে দাঁড়ালো, তাকিয়ে রইলো দোতলার বৈদ্যুতিক আলোক রশ্মির দিকে। একটা ছায়ার মত কিছু নড়ছে দেখতে পেলো সে। আর একদন্ড বিলম্ব না করে রাইফেলখানা পিঠের সঙ্গে বেঁধে বাড়ীখানার দিকে এগিয়ে গেলো সে। লক্ষ্য করে দেখলো কিভাবে ওপরে যাওয়া যায়। নিশ্চয়ই কোনো নারী বিপদে পড়েছে।
বনহুর কিছু ভাবছে ঠিক সেই মুহূর্তে একটা ট্যাক্সি থামলো বাড়ীখানার সামনে।
বনহুর মুহূর্তে সরে দাঁড়ালো দেয়ালের আড়ালে।
বনহুর আড়াল থেকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে দেখতে লাগলো।
ট্যাক্সিখানা পৌঁছতেই বাড়ার মধ্যে সিঁড়িতে দ্রুত পদশব্দ হতে লাগলো। ভারী জুতোর শব্দ, কেউ সিঁড়ি বেয়ে দোতলা থেকে নেমে আসছে মনে হলো।
বনহুর স্তব্ধ নিঃশ্বাসে প্রতীক্ষা করতে লাগলো।
দরজা খুলে গেলো, চমকে উঠলো বনহুর। দেখতে পেলো আপাদমস্তক জমাকালো আলখেল্লায় ঢাকা একটা লোক দ্রুত গাড়ীটায় উঠে বসলো।
মাত্র দুজন লোক গাড়ীতে। একজন ড্রাইভার অন্যজন সেই অদ্ভুত আলখেল্লাধারী।
বনহুর ভাবলো, এই মুহূর্তে এদের দুজনকে কাবু করা তার পক্ষে অসম্ভব কিছু নয়, কিন্তু এই যে একটা আর্তনাদ তারপর এদের দ্রুত পলায়ন, এর পেছনে কি রহস্য লুকিয়ে আছে কে জানে।
বনহুর লোক দুটিকে অনুসরণ করবে না দোতলায় গিয়ে দেখবে ভাবতে লাগলো। এমন সময় গাড়ীখানা স্টার্ট দিয়ে চলতে শুরু করলো। বনহুর সঙ্গে সঙ্গে গাড়ীর চাকা লক্ষ্য করে গুলী ছুড়লো।
