এরপর একদিন সত্যিই হীরার বিয়ের দিন এগিয়ে এলো।
মহারাজ নারায়ণ দেব কন্যার বিয়ের সব আয়োজন করলেন। যদিও প্রজাগণ এ বিয়েতে সন্তুষ্ট ছিলো না তবু মহারাজের মতের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলতে পারলে না।
একমাত্র রাজগুরু বেঁকে বসলেন, মহারাজকে জানালেন–বিধবা কন্যার বিয়ে দিলে অমঙ্গল হবে।
রাজগুরুর আদেশ অমান্য করা কারও সাধ্য নয়। মহারাজ নারায়ণ দেব। চোখে সর্ষে ফুল দেখলেন। এটা কি তারই ইচ্ছা, দস্যু বনহুর তাঁকে বাধ্য করেছেনইলে মৃত্যু তাঁর অনিবার্য। মহারাজের হৃদয়ে ঝড়ের তান্ডব শুরু হলো।
একদিকে দস্যু বনহুরের তীক্ষ্ণধার ছোরা আর একদিকে রাজগুরুর। অমঙ্গল বাণী। নারায়ণ দেব সমস্যায় পড়লেন। এদিকে বিয়ের সব আয়োজন সমাধা হয়েছে।
পাত্র কে এবং কেমন দেখতে কিছুই জানেন না মহারাজ, এসব দায়িত্ব নিয়েছে বনহুর নিজে।
মহারাজকে বলেছে সে আপনার কন্যার মঙ্গল কামনাই আমার লক্ষ্য। আপনার জামাতা কুলীন ব্রাহ্মণ এবং সে অন্য এক রাজ্যের রাজা। দেখতে শুনতে বেশ। হীরার সাথে মানাবে ভাল। বিয়ের দিন বর আসবে বিয়ে হবে। তারপর শুভ দৃষ্টির সময় বরের মুখের আবরণ উন্মোচন করা
হবে।
বিয়ের দিন।
হীরা বাঈকে ঘিরে সখীরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে।
নানা জনে নান রকম আলাপ ঠাট্টা করছে তার সঙ্গে। হীরার মনে খুশীর উৎস বয়ে চলেছে। আজ সে বনহুরকে নিজের করে পাবে। আর কোনদিন সে চলে যাবে না তাকে ছেড়ে।
বিয়ে হয়ে গেলো।
এবার শুভ দৃষ্টি।
বরের মুখ এতক্ষণ একটা সুন্দর চাদরে ঢাকা ছিলো। কতগুলো ফুলের মালাও ছিলো ছোট চাদারের সংগে আঁটা। তবে বরকে ভালই লাগছিলো, যদিও তার মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো না।
শুভ দৃষ্টির সময় চমকে উঠলো হীরা, এ তো তার বনহুর নয়। কিছু বলতে পারলো না, একটা অস্ফুট শব্দ করে ঢলে পড়লো সে। কিন্তু আর কোনো উপায় নেই। অগ্নিস্বাক্ষী রেখে বিয়ে তাদের হয়ে গেছে।
হীরা যখন স্বামীর সঙ্গে বাসর কক্ষে প্রবেশ করলো তখন বনহুর একটা অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করে দ্রুত বেগে ছুটে চলেছে রাজ্যের শেষ প্রান্তে।
এরপর আর কোনদিন হীরা বা তার সখীরা বনহুরকে দেখতে পেলো।
০৪.
অজানার পথে ছুটে চলেছে বনহুর। কোথায় চলেছে তা সে নিজেই জানে না। দিকহারা, দিশেহারা উদভ্রান্ত পথিকের মত যেদিকে দুচোখ যায় সেদিকে অশ্ব চালনা করছে।
দিন যায়, রাত আসে–আবার দিন হয়! আবার রাত হয়! বনহুরের চলার বিরাম নেই।
একদিন পথের শেষে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এলো। আশে পাশে কোথাও কোনো লোকালয় নেই। বনহুর আর এগুলো সমীচীন মনে করলো না। একটা গাছের সংগে ঘোড়াটা বেঁধে গাছটার নীচে শুয়ে পড়লো। পথ চলার ক্লান্তি আর অবসাদে বনহুরের শরীর অবসন্ন হয়ে পড়েছিলো,
অল্পক্ষণেই ঘুমিয়ে পড়লো সে!
একটা ধস্তাধস্তির শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেলো বনহুরের। তাড়াতাড়ি উঠে বসলো, তাকালো সামনের দিকে! অন্ধকারে কিছুই নজরে পড়ছে না—শুধু তার ঘোড়াটা যেখানে বাধা ছিলো সেইখানে প্রচন্ড শব্দ হচ্ছে।
বনহুর কিছু বুঝতে না পেরে অগ্রসর হলো।
একটু এগিয়েছে অমনি পায়ের সংগে বিরাট গাছের গুঁড়ির মত কিছু লেগে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলো। সর্বনাশ, কি ঠান্ডা সেই জিনিসটা। বনহুর ভয় পাবার পাত্র নয়, চট করে উঠে দাঁড়ালো। অন্ধকারে সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মুহূর্তে তার মুখমন্ডল বিবর্ণ হলো, বিস্ময়ে আড়ষ্ট হলো সে।
বনহুরের মত নির্বীক দস্যুও বিচলিত হলো।
বিরাট একটা অজগর তার অশ্বটার অর্ধেক গিলে ফেলেছে আর অর্ধেকটা এখনও ঝুলছে অজগরের মুখ গহ্বরে। ঘোড়াটার সামনের ভাগ অজগরের মুখের ভেতরে প্রবেশ করেছে, আর পেছনের অংশ এখনও ছটফট করছে। বনহুর নিরস্ত্র নয়, তার সংগে একটা রাইফেল রয়েছে। এটা বনহুর মহারাজ নাবায়ণ দেবের অস্ত্রাগার থেকে নিয়ে এসেছিলো। বনহুর রাইফেল বাগিয়ে ধরলো, কিন্তু গুলী ছুঁড়বার পূর্বে মনে হলো ওকে মেরে কোনো ফল হবে না। ঘোড়াটা প্রাণ হারিয়েছে, আর তাকে ফিরে পাওয়া যাবে না। রাইফেল নীচু করে নিলো বনহুর।
কিন্তু এখানে আর বিলম্ব করা মোটেই উচিত নয়। বনহুর রাতের অন্ধকারেই দ্রুত চলতে লাগলো।
অশ্বটাকে হারিয়ে বনহুর বিপদে পড়লো। এই নির্জন নিস্তব্ধ রাত্রির অন্ধকারে কোন দিকে কোথায় যাবে। কোথায় কোন বিপদ ওত পেতে আছে কে জানে।
বেশী দূর না এগিয়ে বনহুর সামনে একটা বৃক্ষ দেখতে পেয়ে তাতেই চড়ে বসলো।
সেদিন রাতে আর ঘুম হলো না।
ভোরের আলো ফুটে উঠতেই বনহুর নেমে পড়লো। ঘোড়াটা না থাকায় বড় অসুবিদা হয়ে পড়লো তার। পায়ে হেটে কতদূর যাবে, কোথায় যাবে সে?
তবু চলতে লাগলো, দক্ষিণ হাতে গুলীভরা রাইফেল। এটাই এখন তার সম্বল।
বনবাদাড়, পথ-ঘাট মাঠ পেরিয়ে এগিয়ে চললো বনহুর। গোটা দিন চলার পর দূরে অনেক দূরে দেখা গেলো বড়বড় দালানকোঠা আর ইমারত।
বনহুর দ্রুত পা চালালো।
ক্ষুধায় পিপাসায় অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়েছিলো সে। তবু এগুচ্ছে যেমন করে হোক তাকে শহরে পৌঁছতেই হবে।
প্রায় সন্ধ্যার কাছাকাছি, বনহুর শহরের সিংহদ্বারে এসে পৌঁছলো। একটা সরাইখানা দেখতে পেয়ে সেখানে প্রবেশ করলো।
বনহুরের দেহের পোশাক পরিচ্ছদ রাজ রাজার মতই ছিলো। হীরার ইচ্ছায় তাকে এ পোশাক পরতে হয়েছিলো। একটা মূল্যবান পাগড়ীও ছিলো তার মাথায়। পায়ে মূল্যবান নাগরা।
