দিন যায়, মাস আসে।
দিনে দিনে গড়িয়ে যায় একটি বছর।
মনি এখন বেশ ভালভাবে হাঁটতে শিখেছে। দীপ্ত সুন্দর ফুলের কুঁড়ির মত অর্ধ ফুটন্ত চেহারা। মাথায় কোঁকড়ানো চুল, ঘাড়ের ওপর ঝুলে পড়েছে। গভীর নীল দুটি চোখে মনোমুগ্ধকর চাহনি। ভাঙ্গা ভাঙ্গা শব্দে অস্ফুট ধ্বনি করে, সারাদিন খুটখুট করে হেঁটে বেড়ায়।
নূরীর ওকে নিয়ে আশঙ্কার শেষ নেই, না জানি কখন কোন দিকে চলে যাবে, কোনো হিংস্র জানোয়ার কখন ঘাড় মটকে খেয়ে ফেলবে কে জানে।
নূরী মনিকে নিয়ে যতই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে সন্ন্যাসী বাবা সান্ত্বনা দেন–ভয় নেই বৎস, এ বনে আমার সীমানায় কোনো পাপাচারী প্রবেশে সক্ষম হবে না। কিন্তু সাবধান, পশ্চিমে যেন তোমার মনি না যায়।
০৩.
সিন্ধুর মহারাজ নারায়ণ দেবের বিধবা কন্যা হীরাবাঈকে বিয়ে দিতে বাধ্য করেছিলো দস্যু বনহুর। হীরা এ বিয়েতে প্রথমে রাজী হয়নি, সে মনপ্রাণ দিয়ে ভালবেসেছিলো বনহুরকে। ওকে ছাড়া সে বাঁচতে পারবেনা এ কথাও জানিয়ে দিলে ছিলো তাকে। কিন্তু বনহুর ধরা দেবার পাত্র নয়
হীরা বনহুরকে নিয়ে স্বপ্নসৌধ রচনা করেছিলো। সব সময় ওকে নিয়ে মেতে থাকতো, বনহুর যদিও হীরা আর তার সখীদের মধ্যে নিজকে ছেড়ে দিয়েছিলো, কিন্তু নিজকে সে সংযত রাখতো অতি সাবধানে।
পুরুষ মন মাঝে মাঝে বিচলিত হতো। হীরার সান্নিধ্য তাকে করে তুলতো চঞ্চল, একটা অনুভূতি নাড়া দিয়ে যেতো বনহুরের মনে যখন হীরাবাঈ নিভৃতে এসে বনহুরের বুকে মাথা রাখতো গভীর আবেগে জানাতো—আমি তোমাকে ভালবাসি বনহুর!
বনহুর হীরার কথায় মৃদু হাসতো, জবাব দিতো না কিছু। নিজকে সংযত রাখতো দৃঢ়চিত্তে।
হীরা তার সুকোমল বাহু দুটি বেষ্টন দিয়ে ধরতে বনহুরের গলা –আমি তোমাকে কোনোদিন ছেড়ে দেবো না!
বনহুরের চোখে তখন ভাসতো মনিরার মুখখানা। না জানি তার এই বহুদিনের অদর্শনে মনিরা ও তার মা কত চিন্তিত ও মর্মাহত হয়ে পড়েছেন। আরও মনে পড়তো নূরী আর মনির কথা। কোথায় তারা, বেঁচে আছে না মরে গেছে তাই বা কে জানে। আনমনা হয়ে যেতো বনহুর।
হীরা বনহুরের গম্ভীর ভাবাপন্ন ভাব লক্ষ্য করে বিমর্ষ হতো। ব্যথায় মনটা তার গুমরে কেঁদে উঠতো, অভিমান করে চলে যেতো সে বনহুরের কাছ থেকে!
সখীরা হীরার বিষণ্ণ ভাব লক্ষ্য করে চিন্তিত হতো, ব্যস্তও হতো তারা। হীরাকে নানা প্রশ্ন করতো।
একদিন হীরাবাঈ মুখ গম্ভীর করে বসেছিলো, সখীরা প্রমাদ গুণলো। সবাই ঘিরে ধরে সখীর মনোভাব প্রসন্ন করার চেষ্টা করতে লাগলো, কিন্তু হীরার মুখোভাব কিছুতেই সচ্ছ হলো না বরং অশ্রু গড়য়ে পড়লো তার দুগণ্ড বেয়ে।
সখীরা উদ্বিগ্ন হলো, নিশ্চয়ই ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটেছে। কিন্তু কি ঘটেছে ভেবে পায় না তারা।
সখীরা গিয়ে ধরে বসলো বনহুরকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে চললো।
হেসে বললো বনহুর—তোমাদের হীরা বিয়ে করতে চায়। পা
রুল সবার হয়ে বললো–তা কি করে সম্ভব, সে যে বিধবা!
কিন্তু বিধবার বিয়ে হয়।
অসম্ভর!
তাহলে হীরাকে আমার সঙ্গে মিশতে দাও কেন?
বন্ধু হিসাবে।
হীরা কি তাতেই খুশী?
না হয়ে উপায় নেই। সে জানে হিন্দু বিধবার বিয়ে হতে পারে না।
তাহলে আজ তোমাদের সখী হীরা অমন রাগ বা অভিমান করতো না।
সত্যি তাহলে–
হাঁ, হীরা, শুধু ভালবাসাই চায় না, তার জীবনটা সার্থক করে তুলতে চায়, স্বামী সন্তান সংসার নিয়ে সুখী হতে চায়।
পারুলের দুচোখে বিস্ময় ঝরে পড়ছে, বললো সেমহারাজ যদি একথা জানতে পারেন?
বনহুর শান্ত গলায় বললো–মহারাজ রাজী হয়েছেন।
এ আপনি কি বলছেন?
হাঁ পারুল, হীরার আবার বিয়ে হবে এবং অতি শীঘ্রই হবে।
পারুলের দুচোখে আনন্দ ঝড়ে পড়ে। ছুটে গেলো সখীদের নিয়ে হীরার পাশে। বললো পারুল-সখী, এবার বুঝতে পেরেছি তোমার মনের কথা। জানি তোমার কোথায় এতো ব্যথা। হু– পারুল হীরার গালে মৃদু আঘাত করে।
হীরা সখীদের খুশীভরা ভাব দেখে কিছুটা প্রসন্ন হয়, বলে যা, তোরা বড় দুষ্ট!
পারুল জড়িয়ে ধরে হীরাকে—এবার সব দুঃখ সব ব্যথা দূর হবে সখী। বন্ধুকে পাবি এবার অতি আপন করে।
হীরা অবাক হয়ে বলে–সত্যি?
সত্যি নয় তো মিথ্যা বলছি!
কে বললো এ কথা তোকে পারুল?
তোর বন্ধু।
ও বলেছে?
সেদিন হীরা ভেবেছিলো বনহুরকেই সে স্বামীরূপে পাবে। আশায় আনন্দে নেচে উঠেছিলো তার মন। অফুরন্ত খুশী নিয়ে প্রতীক্ষা করছিলো সেই দিনটির যেদিন বন্ধুকে সে একান্ত আপনার করে পাবে।
হীরা যতই বনহুরের কথা ভেবে আনন্দ উপভোগ করছিলো বনহুর ততই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছিলো। গোপনে সে পাশের রাজ্যের অবিবাহিত রাজার সঙ্গে হীরার বিয়ের সব আয়োজন ঠিক করে ফেললো।
একদিন বিয়ের শুভ লগ্ন এগিয়ে এলো।
হীরার আনন্দ আর ধরে না।
হীরা যতই বনহুরের সঙ্গ কামনা করে, বনহুর ততই নিজকে সরিয়ে রাখে ওর কাছ থেকে। গোপনে পালিয়ে থাকে এদিকে সেদিকে।
একদিন বনহুর পুকুরের শান বাঁধানো ঘাটে বসে নিজের কাজের কথা ভাবছিলো, হীরা চুপি চুপি গিয়ে বনহুরের চোখ দুটো টিপে ধরলো।
বনহুর হেসে বললো-হীরা!
হীরার দুচোখে আনন্দের দ্যুতি খেলে গেলো। বসে পড়লো বনহুরের পাশে কি ভাবছো?
তোমার বিয়ের কথা।
লজ্জায় হীরার মুখ লাল হয়ে ওঠে, বলে–তোমার আনন্দ হচ্ছে না?
খুব!
সত্যি?
সত্যি।
