হঠাৎ সন্ন্যাসী বিকট শব্দে হেসে উঠলো–হাঃ হাঃ হাঃ—
মনি সে হাসির শব্দে নূরীর বুকে মুখ লুকালো।
শিউরে উঠলো নূরী। দুচোখে ফুটে উঠলো রাজ্যের ভয় আর ভীতি। সন্ন্যাসী বললো-বৎস, ভয়ের কোনো কারণ নেই। জানি তুমি নিঃসহায়, নইলে এতক্ষণ তোমাকে আমি ভস্ম করে দিতাম।
নূরী অসহায় দৃষ্টি নিয়ে তাকালো সন্ন্যাসীর দিকে।
সন্ন্যাসীর মুখমন্ডল যদিও দাঁড়ি গোঁফ আর জটাজুটে আচ্ছাদিত তবু সে মুখে একটা প্রসন্নতার আভাস ফুটে উঠেছে। নূরী কিছুটা আশ্বস্ত হলো।
সন্ন্যাসী পুনরায় বললো–নৌকায় তুমি যখন ভেসে চলেছিলে যোগ বলে আমি তা জানতে পেরেছিলাম। এক সপ্তাহকাল না খেয়ে মানুষ কোনোদিন বাঁচতে পারে না, আমিই তোমাকে আর তোমার ঐ পালিত সন্তানকে মৃত্যুর কবল থেকে রক্ষা করেছি। দয়াময়ের নিকট আমি তোমাদের জীবন ভিক্ষা চেয়ে নিয়েছি।
স্তম্ভিত নূরী হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সন্ন্যাসীর মুখের দিকে। একি, তার সব কথা যে বলে দিচ্ছে সন্ন্যাসী! সত্যই যা ঘটেছে তাই বলছে। কি করে জানলো এসব কথা সে!
নূরী যখন এসব ভাবছে তখন সন্ন্যাসী হাসলো, বললো–আমি সব জানতে পারি। একশ বছর আমি জল গ্রহণ না করে তপস্যা করে সর্বশক্তি যোগবল লাভ করেছি! তোমার এবং তোমার পালিত সন্তানের নামও অবগত আছি। তোমরা ক্ষুধায় এখন অত্যন্ত কাতর। যাও দক্ষিণে, তোমাদের খাবার প্রস্তুত রয়েছে।
নূরী চিত্রাপিতের ন্যায় উঠে দাঁড়ালো।
মনিকে কোলে করে এগুলো দক্ষিণ দিকে।
কিছুদূর এগুতেই নূরী লক্ষ্য করলো, সম্মুখে সুন্দর একটা কক্ষ। বিস্ময়ে অবাক হলো নূরী, একটু পূর্বেও এখানে কোনো কক্ষ ছিলো না।
নূরী ভয়চকিতভাবে পা বাড়ালো কক্ষের দিকে।
কক্ষের সামনে উপস্থিত হতেই দরজা মুক্ত হয়ে গেলো। নূরী মনিকে নিয়ে থমকে দাঁড়ালো, কক্ষে প্রবেশ করবে কিনা ভাবছে।
এমন সময় সেই কণ্ঠস্বর-ভয় নেই বৎস, প্রবেশ করো। নূরী ক্ষুধায় এত কাতর হয়ে পড়েছিলো যে, ভয় তার বেশীক্ষণ স্থায়ী হলো না বা চিন্তা করবার সময় হলো না।
কক্ষে প্রবেশ করলো নূরী।
কক্ষে প্রবেশ করতেই নানাবিধ খাদ্য সম্ভার নজরে পড়লো তার। কক্ষের মেঝেতে থালায় সাজানো থরে থরে নানা রকম ফলমূল আর বাটিভরা দুধ।
নূরী মুহূর্ত বিলম্ব করতে পারলো না, মনিকে নিয়ে বসে পড়লো খাবারের পাশে।
বাটি থেকে খানিকটা দুধ ছোট একটা গেলাসে ঢেলে মনির মুখে ধরলো।
মনি দুধটুকু ধীরে অতি ধীরে খেয়ে ফেললো।
নূরী ফলমূল আর দুধ খেয়ে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো।
পেট পুরে আজ খেলো নূরী। মনি বেশী খেলো না, তবু যা খেলো তাতেই সে সুস্থ হয়ে উঠলো।
সেই কক্ষের মেঝেতেই ঘুমিয়ে পড়লো নূরী।
ঘুম যখন ভাঙলো নূরী দেখলো সে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক সবল সুস্থ হয়ে উঠেছে। মনিও যেন পূর্বের মত সুস্থ চেহারা আর হাসি খুশীতে ভরে উঠেছে, ফিক্ কি করে হাসছে সে।
খুনী জেগে উঠতেই মনি নূরীর গলা জড়িয়ে ধরে ভাঙ্গা ভাঙ্গা কণ্ঠে বললো–মাম্মা, আমলা কোথায় এসেছি?
নূরী হেসে বললো–দাদুর ওখানে।
একটা হাসির শব্দ হলো তার কানের কাছে—হাঁ বৎস, ঠিক বলেছো।
নূরী আর মনি চমকে তাকালো, কিন্তু কেউ কোথাও নেই। নূরী এবার মনিকে মি বেরিয়ে এলো, ঘরের বাইরে এসে সোজা চললো সন্ন্যাসীর নিকটে।
নূরী অবাক হয়ে দেখলো–সন্ন্যাসীকে সে তখন যে ভাবে যে স্থানে বসে থাকতে দেখেছে সে, ঠিক সেইভাবে সেই স্থানে বসেই আছে। আশ্চর্য, একচুল এদিক সেদিক হয়নি।
এসব নিয়ে নূরী যখন বিস্ময় বোধ করছে তখন সন্ন্যাসী হেসে বললো—আশ্চর্য হবার কিছু নেই বৎস! তুমি আজ কয়েক দন্ড পূর্বে আমাকে এভাবে এখানে দেখে অবাক হচ্ছে, কিন্তু জানো না আমি এই বটবৃক্ষ তলে আজ একশ বছর পূর্বে এক সন্ধ্যায় বসেছিলাম।
নূরী অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো–একশ বছর পূর্বে!
হাঁ বৎস। সরে এসো, লক্ষ্য করে দেখো আমার দেহে আর মাংসপিণ্ড নেই। বটবৃক্ষের শিকড় এবং মাটি জমে জমাট হয়ে গেছে আমার দেহটা। কিন্তু আমি এখনও জীবিত আছি।
নূরী হঠাৎ বলে উঠলো–বাবা, তুমি আহার-ন্দ্রিা করোনা?
সন্ন্যাসীর সেই ভারী কণ্ঠস্বর–না, আহার-নিদ্রার আমার কোনো প্রয়োজন হয় না। আমি যখন যা ভাবি তখন সেই অভাব পূরণ হয়ে যায়। যখন ক্ষুধা অনুভব করি তখন যা খাবার আমার খেতে ইচ্ছা করে সেই খাবার দ্বারা আমার উদর পূর্ণ হয়। নিদ্রা অনুভব করলে, জেগেই আমি নিদ্রিত হই, কোনো অসুবিধা আমার হয় না।
বাবা!
বৎস, জানি তুমি বড় ব্যথিত, বড় নিঃসঙ্গ।
হাঁ বাবা!
বৎস, আমার আশ্রয়ে তোমার কোনো অসুবিধা হবে না। শুধু তুমি পশ্চিমে ভুলেও কোনোদিন যাবে না।
আমি যাবো না বাবা।
মনিকেও তুমি সাবধানে রাখবে, সেও যেন কোনোদিন ওদিকে না যায়। একটা কথা জেনে রাখো বৎস, পশ্চিমে আমার কোনো যোগবল খাটে না।
আচ্ছা বাবা।
০২.
নূরী আর মনির এখন কোনো কষ্ট নেই।
সুন্দর একটা কুটিরে তারা বাস করে। পাশের ঝর্ণায় স্নান করে। যখন যা খাবার ইচ্ছা হয় তাই খেতে পায়।
কিন্তু তবু সর্বদা নূরী আনমনা হয়ে থাকে, বনহুরের কথা স্মরণ করে সে সর্বক্ষণ চোখের পানি ফেলে। সময় সময় ভাবে—বলবে সে সন্ন্যাসী বাবার কাছে, কোন্ অতলে হারিয়ে গেছে তার হুর। কিন্তু এ কথা সে বলতে পারে না কিছুতেই। এখনও জানে নূরী, তার হুর মরেনি, মরতে পারে না। কিন্তু সন্ন্যাসী বাবা যদি বলে তার মৃত্যু হয়েছে তখন কি উপায় হবে। সহ্য করতে পারবে কি সে ঐ কথা! তার হুর এই পৃথিবীর বুকে বেঁচে আছে, এই আশা নিয়ে নুরীও বেঁচে থাকবে। অনন্তকাল ধরে বেঁচে থাকবে প্রতীক্ষা করবে সে হুরের।
