স্থিরভাবে বসে আছে নূরী।
নৌকা স্রোতের টানে তীরবেগে ছুটে চলেছে।
কখন যে নূরী নৌকায় ঠেস দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে তার খেয়াল নেই। আজ কদিন উপবাসী, তারপর সব সময় কেঁদে কেঁদে ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে নৌকার গায়ে ঢলে পড়েছে সে।
ঘুমিয়ে রয়েছে নূরী—
হঠাৎ নূরীর ঘুম ভেঙ্গে গেলো।
ভোরের মৃদু বাতাসে দেহটা শীতল হয়ে এসেছে। এমন সময় নূরীর কানে এসে পৌঁছলো পাখীর কলরব! তাড়াতাড়ি সোজা হয়ে দৃষ্টি মেললো সে! সঙ্গে সঙ্গে দুনয়ন তার জুড়িয়ে গেলো। নৌকার ছৈয়ের বাইরে সবুজ বৃক্ষলতা, আলোছায়াভরা প্রকৃতি। পাখীরা ডালে বসে কিচমিচ করছে। কেউ বা উড়ে বেড়াচ্ছে মুক্ত আকাশে।
নূরী প্রাণভরে নিশ্বাস নিলো! ভাল করে লক্ষ্য করতেই দেখলো তাদের নৌকাখানা একটা নালার মত জায়গায় আটকে আছে। দূপাশে দুখানা পাথরে চাপে তাদের নৌকা আর এগুতে পারেনি। একটা জলপ্রপাতের শব্দ কানে এলো নূরীর। নূরী মনিকে কোলে নিয়ে ছৈয়ের বাইরে এসে দাঁড়ালো। সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে আঁতকে উঠলো সে। পাথরখন্ডের হাত কয়েক দুরেই প্রায় দুশ ফিট গভীর খাদ। সেই খাদে জলধারা সশব্দে গিয়ে আছড়ে পড়ছে। ভাগ্যিস তাদের নৌকাখানা দুপাশের দুটো পাথরখন্ডের সঙ্গে আটকে পড়েছিলো, তাই এতক্ষণও বেঁচে আছে তারা নইলে দিনের সূর্যের আলো দেখার ভাগ্য আর তাদের হতো না। নূরী দুহাত তুলে খোদার নিকটে শুকরিয়া আদায় করলো।
না,মনিও বেঁচে আছে, ক্ষুধায় একেবারে কাতর হয়ে পড়লেও এখনও প্রাণ আছে তার দেহে।
নূরী নৌকা থেকে ধীরে ধীরে নেমে দাঁড়ালো। অতি সাবধানে নামলো সে, হঠাৎ নৌকাখানা যদি খুলে যায় তাহলে আর তাদের রক্ষা থাকবে না। নূরী নেমে দাঁড়ালো তীরে। ধার দিয়েই নির্মল স্বচ্ছ জলধারা বয়ে যাচ্ছে। সে আর তৃষ্ণা ধরে রাখতে পারলো না। মনিকে বুকে চেপে উবু হয়ে পানি পান করলো। না, এ পানি অতি সুস্বাদু, লবণাক্ত নয়। নূরী মনির মুখে আঁজলা দিয়ে একটু একটু করে পানি দিতে লাগলো। মনির ঠোঁটে পানির ছোঁয়া। লাগতেই ঠোঁট দুখানা ধীরে নড়ে উঠলো। একটু পানি খেলো মনি। নূরীব। মনে একটা ক্ষীণ আশা দেখা দিলো, হয়তো মনি বাঁচলেও বাঁচতে পারে।
এক সময় মনি চোখ মেলে তাকালো।
আশায় আনন্দে নূরীর মনে দোলা জাগলো, মনি তাহলে এ যাত্রা বেঁচে গেলো। কিন্তু সামান্য পানি খাইয়ে কতক্ষণ বাঁচাতে পারবে নূরী এই ছোট শিশুটিকে।
কোনো আশ্রয়ের আশায় নূরী মনিকে বুকে করে এগিয়ে চললো।
নূরী যতই এগোয় ততই অবাক হয় সে। বন হলেও গভীর নয়–সুন্দর পরিষ্কার বন।আগাছা বা ঐ ধরনের গাছ-গাছড়া নেই। বেশ বড় বড় আর সুন্দর সুন্দর, ঝাউগাছ জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝে মাঝে নাম না জানা অনেক রকম ফুল গাছ। এক মধুর স্নিগ্ধ সুরভি নূরীর মনকে প্রফুল্ল করে তুললো।
আরও কিছুটা এগুতেই নূরী দেখলো সুন্দর পরিস্কার একটা জায়গা, দেখে মনে হলো কোনো লোক সেখানে একটু আগে ছিলো, এই মুহূর্তে উঠে গেছে। পরিস্কার জায়গাটায় স্পষ্ট পায়ের ছাপ রয়েছে। নূরীর চোখ দুটো আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। বাঁচবার আশা দোলা দিয়ে গেলো তার মনে। নূরী মনিকে কোলে নিয়ে তাকাতে লাগলো চারদিকে।
নূরী কতক্ষণ বনের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে এসেছে। কিন্তু আশ্চর্য এখন পর্যন্ত একটি হিংস্র প্রাণী তাঁর নজরে পড়েনি। এমন কি একটি বানর বা শিয়াল পর্যন্তও দেখতে পায়নি সে।
নূরী অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলো, মনিকে কোলে করে বসে পড়লো সেই পরিস্কার জায়গাটিতে।
সঙ্গে সঙ্গে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো নূরীর কানে বৎস, এদিকে এসো!
চমকে উঠলো নূরী, মনিকে কোলে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো।
সচকিতভাবে তাকালো চারদিকে কোথা থেকে ভেসে এলো এ কণ্ঠস্বর, কে তাকে ডাকলো কি তার উদ্দেশ্য! নূরীর চোখে মুখে ফুটে উঠলো ভীতি ভাব। কই, কোথাও তো জনমানব দেখা যাচ্ছে না বা কোথাও কোনো ঘর বা কুটিরও নেই।
নূরী যখন ভয়বিহ্বলভাবে তাকাচ্ছে এদিকে ওদিকে তখন পুনরায় সেই কণ্ঠ–ভয় নেই বৎস। পূর্ব দিকে সোজা চলে এসো।
নূরী ভয়চকিত হরিণীর মত কম্পিত পদক্ষেপে এগুলো, কোলে তার মনি।
ধীরে ধীরে এগুচ্ছে নূরী।
চারদিকে বন, কিন্তু অন্ধকার নয়!
সব পরিস্কার, স্বচ্ছ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে নূরী চারদিকে। ভয় ও আতঙ্কে ধকধক করছে তার বুক।
গাছের ওপরে একটা পাখী পাখা ঝাপটে উড়ে গেলো।
চমকে উঠলো নূরী। মনিকে বুকে চেপে ধরলো জোরে। হঠাৎ নূরীর দৃষ্টি চলে গেলো সোজা পূর্ব দিকের একটি বৃক্ষমূলে। একি, বিস্ময়ে আরষ্ট হলো সে। অদূরে একটি বট বৃক্ষতলে জটাজুটধারী ভস্মমাখা এক সন্ন্যাসী উপবিষ্ট। দাঁড়ি-গোফ আর মাথার জটাজুটে তাকে কিস্তুত কিমাকার দেখাচ্ছে।
নূরী ভীত চোখে তাকিয়ে আছে, আর এক পাও এগুতে পারছে না সে।
পুনরায় সন্ন্যাসী গম্ভীর গলায় বললো–ভয় নেই, এসো।
নূরী এবার পা বাড়ালো, কিন্তু মনের মধ্যে ঝড় বইছে। ভয় হচ্ছে সন্ন্যাসীটা নরখাদক নয় তো?
নূরী নিকটে আসতেই সন্ন্যাসী হাত তুলে বললো–বসো।
নূরী তখনও সন্ন্যাসীর নিকট হতে প্রায় দশ হাত দূরে রয়েছে। থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো নূরী, বসে পড়লো সেখানে। সন্ন্যাসীর চেহারা তার মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে চলেছে। নূরীর মত সাহসী মেয়েও ভয়ে ঘেমে উঠতে লাগলো। সন্ন্যাসীর দেহটা ঠিক পাথর বা ঐ ধরনের শক্ত কিছুর তৈরি বলে মনে হলো, এ যেন মানুষের দেহ নয়। মাথায় জটা মূলোর মত মোটা, আর লম্বায় প্রায় তিন হাতের মত, মাটিতে স্তুপাকার হয়ে রয়েছে। দাঁড়ি আর গোঁফেও জট ধরেছে। দাড়িগোঁফও দেড় দুহাত লম্বা। ভুরুগুলো একে বারে সাদা ধবৃধবে হয়ে গেছে। কিন্তু আশ্চর্য সন্ন্যাসীর চোখ দুটো ঠিক কাচের মত স্বচ্ছ বলে মনে হলো। বাঘের চোখের মত যেন জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। কি তীব্র সে চাহনি! নূরী বসে পড়ে মনিকে বুকে আঁকড়ে ধরলো। এবার বুঝি আর তাদের রক্ষা নেই। নরখাদক সন্ন্যাসী তার আর মনির রক্ত শুষে নেবে।
