কিন্তু কতক্ষণ এমনি করে ওকে ভুলিয়ে রাখা যাবে।
গোটা দিন কেটে গেল। রাত এলো—
নূরী আর মনি নৌকার মধ্যে ভেসে চলেছে—দিকহারা, দিশেহারা যাত্রী তারা।
সে রাত গেল, আবার ভোর হলো।
গোটা পৃথিবী সূর্যের আলোতে ঝলমল করে উঠল।
নূরী আর মনির নৌকা ভেসে চলেছে।
মনির সুন্দর গোলাপকুড়ির মত মুখখানা শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে। কাঁদতে পারছে না মনি, কণ্ঠ নীরস শুষ্ক।
নূরী হতাশ হয়ে পড়ল। চোখে অন্ধকার দেখল আর বুঝি মনিকে সে বাঁচাতে পারল না।
এলিয়ে পড়েছে মনি নূরীর কোলে।
নূরীর চোখ বসে গেছে, কণ্ঠ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। নূরী নিজের এবং মনির জীবনের আশা ত্যাগ করল।
আর নূরীর মনে হলো, মনিকে সে রেখে ভুল করেছে।
কেন যে মনিকে তার বাপ-মার কাছে ফেরত দেয়নি।
তাহলে মনি আজ এমনভাবে শুকিয়ে মরত না। কে এর বাবা-কে এর মা, কার এ শিশু-নূরীর চোখ দিয়ে দু’ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। হয়ত তখন সন্ধান করলে এর বাবা মাকে খুঁজে পাওয়া যেত। নিশ্চয়ই ইচ্ছা থাকলে উপায় হত, কিন্তু নূরীই তা হতে দেয়নি। একটা গভীর স্নেহ তার নারী-হৃদয়ে দানা বেঁধে উঠেছিল।
নৌকা ভেসে চলেছে।
নূরীর কোলে মনি ঘুমন্ত না জাগ্রত বুঝার উপায় নেই। চোখ দুটো মুদে আছে। নূরী মাঝে মাঝে ভাবে মনির মৃতদেহ নদীবক্ষে বিসর্জন দিয়ে নিজেও নদীবক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়বে, বাস্ সব শেষ হয়ে যাবে।
যেখানে তার হুর গেছে, তার মনি যাবে, সেখানেই হবে নূরীর চিরশান্তি।
নৌকা দুলে দুলে এগিয়ে চলেছে।
উপরে প্রখর সূর্যের তাপ অগ্নিবর্ষণ করছে।
নিচে সীমাহীন অথৈ জলরাশি—
১.১৩ বন্দিনী
চারদিকে সীমাহীন অথৈ জলরাশি। শুধু জল আর জল। শেষ প্রান্তে জলের সঙ্গে মিশে গেছে যেন নীল আকাশখানা। শান্ত ছেলের মতই নীরব আজ নদীবক্ষ। নেই কোনো উচ্ছলতা। মৃদু মন্দ বাতাসে দোল খেয়ে খেয়ে এগিয়ে চলেছে নূরীর নৌকা। কোলে তার অর্ধ অচেতন মনি। নূরী ব্যাকুল আঁখি মেলে তাকাচ্ছে মনির শুষ্ক মুখখানার দিকে। মাঝে মাঝে তার দৃষ্টি চলে যাচ্ছে দিক থেকে দিগন্তে। যতদূর চোখ যায় নিপুণ দৃষ্টি মেলে সন্ধান করছে তীর দেখা যায় কিনা।
আজ এক সপ্তাহের বেশি হলো তাদের এই অবস্থা হয়েছে। নৌকায় কিছু পানি আর সামান্য খাবার ছিলো তাই দিয়ে দুতিন দিন চালিয়ে নিয়েছিলো নূরী। এ খাবারটুকুর সন্ধান নূরী জানতো না। মাঝিরা পথে খাবে বলে হয়তো এটুকু নিয়েছিলো। তাই একদিন নূরীর নজরে পড়ে গিয়েছিলো। কোনোরকমে সেই সামান্য খাবারে চালিয়ে নিয়েছিলো। কিন্তু এক সপ্তাহ বা তার বেশিদিন না খেয়ে বাঁচা তো সম্ভব নয়। প্রায় চারটি দিন ওরা সম্পূর্ণ অনাহারে। নিজের জন্য নূরীর দুঃখ নেই, মরতে হয় মরবে। কিন্তু এই অসহায় শিশু যার মুখের দিকে তাকিয়ে নূরীর দুনয়ন অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। কি করে তার এই মর্মবিদারক অবস্থা দর্শন করতে পারে সে! নূরী কায়মনে খোদাকে স্মরণ করে চলেছে।
বেলা শেষ হয়ে এলো, অস্তমিত সূর্যের শেষ রশ্মি এসে পড়লো নূরী
আর মনির মুখে।
হঠাৎ নূরীর মনটা কেঁপে উঠলো, সূর্য অস্ত হবার পর নেমে আসবে জমাট অন্ধকার। পৃথিবীর আলো মুছে যাবে চোখ থেকে। কাল আবার ভোর হবে, সূর্য উঠবে। সোনালী আলোয় বসুন্ধরা ঝলমল করে উঠবে, বাতাস বইবে, দিগ হতে দিগন্তে ফুটে উঠবে কত রঙের মেলা। কিন্তু আর জাগবে না তার মনি। এই আলোর অতলে তলিয়ে যাবে একটি ছোট্ট ফুলের মত সুন্দর জীবন। আর কোনোদিন ঐ মুদিত আঁখি দুটি মেলে তাকাবে না। আর ডাকবে না, মাম্মা বলে। নূরী উচ্ছসিতভাবে কেঁদে ওঠে মনি–মনি–ওরে তুই আর একবার চোখ মেলে দেখ। আর একবার মাম্মা বলে ডাক্, ওরে ডাক!
নূরীর কান্নার দোলা লাগে যেন নদীবক্ষে। হঠাৎ যেন নৌকাখানা একটু বেশি নড়ে উঠলো। চমকে উঠলো নূরী! আজ কদিন তার নৌকা একই–ভাবে মৃদু মন্থর গতিতে ধীরে অতি ধীরে এগিয়ে চলেছে। এতটুকু ছিলো না কোনো রকম পরিবর্তন।
এবার নৌকাখানা যেন বেশ দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে বলে মনে হলো। সূর্য তখন ডুবে গেছে। নদীবক্ষে নেমে এসেছে একটা ঘোলাটে আলোছায়া।
নূরী চমকে উঠলো। বেশ দোলা লাগলো নূরীর দেহে। বুঝতে পারলো তার নৌকাখানা স্রোতের টানে দ্রুত ছুটতে শুরু করেছে। একি, কোথাও নীচু দিকে চললো নাকি তাদের নৌকা? ভয় হলো নূরীর মনে। কিন্তু পরক্ষণেই বুকে সাহস এলো তার। মৃত্যু যখন অনিবার্য তখন ভয় পেয়ে কি লাভ–মরতে তো একদিন হবেই।
নৌকাখানা এবার বেশ দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে। মাঝে মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছিলো, আবার ছুটছিলো আপন গতিতে। বেলা ডুবে গেছে। নৌকার ভেতর জমাট অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। নূরী মনির মুখখানা আর দেখতে পাচ্ছে না। মনিকে বুকে চেপে ধরে রইলো নূরী। দুচোখ বন্ধ করে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো সে।
নূরী জানে, এসব পাহাড়িয়া নদী। মাঝে মাঝে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড পাহাড় আর পাথরখণ্ড লুকিয়ে আছে। যেভাবে তাদের নৌকা এগোচ্ছে তাতে যে কোনো পাহাড় বা উঁচু পাথরের গায়ে নৌকাখানা ধাক্কা খেয়ে ভেঙ্গে খান খান হয়ে যাবে। সঙ্গে সঙ্গে হবে তাদের সলিল সমাধি।
নূরীর মনে শেষ বারের মত বনহুরের মুখখানা ভেসে উঠলো। সেই সুন্দর দীপ্ত দুটি চোখ। নূরী অন্ধকারে তার হুরের স্মরণ করে এত বিপদেও তৃপ্তি অনুভব করলো, পেলো অনাবিল এক আনন্দ। এ জীবন যৌবন সবই যে হুরের–এই নদীবক্ষেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে তার হুর? সেও করবে। তারপর মিলিত হবে ওরা দুজন নির্মল জলের তলায়।
