অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল বনহুর—মায়াভরা কথাতে দস্যু বনহুরের হৃদয় কোমল হয় না মহারাজ।
তুমি যাই বল, তুমি আমারও বন্ধু–কারণ, আমি চাই আমার দ্বীনহীন প্রজাদের মঙ্গল, আমার অনাথ মা বোনদের শান্তি–
এবার বনহুর ছোরাখানা মহারাজ নারায়ণ দেবের বুকের কাছে চেপে ধরল –তোমার নিজের ঘরের দিকে দেখেছ রাজা?
দেখেছি, ও অর্থ আমার নয়। সব আমার প্রজাদে–
সে কথা বলছি না, বলছি–তুমি মা-বোনদের শান্তি চাও?
চাই–শতবার চাই।
তোমার কন্যার মনের দিকে তাকিয়ে একবার দেখেছ রাজা?
চমকে ওঠেন মহারাজ নারায়ণ দেব–আমার কন্যা?
হাঁ, তোমার কন্যা হীরাবাঈ।
চঞ্চলকণ্ঠে বলে উঠলেন মহারাজ-হীরা! আমার হীরার কি হয়েছে দস্যু?
তোমার যদি এতটুকু বিবেক থাকত রাজা, তাহলে নিজের কন্যাকে টুটি টিপে হত্যা করতে না।
হত্যা! আমার হীরাকে হত্যা করেছি টুটি টিপে?
তা নয় তো কি? শিশুকালে তাকে বিয়ে দিয়ে বৈধব্য যন্ত্রণা তার ঘাড়ে চাপিয়ে তিলে তিলে তাকে হত্যা করছ।
একি বলছ? তার অদৃষ্টে যা ছিল তা ঘটেছে।
অদৃষ্টে ছিল না—তুমিই তার জীবনটাকে বিনষ্ট করে দিয়েছ। তার চিরদিনের স্বাদ আহলাদ সব, তুমি নষ্ট করে দিয়ে নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিচ্ছ।
হাঁ, আমরা যে ব্রাহ্মণ, আমাদের ধর্মে মেয়েদের একবারই বিয়ে হয়।
স্বামীকে যে কোনদিন দেখেনি, স্বামী কি জিনিস যে বুঝেনি তার আবার বিয়ে? হাঃ হাঃ হাঃ এই তোমাদের হিন্দুধর্ম! বল রাজা, তোমার কন্যা হীরার আবার বিয়ে দেবে না মৃত্যুবরণ করে নেবে-কোনটায় তুমি রাজী?
তা হয় না। আমাদের হিন্দুমতে ব্রাহ্মণকন্যার পুনঃবিবাহ হয় না।
হতে হবে–নইলে আমি তোমাকে হত্যা করব।
তুমি যত টাকা চাও নিয়ে যাও দস্যু। তবু আমার নিষ্ঠা ভঙ্গ কর না।
তোমার কন্যার জীবনের বিনিময়ে তুমি আমাকে অর্থ দিতে চাও, নিজের জীবনের বিনিময়ে নয়?
আমি নিরুপায়।
না, তোমাকে হীরার বিয়ে দিতেই হবে।
কিন্তু কে তাকে বিয়ে করবে? বিধবাকে কে বিয়ে করবে বল?
আমি তোমার কন্যার পাত্র খুঁজে দেব। বল রাজী?
রাজী।
তিন বার বল রাজী, তিন সত্য করে বল।
রাজী। রাজী। রাজী।
বনহুর যেমন আচম্বিতে এসেছিল তেমনি মুহূর্তে জানালাপথে অদৃশ্য হলো।
পরদিন মহারাজ নারায়ণ দেব রাজসভায় গেলেন না। কোন পরিষদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করলেন না। রাজকার্য করলেন না। রাজকর্মচারিগণ বিস্মিত হলেন। আত্মীয়-স্বজন দুশ্চিন্তায় পড়ল, মহারাজের হঠাৎ এক রাত্রের মধ্যে কি হলো।
আহার-নিদ্রা ত্যাগ করলেন মহারাজ। সদা চিন্তা করতে লাগলেন, কি করে তার বিধবা কন্যাকে আবার বিবাহ দেবেন। সমাজে তার মাথা হেট হয়ে যাবে। নিষ্ঠাভঙ্গ হবে। সবাই ছিঃ ছিঃ করবে। এর চেয়ে মৃত্যু অনেক ভাল।
বনহুর সেই দিনের পর থেকে সিন্ধু রাজ্যে প্রতি ঘরে ঘরে পাত্র খোঁজ করে চলল। হীরার পাত্র সুন্দর, সুপুরুষ, জ্ঞানী, বুদ্ধিমান এবং কুলীন ব্রাহ্মণ হতে হবে।
পেয়েও গেল সে একদিন।
পাশের রাজ্যে ব্রাহ্মণ তরুণ রাজা জহর সেনকে আবিষ্কার করল বনহুর।
তারপর একদিন গোপনে হীরার ছবি নিয়ে রাজা জহর সেনের রাজসভায় বৃদ্ধ জ্যোতিষীর বেশে গিয়ে হাজির হলো।
রাজা জহর সেন যেমন সুন্দর তেমনি হৃদয়বান এবং মহৎ। সে জ্যোতিষীকে আদর করে নিজের পাশে বসাল।
বনহুর জ্যোতিষীর বেশে নিজকে আসনে প্রতিষ্ঠা করে গম্ভীর কণ্ঠে বলল –মহারাজা আপনার জয় হোক।
সসম্মানে বলল জহর সেন—জ্যোতিষী আপনার আগমনের কারণ জানতে পারি কি?
নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই পারেন মহারাজ। আমি এসেছি একটি শুভবার্তা নিয়ে।
বলুন জ্যোতিষী।
বনহুর থলের মধ্যে হতে হীরার ফটোখানা বের করে বলল –এই মেয়ে পছন্দ হয়?
কুমার জহর সেন বনহুরের হাত থেকে ফটোখানা নিয়ে দেখতে লাগল। চোখ মুখ মুহূর্তে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। অনেকক্ষণ তন্ময় হয়ে তাকিয়ে দেখল জহর সেন, তারপর বলল হাঁ, জ্যোতিষী এ মেয়েটি আমার অত্যন্ত পছন্দ হয়েছে।
সত্যি রাজা?
হাঁ এবং অতি শীঘ্র একে আমি বিয়ে করতে চাই।
বেশ, তাই হবে। উঠে দাঁড়ায় বনহুর।
জহর সেন নিজ কণ্ঠের মুক্তার মালা খুলে জ্যোতিষীর হাতে দিতে যায়–এই নিন আপনার পুরস্কার।
না। শুভ কাজের পর আমি পুরস্কার নেবআগে নয়। এখন চললাম।
জহর সেন প্রণাম জানায়। জ্যোতিষী বিদায় গ্রহণ করে।
১৪.
পৃথিবীর বুকে যেন একটা ধ্বংসের লীলা খেলা হয়ে গেছে। গত রাতের ঝড় সব তচনচ করে দিয়ে গেছে। নূরী শিশু মনিকে নিয়ে নৌকায় বসে আছে। নৌকা আপন মনে দুলে দুলে এগিয়ে চলেছে। কোথায় চলেছে, কোথায় এর শেষ-কেউ জানে না।
নৌকার মাঝিদ্বয় বনহুরকে উদ্ধারের জন্য নদীবক্ষে লাফিয়ে পড়েছিল, ফিরে আর আসেনি। কোথায় চলে গেছে ওরা কে জানে। ঝড় থেমে গেছে। প্রকৃতি শান্ত ধীর স্থির হয়েছে। নদীর উচ্ছ্বসিত জলরাশি নিটল নির্মল হয়েছে। কিন্তু এ কোথায় এসে গেছে নূরী আর মনির নৌকা। যেদিকে তাকায় নূরী শুধু জল আর জল। কোথাও তীরের চিহ্ন নেই।
নূরী ভয়ে বিবর্ণ হয়ে উঠল। ক্ষুধা পিপাসায় কণ্ঠনালী শুকিয়ে এসেছে। মনির তো কথাই নেই। বার বার মনি বলছে–আম্মা, আমরা কোথায় যাচ্ছি?
নূরী মনিকে বুকে চেপে বলে উঠে কেমন করে বলব বাবা।
আম্মা, আমার ক্ষিদে পেয়েছে।
হু হু করে কেঁদে উঠল নূরীর মন, বলল–কি খাবে বাপ। কিছুই যে নেই।
