পারুল বসে পড়ল হীরার পাশে, হীরার গালে টোকা দিয়ে বললসব সময় তার ধ্যানেই মগ্ন থাকবি?
পারুল্ল!
হীরা, আমি সব জানি।
আমি ওকে ছাড়া বাচব না পারুল।
কিন্তু তুমি যে হিন্দু ঘরের বিধবা–
পারুল! চিৎকার করে ওঠে হীরা।
পারুল বলে কিন্তু জান এর পরিণতি কি হবে?
বাবা আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেবেন।
হ্যাঁ, তিনি যেমন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ রাজা—তোমার জন্য তিনি নিষ্ঠা নষ্ট করবেন না। সমাজের তিনি অধিপতি–
পারুল, সমাজের জন্য, নিষ্ঠার জন্য আমার জীবন নষ্ট হয়ে যাবে? আমার কি কাউকে ভালবাসার অধিকারটুকু নেই?
হীরা। তুমি তো জান, তোমার মাসিমা দেবীকা বাঈ তাঁর মৃত স্বামীর সঙ্গে সহমরণেও গিয়েছিলেন।
আমাকে তাহলে তখন স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় পুড়ে না মেরে জীবিত রেখেছিল কেন? না, না, আমি বাঁচতে চাই না পারুল, আমি বাঁচতে চাই না–পারুলের বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে হীরাবাঈ।
বনহুর আড়ালে দাঁড়িয়ে অধর দংশন করে। অব্যক্ত একটা ব্যথা তার মনে চাড়া দিয়ে ওঠে। দাঁতে দাঁত পিষে ভাবে হিন্দু সমাজের টুটি ছিড়ে ফেলবে সে। হীরাকে বিয়ে দিয়ে নিষ্ঠাবান রাজার দর্প চূর্ণ করবে কিন্তু পাত্র কোথায়? কোথায়?
সেদিন হীরা সখীদেরকে নিয়ে বনহুরকে নাচ দেখাচ্ছিল। একটা আসনে বনহুর বসে ছিল, হীরা আর তার সখীগণ নেচে চলেছে।
বনহুর তস্ময় হয়ে দেখছে, হীরা অপূর্ব সুন্দর নাচছে।
হীরা এত সুন্দর নাচতে পারে, ভাবতেও পারেনি বনহুর।
সেদিন হীরার বীণার সুর তাকে বিমুগ্ধ করে ফেলেছিল।
বনহুর ভাবে, এত সুন্দর একটা জীবন নীরবে শুকিয়ে যাবে, তা হয় না।
নাচা শেষ হলে সখীরা চলে যায়।
হীরা তাকায় বনহুরের মুখের দিকে। হীরার মুখে ঘামের বিন্দুগুলো ঠিক যেন মুক্তার মত চক চক করছিল। অপূর্ব সুন্দর দেখাচ্ছিল ওকে।
বনহুর সরে আসে হীরার পাশে। মধুর কণ্ঠে ডাকে–হীরাবাঈ।
হীরা গম্ভীর হয়ে বলে—উঁহু, শুধু হীরা বলে ডেক।
বেশ, তাই ডাকব। হীরা, অপূর্ব নেচেছ!
উফুল্ল কণ্ঠে বলে হীরা—সত্যি!
হ্যাঁ হীরা!
হীরা আবেগমাখা কণ্ঠে বলল-বনহুর!
হীরা!
বল?
সেদিন পারুলকে তুমি যা বলেছ সব শুনেছি।
চমকে উঠল হীরা–শুনেছ?
হ্যাঁ, কিন্তু তুমি যা বলছ তা সম্ভব নয়। আমি মুসলমান।
হীরা একবার তাকাল বনহুরের দিকে, তারপর বলল কিন্তু আমি যে তোমাকে ভালবেসে ফেলেছি!
ভাল আমিও তোমাকে বেসেছি হীরা।
বনহুর!
হাঁ, তোমাকে আমি বোনের মত স্নেহ করি।
চমকে তাকাল হীরা, অস্ফুট কণ্ঠে বলল-তুমি–তুমি–
হীরা, আমি বিবাহিত, আমার স্ত্রী আছে,–এমনকি একটি সন্তানও কথা শেষ না করে থেমে যায় বনহুর।
হীরা পাথরের মূর্তির মত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়ে ফোটা ফোটা অশ্রু।
বনহুর হীরার চোখের পানি নিজের আংগুলে মুছে দিল।
হীরা আবেগভরা কণ্ঠে বলল—এ তুমি কি করলে? সঙ্গে সঙ্গে হীরা ঢলে পড়ল মেঝেতে।
বনহুর তাড়াতাড়ি হীরার মূৰ্ছিত দেহটা ধরে ফেললো দু’হাত দিয়ে। তারপর তুলে নিল হাতের উপর।
ঠিক সেই মুহূর্তে পারুল এসে দাঁড়াল—একি! ওকে আপনি স্পর্শ করলেন?
বনহুর একটু হকচকিয়ে গেল, বলল—হঠাৎ হীরা অজ্ঞান হয়ে পড়েছে।
কিন্তু জানেন তো, আমাদের জাতের মধ্যে যে পুরুষ একবার কোনো নারীকে স্পর্শ করে তাকেই বিয়ে করতে হয়।
বনহুর হাসল—চল আগে ওকে বিছানায় শুইয়ে দিই।
পারুল আর বনহুর হীরার সংজ্ঞাহীন দেহটা এনে বিছানায় শুইয়ে দিল।
পারুল হীরার চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দিতে দিতে বলল—একি করলেন! একি করলেন আপনি?
আমি–আমি তো কিছু করিনি।
কথা দিন ওকে বিয়ে করবেন?
সে কথা তোমার সখীর সংগে হয়ে গেছে পারুল।
ও, তাই বুঝি হীরা আনন্দে….
হাঁ, আনন্দে অজ্ঞান হয়ে পড়েছে। আচ্ছা পারুল, তুমি সখীর পাশে এসে সেবা কর, আমি পাশের কক্ষে বিশ্রাম করছি।
তা হয় না, অপনি বরং বসুন, আপনার জন্যই বেচারীর এ অবস্থা।
কিন্তু আমার যে বড্ড ঘুম পাচ্ছে।–বনহুর চট করে উঠে চলে গেল পাশের ঘরে। তারপর খিল এঁটে দিল।
বনহুর সম্মুখ দরজায় খিল দিয়ে পেছনের জানালার কাঁচ খুলে ফেলার চেষ্টা করতে লাগল। অনেক চেষ্টা করে একটা চাকু সংগ্রহ করে নিল বনহুর। তারপর কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর জানালা দিয়ে বেরিয়ে পড়ল বাইরে।
ছাদের রেলিং বেয়ে অতি কষ্টে এগুতে লাগল মহারাজার কক্ষের দিকে।
বনহুর মহারাজের কক্ষের নিকটে এসে পৌঁছল। এবার অতি সহজে তার কক্ষের মুক্ত জানালাপথে ভেতরে প্রবেশ করল। কক্ষে প্রবেশ করেই দেয়ালে টাঙানো সুতীক্ষ্ণধার ছোরাখানা তুলে নিল দক্ষিণ হাতের মুঠোয়। পকেট থেকে রুমালখানা বের করে মুখে বাঁধল যেমন দস্যুরা বাঁধে।
বনহুর এবার সুতীক্ষ্ণ ছোরা হাতে মহারাজ নারায়ণ দেবের শয্যার পাশে এসে দাঁড়াল। একটানে তাঁর শরীরের চাদর সরিয়ে দিল সে।
ধড়ফড় করে উঠে বসলেন রাজা নারায়ণ দেব। সম্মুখে তাকিয়ে চোখ তার ছানাবড়া হলো। ঢোক গিলে বললেন–কে তুমি? কি চাও?
আমি দস্যু বনহুর।
দস্যু বনহুর! কি চাও আমার কাছে? যা চাইবে তাই দেব। শুনেছি কান্দাই জঙ্গলে দস্যু বনহুর বলে এক ভয়ঙ্কর দৃস্যু আছে, সেই দস্যু তুমি?
হাঁ, আমিই।
আরও শুনেছি, দস্যু বনহুর নাকি ভয়ঙ্কর হলেও দয়ার প্রতীক। দীন-হীন জনের বন্ধু। বহুদিনের আশা আমার সফল হলো। মনে মনে বহুদিন তোমাকে দেখার বাসনা আমার মনে উঁকি দিত। দস্যু হলেও তুমি দেবতার সমান–
