দস্যু! ডাকু তুমি?
হাঁ, কিন্তু তুমি?
হীরাবাঈ। আমার বাবা নারায়ণ দেব সিন্ধু রাজ্যের মহারাজ।
হুঁ, রাজকুমারী হীরাবাঈ। কথাটা আপন মনেই বলল বনহুর। একটু থেমে বলল সে আমাকে নদীতীর থেকে কুড়িয়ে এনে ভাল করনি হীরাবাঈ।
কেন?
আমি তোমার সব অলঙ্কার লুটে নিতে পারি।
তুমি আমার সাথে অন্যায় করবে?
করব না, কারণ তুমি আমার জীবন রক্ষা করেছ। বনহুর সরে এলো হীরাবাঈয়ের পাশে আমাকে চলে যাবার পথ দেখিয়ে দাও এবার।
চলে যাবে?
হাসল বনহুর—না গিয়ে কি পারি?
তুমি চিরদিন এখানে থাকতে পার না?
বনহুর সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে তাকাল হীরাবাঈয়ের মুখের দিকে।
হীরা দৃষ্টি নত করে নিল।
বনহুর দেখল, হীরাবাঈয়ের মুখমণ্ডলে একটা অব্যক্ত ব্যথার্ত ভাব ফুটে উঠেছে। কি যেন বলতে চায়, কিন্তু পারছে না।
বনহুর এসে বসল বিছানার একপাশে, হীরাকে লক্ষ্য করে বলল–এখানে আমাকে কে নিয়ে এসেছে হীরাবাঈ?
হীরা মুখ তুলে তাকাল, এগিয়ে এলো বনহুরের পাশেবলল আমি আর আমার সখীগণ।
তোমার বাবা নারায়ণ দেব আমার কথা জানেন না?
না।
সেকি!
হ্যাঁ, আমার বাবা তোমার সম্বন্ধে কিছুই জানেন না।
কেন, তোমরা তাকে বলোনি আমার কথা?
না, আমার বাবা তোমার কথা জানতে পারলে আর কোনদিন তোমাকে আমার কাছে আসতে দেবেন না।
বনহুর হীরাবাঈয়ের কথা যতই শুনছিল ততই অবাক হয়ে যাচ্ছিল। তাই বনহুর প্রশ্ন করে কেন?
হীরা এবার বসল বনহুরের পাশে, বললপুরুষলোক আমার দেখা মানা।
মানা!
হ্যাঁ, কারণ আমি বিধবা।
বিস্ময়ে অস্ফুট ধ্বনি করে বনহুর—তুমি বিধবা! কিন্তু তোমার বয়স তো তেমন বেশি বলে মনে হচ্ছে না হীরাবাঈ?
আমি বাল্যবিধবা। খুব ছোট্টবেলায় আমার বিয়ে হয়েছিল। আমি স্বামীকে চিনার আগেই সে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে।
সে কারণে পুরুষলোক দেখা তোমার মানা?
ব্রাহ্মণ বিধবা আমি, কাজেই আমার কোনদিন–চুপ হয়ে যায় হীরাবাঈ।
বনহুর এবার সব বুঝতে পারে। করুণাভরা নয়নে তাকাল ওর মুখের দিকে। হীরার কথাগুলো তার হৃদয়ে আঘাত করল। বনহুর জানত হিন্দুঘরের বিধবা মেয়েদের কাহিনী অত্যন্ত করুণ, বেদনাদায়ক। কিন্তু চাক্ষুষ দেখার বা অনুভব করার সুযোগ এই তার প্রথম।
বনহুর হীরাঈবায়ের অপরূপ সৌন্দর্যভরা যৌবন ঢলঢল চেহারার দিকে তাকিয়ে স্তব্দ হয়ে যায়। এর জীবনটা কি তাহলে এমনিভাবে নষ্ট হয়ে যাবে। ফুল ফুটে নীরবে যদি ঝরে যায়, কেউ যদি তার ঘ্রাণ গ্রহণ করতে না পারে, তবে সে ফুলের জীবনে সার্থকথা কি?
বনহুর আনমনা হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ হীরার দীর্ঘশ্বাসের শব্দে চোখ তুলে তাকায়।
হীরা বলে ওঠে–তোমাকে কোনদিন যেতে দেব না।
একটুকরা ম্লান হাসি ফুটে উঠল বনহুরের ঠোঁটের কোণে। কোন জবাব দিল না সে।
পূর্বাকাশ তখন ফর্সা হয়ে এসেছে।
সাত সখী প্রবেশ করল কক্ষে। বনহুর ও হীরাবাঈকে পাশাপাশি বসে কথা বলতে দেখে থমকে দাঁড়াল।
হীরাবাঈ হেসে বলল–ভয় নেই, ওরা আমার সখী।
বনহুর ভয় পাবে নারীদের দেখে। তবু চোখেমুখে ভীতিভাব এনে বলল বাচলাম।
একসঙ্গে সখীগণ হেসে উঠল।
হীরা বলল-ওদের সাহায্যেই আমি তোমাকে এখানে এনেছি।
ও, তাই বল। তুমি একা নও।
আমি কি পারি তোমার ওই বলিষ্ঠ দেহটা একা তুলতে। আচ্ছা তুমি আমার এই কক্ষে থাক, আমি গঙ্গাস্নান করে আসি।
সখীদের মধ্য থেকে পারুল বলল—এরই মধ্যে খুব যে ভাব জমিয়ে নিয়েছ হীরা, দেখ সাবধান। বাঁকা চোখে একবার বনহুরের দিকে তাকিয়ে দেখে নিল সে।
হীরা সখীদের সঙ্গে বেরিয়ে গেল।
নগরী জাগরিত হওয়ার পূর্বেই আবার ফিরে আসবে ওরা।
১৩.
ইচ্ছা থাকলেও বনহুর হীরাবাঈ আর তার সাত সখীর নিকট হতে পালাতে সক্ষম হলো না। বিশেষ করে হীরার চোখের পানি তাকে অভিভূত করে ফেলল। বড় মায়া হলো বনহুরের, চাইল হীরার জীবনটা যেন নষ্ট হয়ে না যায় তাই করতে।
সব সময় বনহুর ভাবতে লাগল—কি করে হীরার জীবন সুখের এবং আনন্দের করা যায়! কিন্তু এ সবের মধ্যেও বারবার বনহুরের মনে নূরী আর মনির কথা উদয় হতে লাগল। সেই মন্দিনা নদী থেকে এদেশ কত দূরে। কত দুরে সেই কান্দাই নগর, যেখানে তার মা আর মনিরা তার প্রতীক্ষায় প্রহর গুণছে। নূরী আর মনির জন্যই বনহুরের মন বেশি বেদনাবিধুর হয়ে পরেছে। ইচ্ছা করলে এখনই সে চলে যেতে পারে কিন্তু হীরা হীরাকে এমনভাবে ফেলে মন তার যেতে চাইল না।
বনহুর যখন হীরাবাঈয়ের জন্য গভীরভাবে চিন্তা করছে, হীরা তখন বনহুরকে কেন্দ্র করে রচনা করে চলেছে স্বপ্নসৌধ।
হীরা বাগানের ফোয়ারার পাশে বসে বীণা বাজাচ্ছিল। আর ভাবছিল বনহুরের কথা। ওকে আর কোনদিন ছেড়ে দেবে না হীরা। যোক সে বাল্যবিধবা, মানবে না ওসব কিছু। গোপনে বনহুরকে সে লুকিয়ে রাখবে নিজের অন্তঃপুরে, যেখানে কোন পুরুষের প্রবেশ নিষেধ, কেউ জানবে না ওর কথা।
হীরা মাঝে মাঝে পারুলের কাছে মনের কথা সব খুলে বলত। আজ পারুল এসে বসল হীরার পাশে। ওকে চমকে দেবার জন্য পেছন থেকে হীরার চোখ দুটি চেপে ধরল।
হীরার হাতে বীণার সুর থেমে গেল।
হীরা চমকে উঠলো, বনহুরের চিন্তায় হীরা তন্ময় ছিল, কাজেই সে চট করে বলল তুমি?
পারুল হীরার চোখ ছেড়ে দিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল। হীরা লজ্জিত কণ্ঠে বলল-ও তুই?
দু’সখী মিলে যখন কথা হচ্ছিল, অদূরে এসে একটা গাছের আড়ালে দাঁড়াল বনহুর। যেখান থেকে হীরা আর পারুলের কথা সব শুনতে পাবে।
