সাত ঘোড়ার গাড়িতে হীরাবাঈ সাত সখী পরিবেষ্ঠিত হয়ে গঙ্গাতীরে স্নানে আসে। এমন কি ঘোড়াগাড়ি চালক পর্যন্ত নারী। হীরাবাঈ বাল্যবিধবা, ব্রাহ্মণ-কন্যা। রাজা নারায়ণ দেব অতি নিষ্ঠাবান রাজা। কন্যা বিধবা হলেও তার কোন স্বাদ-আহলাদ থেকে তিনি বঞ্চিত করেননি। যা হীরাবাঈ ভালবাসে চায়, তাই করেন রাজা নারায়ণ দেব।
প্রতিদিনের মত আজও হীরাবাঈ সাত সখী নিয়ে গঙ্গায় স্নান সেরে বাড়ি ফেরার জন্য গঙ্গাতীর বেয়ে গাড়ির দিকে অগ্রসর হচ্ছিল।
হঠাৎ হীরাবাঈয়ের দৃষ্টি চলে যায় অদূরে, সে দেখল বালুচরে পড়ে রয়েছে একটি লোক। সংগিনীদের দেখিয়ে বলল হীরা–দেখ দেখ ও কে পড়ে আছে!
হীরা সখীদের নিয়ে অগ্রসর হলো।
নিকটে পৌঁছে বিস্ময়ে স্তম্ভিত হলো হীরা। সখীরাও কম আশ্চর্য হলো। অপূর্ব সুন্দর এক যুবক অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে রয়েছে বালুচরে।
হীরা পুরুষ মানুষ তেমন করে কোনদিন দেখেনি। যদিও দেখেছে দূরে, এত কাছে একমাত্র পিতাকে ছাড়া কাউকে দেখার সুযোগ তার কোনদিন হয়নি।
হীরা অবাক নয়নে তাকিয়ে রইল যুবকের মুখের দিকে।
সখীরা এ ওর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল। হীরা বাল্যবিধবা, কোন পুরুষ দেখা তার পাপ। সখীরাও যুবকের অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে গেছে।
হীরা বসে পড়ল যুবকের পাশে। তাড়াতাড়ি বুকে কান রেখে বলল-পারুল এ জীবিত!
পারুল বলল—হয়ত কোন নৌকাডুবি লোক।
হীরা ব্যস্তকণ্ঠে বলল-একে নিয়ে চল পারুল।
সর্বনাশ, মহারাজ যদি জানতে পারেন?
আমি ওকে কিছুতেই এখানে রেখে যাব না পারুল, ওকে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা কর। নিশ্চয়ই কোন রাজকুমার হবে।
একজন সখী বলল—কিন্তু পোশাক তো রাজকুমারের মত নয়। দেখছ না জামা ছেড়া।
অন্য একজন সখী বলল—সত্যি, এ অপূর্ব সুন্দর কিন্তু।
আর একজন বলল—দেবকুমারের মত দেখতে।
পারুল বলল-আমার হীরার সংগে সুন্দর মানত যদি সে বিধবা না হত–
হীরা গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল-ন্যাকামি রাখ দেখি। আহা বেচারী না জানি কে, কি এর পরিচয়!
পারুল হেসে বলল জ্ঞান ফিরলেই সব জানা যাবে।
হীরা বলল—তাড়াতাড়ি তুলে নে আমার গাড়িতে।
সবাই মিলে যুবকের সংজ্ঞাহীন দেহটা তুলে নিল গাড়িতে।
জ্ঞান ফিরতেই চোখ মেলে তাকাল বনহুর।
একি! বিস্ময়ে স্তম্ভিত হলো। দুগ্ধ-ফেনিল শুভ্র বিছানায় নরম তুলতুলে বালিশে মাথা রেখে শুয়ে আছে সে। বনহুর ধীরে ধীরে তাকাল কক্ষের চারদিকে। সুন্দর করে সাজান কক্ষটি। নানা রকমের বিচিত্রময় কারুকার্যখচিত দেয়াল। বড় বড় ঝাড়বাতি আর মূল্যবান লণ্ঠন ঝুলছে। যে খাটে শুয়ে রয়েছে সে খাটখানা অতি সুন্দরভাবে তৈরি। খাটের সংগে মখমলের ঝালর টাঙানো রয়েছে। খাটের পাশে গোল মার্বেল পাথরের টেবিল। টেবিলে মস্তবড় একটা ফুলদানি। ফুলদানিতে অনেকগুলো ফুল গোঁজা রয়েছে।
বনহুর এবার বিছানায় উঠে বসল, সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠল সে। পাশের একটা লম্বা সোফায় অপূর্ব সুন্দরী এক যুবতী নিদ্রামগ্ন। গোলাপের পাপড়ির মত মুদিত দুটি আঁখিযুগল। আপেলের মত গণ্ডদ্বয়। বনহুর তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকে ঘুমন্ত যুবতীর মুখের দিকে।
একি সে স্বপ্ন দেখছে! বনহুর স্মরণ করতে চেষ্টা করল এখন সে কোথায়?-মনে পড়ল সব কথা। নৌকা থেকে নবীবক্ষে ছিটকে পড়ার দৃশ্য ভেসে উঠল তার মানসপটে। মনে পড়ল নূরী আর মনির কথা। না জানি তাদের অবস্থা কি হয়েছে। হয়ত সলিল সমাধি লাভ করেছে ওরা। ব্যাথায় টনটন করে উঠল বনহুরের মন।
কিন্তু এখানে এলো সে কি করে!
নদীর উচ্ছ্বসিত জলরাশির সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে কখন তার হাত দু’খানা অবশ হয়ে এসেছিল, তারপর কখন যে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল, খেয়াল নেই কিছু।
বনহুর নিজেকে এই সুসজ্জিত রাজকক্ষে দেখে অনুমানে কিছুটা বুঝে নিল। কিন্তু এটা কোন দেশ, কে এই যুবতী, তাকে কি করেই বা এখানে আনল। ইচ্ছা করলে এখনই বনহুর কক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। কিন্তু কিছু না জেনে হঠাৎ এমনভাবে বাইরে বের হওয়া এখন তার পক্ষে উচিত হবে না।
বনহুর জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখল, রাজবাড়িই বটে। ফিরে এলো সে ঘুমন্ত যুবতীর পাশে, ঝুঁকে পড়ে দেখতে লাগল সত্যি অদ্ভুত সুন্দরী মেয়েটি। নিশ্চয়ই রাজকন্যা হবে। কিন্তু সে রাজকন্যার শয়ন কক্ষে এবং বিছানায় শায়িত কেন? মোমবাতি নিয়ে বনহুর হীরার মুখটা ভাল করে দেখতে লাগল!
হঠাৎ এক ফোটা তপ্ত মিম ঝরে পড়ল হীরার গণ্ডে।
চমকে জেগে উঠল হীরাবাঈ। চোখ মেলতেই দেখল সেই যুবক তার পাশে দাঁড়িয়ে। দক্ষিণ হাতে তার মোমবাতি।
বনহুর তাড়াতাড়ি সরে যাচ্ছিল; হীরা পিছু ডাকল শোন।
থমকে দাঁড়িয়ে বনহুর ফিরে তাকাল।
হীরা মৃদু হেসে উঠে দাঁড়াল। এগিয়ে এলো তার পাশে। বললোযুবক, কে তুমি? কেমন করে নদীতীরে এসেছিলে?
বনহুর বুঝতে পারল—সে মন্দিরা নদী থেকে প্রবল ঝড়ের দাপটে ঢেউয়ের আঘাতে কোন অজানা দেশে এসে পড়েছে। নদীতীরে হয়ত পড়েছিল সে, এরা তাকে তুলে এনেছে। কিন্তু এ যুবতীর কক্ষে কেন?
হীরা পুনরায় প্রশ্ন করল কি ভাবছো যুবক? আমার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছ না কেন?
বনহুর শান্তকণ্ঠে বলল—আমি বনহুর।
হীরা বনহুরের কথাটা পুনরাবৃত্তি করল—বনহুর! তারপর বলল—কোন দেশের রাজকুমার তুমি?
আমি রাজকুমার নই।
তবে কে তুমি?
আমি দস্যু।
