নৌকা বেয়ে চলছে ভীম সেনের দু’জন অনুচর।
আকাশের দক্ষিণ কোণে ভেসে ওঠে একখণ্ড কাল মেঘ।
বনহুর আর নূরী তা টের পায় না। ওরা তখন নৌকার মধ্যে আপ কথায় মগ্ন। বনহুর নূরীর মুখখানা তুলে ধরে হাতের তালুতে–নূরী, আজ আমার জয়যাত্রা।
নূরী সোজা হয়ে বসল, হেসে বলল-তোমার নয় আমার, এ জয়যাত্রা আমার।
উঁহু, আমার নূরী। কারণ আমি তোমাকে জয় করে নিয়ে চলেছি।
না, আমি তোমায় জয় করে নিয়েছি, হুর!
দু’জনই হেসে উঠল উচ্ছ্বসিতভাবে।
নূরীর গালে মৃদু টোকা দিয়ে বলল-নূরী, তুমি কোন দিন সিনেমা দেখেছ?
সে কি রকম জিনিস?
ছায়াছবি। ছবি কথা বলে, গান গায়, হাসে, কাঁদে….
সত্যি?
হ্যাঁ, জীবন-কাহিনী নিয়ে তৈরি হয় এই ছায়াছবি।
আশ্চর্য!
নূরী, জান ছবির প্রধান চরিত্র হলো ছবির নায়ক-নায়িকা। একজন নায়িকা, হয়তো তার বিপরীতে থাকে দু’জন নায়ক। দু’জনই ভালবাসে একজনকে। কিন্তু আসল নায়ক হলো একজন, দ্বিতীয় জন ভিলেন বা আসল নায়কের ভালবাসায় বাধা প্রদানকারী।
নূরী অত্যন্ত মনোযাগের সঙ্গে বনহুরের কথাগুলো শুনে যাচ্ছিল। বললহা বুঝলাম।
বনহুর বলে চলে—কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভিলেনের পরাজয় হয়-হয় মৃত্যু, নয় মতের পরিবর্তন। এক নায়িকার দুই নায়ক থাকতে পারে না কোনদিন।
হ্যাঁ, এটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন–অসম্ভব।
বনহুর মৃদু হেসে বলল——আর এক নায়কের যদি দুই নায়িকা হয়?
তাও অসম্ভব! একটি প্রাণ কোনদিন দু’জনের হয় না। কিন্তু এসব তুমি আমায় বলছ কেন হুর?
নূরী, তুমি জান আমি মনিরাকে বিয়ে করেছি।
মুহূর্তে নূরীর মুখ অন্ধকার হয়ে উঠল। যদিও নূরী এ কথা জানে তবু বনহুরের মুখে কথাটা শুনে হৃদয়টা খান খান হয়ে গেল ওর। ব্যথায় মুচড়ে উঠল ভেতরটা। মুখ ফিরিয়ে তাকাল অন্য দিকে।
আকাশে তখন মেঘ জমাট বেঁধে উঠেছে।
মাঝিদের মনে আশঙ্কা জাগল। তবু দাড় টেনে চলেছে তারা দ্রুত হস্তে। চাঁদ এখনও সম্পূর্ণ মেঘের নিচে ঢাকা পড়ে যায়নি। তাই জোছনার আলো নদীবক্ষে ঝিকমিক করছিল।
নৌকার মধ্যে নূরী আর বনহুর টের পায়নি কিছু।
বনহুর বুঝল এবং জানে, মনিরাকে নূরী সহ্য করতে পারে না –মনিরাও সহ্য করতে পারে না নূরীকে। কিন্তু উভয়ে গভীরভাবে ভালবাসে একজনকে—সে হলো বনহুর নিজে।
এমন অবস্থায় বনহুরের কি কর্তব্য? বনহুর নিজের মনে বিচার করে দেখেছে, সে উভয়কেই ভালবাসে। নূরী ছাড়া বনহুর ভাবতে পারে না। মনিরাকে, মনিরাকে বাদ দিয়েও নূরীকে ভাবতে পারে না। এই দুই নারীর প্রেম ভালবাসা-মমতা বনহুরকে সমানভাবে দখল করে বসেছে।
বনহুর জানে, পৃথিবীতে একজন-একজনকেই মনপ্রাণ সব দিতে পারে, দু’জনকে নয়। কিন্তু তার অবস্থা পৃথিবীর সকলের চেয়ে অন্য রকম। মনিরা আর নূরী বনহুরের কাছে সমান বলে মনে হয়।
মনিরা বনহুরের হৃদয়ে জাগায় শিহরণ, নূরী জাগায় স্পন্দন। মনিরার মধ্যে বনহুর রচনা করে খুশির উৎস। মনিরা তার হৃদয়ের রাণী আর নূরী তার প্রাণ প্রতিমা। কাউকে বনহুর তুচ্ছ বা নগণ্য মনে করতে পারে না। আজ তাই বনহুর নূরীকে হঠাৎ এই প্রশ্ন করে বসল।
বনহুর নূরীর চিবুকটা ফিরিয়ে নিল নিজের দিকে, শান্তকণ্ঠে বলল-কি হলো নুরী?
কিছু না।
কিন্তু পৃথিবীতে যা না হয়েছে আমি তাই চাই নূরী। আমি চাই তোমাদের দুজনকে।
নূরী বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলল–তা কি সম্ভব?
নূরী, যা সম্ভব নয় আমি তাই চাই–গভীর আবেগে নূরীকে কাছে টেনে নেয় বনহুর।
মনি এমন সময় নড়ে ওঠে। নূরী বলে—ছিঃ মনি জেগে যাবে যে?
ঠিক সেই মুহূর্তে মাঝির কণ্ঠে শোনা গেল ভয়ার্ত স্বর-হুজুর, ঝড় আইবো। আকাশে দারুণ মেঘ অইছে।
বনহুর আর নূরী ছৈয়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো বাইরে। গাঢ় মেঘে আকাশ আচ্ছন্ন। বনহুরের আর একটা দিনের কথা বিদ্যুতের মত খেলে গেল মনের আকাশে। এমনি সেদিনও সে দাঁড়িয়ে ছিল পিতার পাশে, আকাশে ঘন মেঘ জমাট বেঁধে উঠেছিল। পরক্ষণেই ঝড়-বৃষ্টি তুফান–তারপর সব ওলোট পালট হয়ে গিয়েছিল, এমন কি তার জীবনটাও।
বনহুর আজ সেই ছোট্ট বালকটি নেই, আজ সে বলিষ্ঠ যুবক।
বনহুর দ্রুত নিজে গিয়ে দাঁড় তুলে নিল হাতে। নূরীকে লক্ষ্য করে বলল-শিগগির ভেতরে যাও নূরী, মনিকে কোলে নিয়ে বস।
আর তুমি?
আমি দেখি নৌকাটাকে বাঁচাতে পারি কিনা–বনহুরের কথা আর শোনা যায় না ঝড়ো হাওয়ায়। নূরী গিয়ে ঘুমন্ত মনিকে তুলে নেয় কোলে।
ঝড়ের দাপটে নৌকাখানা দোলনার মত দুলতে লাগল। দু’জন মাঝি আর বনহুর নিজে নৌকাখানা বাঁচানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগল।
বৃষ্টির পানি আর উচ্ছ্বসিত ঢেউয়ের পানিতে বনহুরের সমস্ত শরীর ভিজে চুপসে গেল। বলিষ্ঠ হাতে দাঁড় ঠিক রেখে নৌকাকে বাঁচাবার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল সে।
হঠাৎ প্রচণ্ড একটা ঝাপটায় বনহুর নৌকার গলুই থেকে ছিটকে পড়ল নদীতে। সঙ্গে সঙ্গে নৌকাখানা একটা ঘুরপাক খেয়ে তীরবেগে ছুটতে লাগল লক্ষ্যহীনভাবে!
১২.
একদল সখী পরিবেষ্ঠিত রাজকুমারী হীরাবাঈ গঙ্গাস্নান সেরে বাড়ি ফিরছিল। খুব ভোরে রোজ হীরাবাঈ সখীদের নিয়ে গঙ্গাস্নানে আসে। অপূর্ব সুন্দরী হীরা বেলা ওঠার পূর্বে রাজপথ বেয়ে গঙ্গাতীরে যায়। আবার লোক জাগার পূর্বেই রাজপুরীতে ফিরে আসে। যতক্ষণ হীরা রাজপথ দিয়ে গঙ্গাস্নান সেরে ফিরে না যায় ততক্ষণ নগরীর দোকানপাট বা যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে।
