ভীম সেন আদেশ দিল শুকনো কাঠ আর ডালপালা সংগ্রহ করতে, বনহুরকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হবে।
ভীম সেনের আদেশ লংঘন হবার উপায় নেই।
বনের মধ্যে একটা জায়গায় শুকনো কাঠ আর শুকনো ডালপালার স্তুপাকার হয়ে উঠাল একটা উঁচু জায়গায় বনহুরকে হাত-পা বেঁধে দাঁড় করিয়ে আগুন ধরিয়ে দেবায় আয়োজন করা হলো।
নূরী মনিকে বুকে চেপে কাঁদতে লাগল। এবার আর ওকে বাঁচান সম্ভব হবে না। নিজের দোষে আজ নূরী বনহুরের হত্যার কারণ হয়ে দাঁড়াল। নানাভাবে চিন্তা করতে লাগল, কোন উপায় ওকে বাঁচাতে পারে কিনা, কিন্তু কোন কৌশলেও সম্ভব হবে না।
এক সময়ে ভীম সেনের নিকটে গিয়ে সে কেঁদে পড়ল—বাপু, তোমার মনে পড়ে, বলেছিলে এ পথ তুমি চিনলে কি করে? যেদিন আমি বনহুরকে ধরার জন্য কান্দাই বনে যাই? মনে পড়ে বাঁশীর সুরে আমি যখন বনহুরকে ঘর থেকে বের করে আনি তখন বলেছিলে-ওর সংগে তোমার বাঁশীর সুরে যোগাযোগ হলো কি করে? আমি বলেছিলাম বলব পরে।
হাঁ, তুমি বলেছিলে বেটি, বলেছিলে। কিন্তু কি কথা তা তো আজও বলনি?
বাপু, শোন আজ বলছি। আমি দস্যু দুহিতা, বনহুর আমার স্বামী!
স্বামী! অস্কুট ধ্বনি করে উঠল। তাকাল তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে নূরীর মুখের দিকে। তারপর বললো—এ কথা আগে বলিসনি কেন মা? আমি ওকে পরপুরুষ জেনে তোকে মিথ্যাবাদী ঠাউরিয়েছি। আর তাই তো ওকে আগুনে পুড়িয়ে মারার আয়োজন করেছি।
নূরীর মনের আকাশ মুহূর্তে মেঘমুক্ত হয়ে গেল। গভীর উত্তেজিত কণ্ঠে বলল-বাপু, রঘুই আমাকে গোপনে ওর অনুচর দ্বারা চুরি করে অজানা একটা দ্বীপে বন্দী করে রেখেছিল এবং আমার ইজ্জত নষ্ট করার জন্য উম্মাদ হয়ে উঠেছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে রঘু গুহায় প্রবেশ করল—সর্দার, বনহুরকে তার আসনে আনা হয়েছে।
ভীম সেন তাকাল রঘুর মুখে।
রঘু দেখল নূরী ভীম সেনের সম্মুখে দণ্ডায়মান।
ভীম সেন বলল—হয়েছে?
হাঁ সর্দার, হয়েছে। এখন আপনি গেলেই শুকনো কাঠে আগুন ধরিয়ে দেয়া হবে।
ভীম সেন হঠাৎ হেসে উঠল ভীষণভাবে—হাঃ হাঃ হাঃ, চমৎকার। চল তাহলে।
ভীম সেন এগুলো, পাশে চলল রঘু।
নূরী পেছনে।
ভীম সেনের হাসির শব্দে নূরীর হৃৎপিণ্ড থরথর করে কেঁপে উঠল। একটু পূর্বে তার হৃদয়ে যে ক্ষীণ আশার আলো জ্বলে উঠেছিল, দপ করে তা নিবে গেল নিমেষে।
শিথিল পা দুখানা টেনে নিয়ে নূরী এসে দাঁড়লে ভীম সেনের পাশে। তাকাল সামনে।
উঁচু একটা বেদীর মত জায়গায় বনহুরকে শিকল দিয়ে দু’হাত দুটো গাছের গুঁড়ির সঙ্গে মজবুত করে বেঁধে দেয়া হয়েছে। পা দুটোও বাঁধা হয়েছে শিকলে। তার চারপাশে স্তুপাকার শুকনো কাঠ আর ডালপালা।
একজন ভীষণ চেহারার লোক জ্বলন্ত মশাল হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে। আদেশের প্রতীক্ষা মাত্র।
নূরী দু’হাতে চোখ ঢেকে ফেলল।
বনহুর তাকিয়ে আছে নূরীর দিকে।
নূরী কাঁদছে।
বনহুরের মুখমণ্ডল কঠিন পাথরের মত। এতটুকু বিচলিত হয়নি বা ঘাবড়ে যায়নি সে। মৃত্যু যখন একদিন হবেই তখন এতে ঘাবড়াবার কি আছে! কিন্তু মরার সময় মা, মনিরা এদের সঙ্গে দেখা হলো না এই যা দুঃখ।
এখানে যখন বনহুর মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে নিয়েছে, তখন কান্দাই শহরে চৌধুরীবাড়ির একটা কক্ষে মরিয়ম বেগম নামাযান্তে দু’হাত তুলে পুত্রের মঙ্গল কামনা করে খোদার নিকটে দোয়া প্রার্থনা করছিল। দু’গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল তাঁর অশ্রুধারা।
মরিয়ম বেগমের দোয়া খোদার আরশে গিয়ে পৌঁছল। তিনি মায়ের দোয়া মঞ্জুর করলেন।
ভীম সেন কঠিন কষ্ঠে আদেশ দিল-বনহুরকে মুক্তি দাও। রঘুকে বন্দী কর।
সঙ্গে সঙ্গে একদল অনুচর রঘুকে ঘিরে ফেলল। অপর দল বনহুরের শিকল খুলে দিতে লাগল।
রঘু এ অবস্থার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না। সে আনন্দিত মনে প্রতীক্ষা করছিল, বনহুরের অগ্নিদগ্ধ দেহটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে নূরীকে নিয়ে নিরুদ্দেশ হবে। কিন্তু সব আশা তার মুহূর্তে ধূলিস্যাৎ হয়ে গেল।
শিকলে আবদ্ধ হলো রঘু।
বনহুরের স্থানে রঘুকে মজবুত করে বাঁধা হলো। মাত্র কয়েক মুহূর্ত, দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল লেলিহান অগ্নিশিখা। রাতের অন্ধকার আলোয় গোটা বন আলোময় হয়ে উঠল।
গনগনে অগ্নিকুন্ডের মধ্যে থেকে ভেসে এলো রঘুর আর্তচিৎকার–মরে গেলাম! জ্বলে গেল। জ্বলে গেল। মরলাম….মরলাম…
ভীম সেন অট্টহাসি হেসে উঠলনারীহরণকারীর জ্বলে মরাই উচিত সাজা।
নূরী ছুটে গিয়ে বনহুরের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
বনহুর ওকে নিবিড়ভাবে টেনে নিল।
ভীম সেন আনন্দের হাসি হাসল।
বনহুর এবার বিদায় চাইল ভীম সেনের কাছে।
ভীম সেন বনহুরকে বুকে জড়িয়ে ধরে বিদায় দিল।
১১.
মন্দিরা নদীর বুকে নৌকা ভাসল। বনহুর আর নুরী পাশাপাশি বসে হাত নাড়ছে, ওদের মাঝখানে মনি। সেও ছোট্ট হাত নেড়ে ভীম সেন এবং তার দলকে বিদায় সম্ভাষণ জানাচ্ছে।
ধীরে ধীরে ভীম সেনের দলসহ নদীতীর অদৃশ্য হলো।
নূরী মনিকে তুলে নিল বুকে।
বনহুর হাসল।
নূরী তাকিয়ে দেখল বনহুরের মুখের দিকে। অপূর্ব সে হাসি। বনহুরের দীপ্ত মুখমণ্ডলে এক অদ্ভূত উজ্জ্বলতার ছাপ।
নদীবুকে দুলে দুলে নৌকা এগিয়ে চলেছে।
বনহুরের বুকে মাথা রেখে নূরী শুয়ে আছে। পাশে ঘুমন্ত মনি!
বনহুর নূরীর চুলে ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল।
নিস্তব্ধ রাত।
জোস্নাভরা আকাশ।
নদীর জলে জোস্নার আলো অপূর্ব এক মোহময় পরিবেশ সৃষ্টি করে চলেছে। ঝুপঝাপ দাঁড়ের শব্দের সঙ্গে পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ মিশে একটানা সংগীতের মত মনে হচ্ছে।
