ইতোপূর্বে রঘু এখানেই, এই পথেই এসেছে এবং সুড়ঙ্গে প্রবেশ করেছে, কিন্তু ঐ রক্তের চিহ্ন তার নজরে পড়েনি। কারণ সে তখন স্বাভাবিক মনোভাব নিয়ে ছিল না। কিছুটা মদ সে এখানে দাঁড়িয়েই পান করে নিয়েছিল। একটা ছিপিও বনহুর কুড়িয়ে পেল।
এবার বনহুরের কাছে সব স্বচ্ছ হয়ে এলো। অতি সহজেই পাথরখন্ড সরিয়ে ফেলল বনহুর। বিস্মিয়ে স্তম্ভিত হলো সামনে একটা সুড়ঙ্গপথ দেখতে পেল সে।
মুহূর্ত বিলম্ব না করে সুড়ঙ্গপথে প্রবেশ করল।
ওদিকে রঘু নূরীকে ধরে ফেলেছে।
নূরী নিজেকে বাঁচাবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে! কিল, চড়, লাথি দিয়ে ও রঘুর হাত থেকে উদ্ধার পাচ্ছে না সে। নূরী কামড়ে রঘুর হাত রক্তাক্ত করে দিয়েছে, তবু রঘু তাকে প্রবলভাবে এটে ধরেছে। চোখে মুখে রঘুর উন্মত্ত নেশা।
নূরী মরিয়া হয়ে ধস্তাধস্তি করছে। মনে প্রাণে খোদাকে সে স্মরণ করছে, হে দয়াময়! তুমি আমাকে বাঁচাও! আমার ইজ্জত রক্ষা কর।
আর বুঝি নিজেকে রক্ষা করতে পারে না নূরী।
এই বুঝি তার জীবনের চরম পরিণতি। নূরী হাত-পা ছোড়ে, দাঁত দিয়ে কামড় দেয়, তবু নিজেকে রঘুর কবল থেকে উদ্ধার করতে সক্ষম হচ্ছে না।
রঘু আর নূরীতে ভীষণ ধস্তাধস্তি হচ্ছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে বনহুর এসে দাঁড়াল সুড়ঙ্গমুখে। কঠিন কণ্ঠে গর্জে উঠল নূরীকে ছেড়ে দাও রঘু।
রঘু সামনে যম দেখলেও বুঝি এত চমকে উঠত না।
সঙ্গে সঙ্গে রঘু নূরীকে ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
ক্ষুব্ধ শার্দুলের কবল থেকে হরিণ শিশু ছাড়া পেয়ে যেমন ছুটে যায় মায়ের পাশে, তেমনি নূরী রঘুর কবল থেকে ছাড়া পেয়ে ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল, বনহুরের বুকে।
বনহুর নূরীকে গভীরভাবে বুকে টেনে নিল, পরক্ষণেই নূরীকে সরিয়ে দিয়ে প্রচণ্ডভাবে আক্রমণ করল রঘুকে।
রঘু ভাবতেই পারেনি এই পাতালপুরীতে কেউ তার সন্ধান পাবে।
রঘু আর বনহুরে চলল লড়াই।
অসীম শক্তিশালী ওরা দু’জনই।
রঘু নিরস্ত্র বলে বনহুর নিজের ছোরা ব্যবহার করল না। নইলে এক নিমেষে ওকে শেষ করে ফেলত।
রঘু অল্পক্ষণেই টের পেল, তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী দস্যু বনহুর।
এবার রঘু পালাবার জন্য পথ খুঁজতে লাগল।
হঠাৎ বনহুরকে ধাক্কা দিয়ে সুড়ঙ্গপথের বিপরীত দিকে অগ্রসর হলো রঘু।
ওদিকে দেয়াল।
রঘু কোথায় যেন চাপ দিল, সঙ্গে সঙ্গে ওদিকে একটা পথ বেরিয়ে এলো। রঘু সেই পথে ছুটতে শুরু করল। বনহুরও তার পেছনে ছুটে চলল।
আবার ধরে ফেলল বনহুর রঘুকে।
রঘু পড়ে গেল মেঝেতে।
চলল আবার ধস্তাধস্তি।
নূরী কিছুতেই একস্থানে স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারল না। সেও বনহুরের পিছু পিছু ছুটে এলো।
এদিকে যে এমন একটা পথ আছে একটুও বুঝার উপায় ছিল না।
বনহুর আর রঘুর লড়াই চলেছে।
রঘু নিজেকে বাঁচাবার জন্য বহু চেষ্টা করছে। হঠাৎ বনহুরকে ধরাশায়ী করে রঘু ছুটে পালাল। মাত্র এক মুহূর্তে, বনহুর উঠে রঘুর পেছনে ধাওয়া করল।
কিন্তু কি আশ্চর্য, আর অল্প দূরে গিয়েই রঘু লাফিয়ে পড়ল একটা গর্তের মধ্যে।
বনহুর আর নূরী ছুটে গিয়ে দেখল, গর্তটা খুব গভীর এবং নিচে পানির ভীষণ ছলছল কলকল শব্দ হচ্ছে।
বনহুরও লাফিয়ে পড়তে যাচ্ছিল, কিন্তু নূরী ওকে জাপটে ধরে ফেলল-না না, হুর, তুমি ও কাজ করনা। ক্ষান্ত হও।
বনহুর সোজা হয়ে দাঁড়াল।
শরীর বেয়ে ঘাম ঝরে পড়েছে। জামাটা ভিজে চুপসে গেছে। নূরী বনহুরের বুকে মুখ লুকিয়ে বলে উঠল—হুর!
বনহুর নূরীকে নিবিড়ভাবে টেনে নিল কাছে। অস্ফুট কণ্ঠে ডাকল–নূরী!
নিজের আঁচলে নূরী বনহুরের ললাটের এবং মুখের ঘাম মুছে দিতে লাগল।
১০.
ভীম সেনের সামনে দাঁড়িয়ে রঘু।
ভীম সেনের দু’চোখে যেন আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে। কঠিন কণ্ঠে গর্জে উঠল ভীম সেন-তোমার কথা সত্য?
হাঁ সর্দার, সব সত্য। আপনার কন্যা সমতুল্য নূরীকে ঐ শয়তান বনহুর গোপনে লুকিয়ে রেখেছিল। আমি আজ তাকে হাতে নাতে ধরে ফেলেছি। আর নূরীকে উদ্ধার করতে গিয়ে এই দেখুন আমার অবস্থা….নিজের শরীরের ক্ষতগুলো দেখায় রঘু।
ভীম সেনের দেহের রক্ত উষ্ণ হয়ে উঠল।
সে তখনই তার অনুচরগণকে আদেশ দিল নিয়ে এসো ধরে যেখানে পাবে বনহুরকে। আমি তাকে আগুনে পুড়িয়ে মারব।
ভীম সেন যখন তার হুকুম পেশ করছিল তখন নূরীকে নিয়ে হাজির হলো বনহুর।
রঘুকে ভীম সেনের সামনে দণ্ডায়মান এবং ভীম সেনকে ক্রুদ্ধ দেখে বনহুর সমস্ত ব্যাপারখানা বুঝে নিল।
কিন্তু তার পূর্বেই রঘুর ইংগিতে বনহুরের বুকে তীর-ধনু বাগিয়ে ধরা হলো।
ভীম সেনের অন্যান্য অনুচর বনহুরকে বন্দী করে ফেলল।
অবশ্য বনহুর নিজে একা হলে তাকে বন্দী করার সাধ্য তাদের তখন ছিল না, সবাইকে পরাজিত করে পালাতে সক্ষম হতো সে, কিন্তু নূরী আর
মনিকে রেখে পালাবে কি করে?
নূরী আর মনির জন্যই বনহুর আজ ভীম সেনের দলের হাতে নিজেকে সমর্পন করল।
নূরী অনেক করে বুঝিয়ে বলল, বনহুর তাকে বাঁচিয়ে নিয়েছে। সব দোষ রঘুর। রঘুই তাকে চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল-সব বলল। কিন্তু ভীম সেন সে কথা কিছুতেই বিশ্বাস করল না। . রঘুর চক্রান্তভরা কথাই ভীম সেন মেনে নিল।
ভীম সেন নারীহরণের অপরাধে বনহুরকে কঠিন শাস্তি-অগ্নিদগ্ধ করবে মনস্থ করে ফেলল।
বনহুরকে আবার সেই অন্ধকারময় গুহায় শিকলে আবদ্ধ করে রাখা হলো।
