বনহুর বুঝতে পারল, নূরীকে নৌকাপথে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
বনহুরও এগুলো ভীম সেন ও রঘুর পেছনে পেছনে।
নূরী বন্দিনী অবস্থায় ভূগর্ভে নীরবে অশ্রু বিসর্জন করে চলল।
রঘুর অনুচরগণ তাকে সেখানে রেখে কিছু খাবার ও এক কলসী পানি ছাড়া আর কিছুই দিয়ে যায়নি।
নূরী এই নির্জন পাতাল গহ্বরে একা কি করবে। এখান থেকে আর তার উদ্ধার নেই। বাঁচার কোন আশাও নেই। মৃত্যুর জন্য নূরী ভীত নয়। ভয় এই নির্জন পাতালপুরীতে কেউ যদি তার ওপর হামলা করে বসে। ভয় তার ইজ্জতের, ভয় তার সতীত্বের।
যা ভেবেছিল তাই হলো।
একদিন অকস্মাৎ আবির্ভাব হলো রঘু ডাকুর। সে কি ভীষণ চেহারা, মদ পান করে মাতাল হয়ে এসেছে সে। হাতে তার মদের বোতল।
নুরী রঘুকে দেখেই ভয়ে বিবর্ণ হলো।
তাকে যে রঘুই হরণ করে এনে এখানে লুকিয়ে রেখেছে, এ কথা সে জানে। কারণ, তাকে যখন নৌকায় তুলে নেওয়া হচ্ছিল তখন রঘুই তাকে কাঁধে করে এনেছিল।
নূরী ভীত হলেও ঘাবড়াল না, বলল রঘু, তুমিই আমাকে একদিন বাঁচিয়েছ, আর আজ তুমিই….
অট্টহাসিতে ফেটে ছিল রঘু, তারপর হাসি থামিয়ে বললবাঁচিয়েছিলাম বলেই আজ আমি তোমাকে চাই।।
রঘু, তুমি না বাপুর কাছে শপথ করেছ, কোন নারীকে তুমি স্পর্শ করবে না?
হাঃ হাঃ হাঃ, শপথ–রেখে দাও তোমার শপথ। আমি ওসব মানি না। যেদিন তোমাকে প্রথম দেখেছি, ঐ দিন তোমাকে জীবন সঙ্গিনী করবো বলে শপথ করেছি। আমি তোমাকে চিরদিনের জন্য চাই–আর তারই জন্য আমার এত প্রচেষ্টা। জান এই পাতাল গহবরে আমি কত কষ্ট, কত পরিশ্রম করে এই গোপন স্থানটি তৈরি করে নিয়েছি। এখানে কেউ তোমার সন্ধান পাবে না। সর্দার ভীম সেনও না।
নূরী অসহায়ভাবে বলে উঠল কিন্তু পাপ তোমার চাপা থাকবে না।
পাপ হাঃ হাঃ হাঃ, পাপ! রঘু ডাকু পাপকে ভয় করে না সুন্দরী। ডাকু লোক পাপকে ডরায় না। পাপ ডরায় ডাকুকে দেখে, বুঝেছ? এসো সুন্দরী! রঘু এগোয় নূরীর দিকে।
নূরী ভীতভাবে পিছু হটতে থাকে।
বনহুর একটা ছোট ছিপ নৌকা বেয়ে দ্রুত এগিয়ে আসছে। মন্দিনা নদীর বুকে বনহুরের বৈঠার ঝুপঝাপ শব্দ দ্বিপ্রহরের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করছিল।
বনহুরের শরীর ঘেমে নেয়ে উঠেছে। দ্রুত হাত চালাচ্ছে সে।
বনহুর রঘুকে অনুসরণ করেই নৌকা ভাসিয়েছিল। ও যাতে টের না পায় সেজন্য বেশ দূরত্ব রেখে ধীরে ধীরে এগুচ্ছিল। তার লক্ষ্য ছিল রঘুর নৌকায়।
রঘুর নৌকা যখন দ্বীপে এসে ভীড়লো তখন বনহুরের ছিপনৌকা রঘুর নৌকা থেকে প্রায় দু’শ হাতের বেশি দূরে। রঘু নৌকা রেখে দ্বীপে. অদৃশ্য হবার পর বনহুর এসে পৌঁছল রঘুর নৌকার পাশে।
প্রখর সূর্যের তাপে বনহুরের মুখমণ্ডল রাঙা হয়ে উঠেছে। সুন্দর ললাটে ফুটে উঠেছে ক্লান্তির ছাপ। তবু কোন হতাশ নেই, প্রবল উত্তেজনা নিয়ে ছুটে এসেছে সে নূরীর সন্ধানে।
নূরী নিরুদ্দেশ হবার পর বনহুর রঘুর প্রতি তীক্ষ্ণ নজর রেখেছিল। কারণ, প্রথমেই তার সন্দেহ হয়েছিল রঘুকে। যদিও নূরী অদৃশ্য হবার পর রঘু ভীম সেনের আস্তানা ছেড়ে একবারও বাইরে যায়নি, তবুও বনহুরের মনে এ সন্দেহ বদ্ধমূল হয়েছিল যে, রঘুই নূরীকে সরিয়েছে। সেদিনের পর থেকে তাই বনহুরের চোখে নিদ্রার অবসান হয়েছে। সর্বদা বনহুর রঘুকে পাহারা দিত। রাতে বিছানায় শুয়ে গোপনে তাকিয়ে থাকত রঘুর দিকে। দিনে রঘু যেখানেই যেতো বনহুরও থাকত ওর পাশে। সুচতুর রঘু অনেক করেও বনহুরের দৃষ্টির বাইরে যেতে পারেনি। বনহুর রঘুর চেয়ে কম চতুর নয়।
বনহুর সেদিনই বুঝতে পেরেছিল, যেদিন সে নদীতীরে নূরীর আংটি কুড়িয়ে পেয়েছিল-বুঝতে পেরেছিল কোন পথে নূরীকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেদিন হতেই বনহুর প্রস্তুতি নিচ্ছিল–নদীপথে শয়তানকে অনুসরণ করতে তার যেন কোন ভুল না হয়। অসুবিধা না হয়। অতি গোপনে একটা ছিপনৌকা সংগ্রহ করে নিতে সক্ষম হয়েছিল সে।
আজ বনহুর সেই ছিপনৌকা নিয়েই রঘুকে গোপনে অনুসরণ করছিল।
বনহুর দ্রুতহস্তে ছিপনৌকাখানা টেনে খানিকটা উপরে তুলে নিল। তারপর ছুটতে শুরু করল বালির উপর রঘুর পদচিহ্ন লক্ষ্য করে। কিন্তু কিছুদূর এগুতেই বালুভূমি শেষ হয়ে উঁচুনীচু অসমতল জঙ্গলাকীর্ণ পথ শুরু হলো। বনহুর কোন দিকে এগুবে ভাবতে লাগল। কিন্তু বেশিক্ষণ ভাবার তার সময় নেই। আবার এগুতে শুরু করল।
বনহুর যখন বনভূমি ডিংগিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল, ওদিকে তখন রঘুর কবলে নূরী হিংস্র বাঘের থাবায় যেমন মেষশাবকের অবস্থা হয় তেমনি নিজেকে রক্ষার জন্য কক্ষময় ছুটাছুটি করছিল।
প্রসারিত থাবা মেলে রঘু নূরীকে ধরার জন্য অগ্রসর হচ্ছে। আর নূরী নিজেকে রক্ষা করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টায় পিছু হটছে।
নূরী কয়েকবার মদের খালি বোতল ছুড়ে মেরেছে।
রঘু অতি কৌশলে নিজের মাথা বাঁচিয়ে নিয়েছে।
ক্ষুদ্ধ শার্দুলের মত রঘু নূরীকে ধরার জন্য উম্মাদ হয়ে উঠেছে।
বনহুর তখন বনময় ছুটাছুটি করছে, কোথায় রঘু অদৃশ্য হলো। না জানি নূরীকে সে কোথায় বন্দী করে রেখেছে, তার উপর কি অত্যাচার করছে তাই বা কে জানে। বনহুর পাগলের ন্যায় অন্বেষণ করে চলেছে। হঠাৎ বনহুরের দৃষ্টি গিয়ে পড়ে অদূরে কয়েকটা পাথর পাশাপাশি পড়ে রয়েছে। একটা পাথরের উপর নজর পড়তেই বনহুর চমকে উঠল, পাথরটার গায়ে রক্তের একটা ক্রস চিহ্ন।
