নূরীকে নিয়ে লোকগুলো সুড়ঙ্গপথে অগ্রসর হল। কোথায় চলেছে, পথের যেন শেষ নেই। অন্ধকার পথ, একটা লোক মশাল হাতে আগে আগে চলেছে।
সমতল সুড়ঙ্গপথ।
মাঝে মাঝে বাঁক ঘুরে চলে গেছে অন্যদিকে। নূরী ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। যেখানে তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সে পথের যেন শেষ নেই। নূরী নিজের জীবনের আশা ত্যাগ করল।
মৃত্যু ছাড়া এখান থেকে বের হবার আর কোন পথ নেই তার।
হুর–মনি তার মনি না জানি কত কাঁদছে। কচি মনির মুখখানা নূরীর চোখের সামনে ভেসে বেড়াতে লাগল।
এবার প্রশস্ত একটা জায়গায় এসে থমকে দাঁড়াল লোকগুলো।
নূরী মশালের আলোতে দেখলো, গভীর মাটির নিচে একটি প্রশস্ত কক্ষ। চারদিকে পাথরের দেয়াল, মাঝে মাঝে গাছের গুড়ির থাম দিয়ে ছাদটা আটকে রাখা হয়েছে। কেমন ভিজে স্যাতসেঁতে মেঝে। একপাশে গাছের গুড়ির তৈরি একটি খাটিয়া, কয়েকটা মোটা ধরনের লতাগুল্মের তৈরি বসার আসন। আরও দেখল নূরী, একপাশে মেঝেতে পড়ে রয়েছে দুটো মাটির কলসী। কয়েকটা বড় বড় বোতল।
শিউরে উঠল নূরী, এগুলো কিসের বোতল তা সে জানে। এত গভীর মাটির নিচে মদের বোতল এলো কি করে! নিশ্চয়ই এটা শয়তানদের গোপন আস্তানা।
নূরীর অনুমান মিথ্যা নয়।
শয়তান রঘু গোপনে এই আস্তানা তৈরি করে নিয়েছে। এখানেই তার গোপন বৈঠক চলে। আর চলে মদের আড্ডা। রঘু দুর্দান্ত এবং চালাক ডাকু। ভীম সেন সর্দার হলেও তাকে রঘু ভেতরে ভেতরে কমই পরোয়া করত। মাঝে মাঝে ছদ্মবেশে লোকালয়ে গিয়ে বিলেতী মদ নিয়ে আসত। স্বভাবও তার মোটেই সৎ ছিল না। নূরী এখানে আসার পর থেকে তার মনে কুচিন্তা দানা বেঁধেছে। কিন্তু ভীম সেনের আস্তানায় থেকে তার মনোবাসনা সিদ্ধ হবে না। কাজেই সেই থেকে রঘু নূরীকে সরাবার জন্য কৌশলে জাণ বিস্তার করছিল। অজানা-অচেনা এক দ্বীপে সে সুড়ঙ্গ কেটে একটা জায়গা তৈরি করে নিচ্ছিল, যেখানে সে নূরীকে নিয়ে চিরদিনের জন্য সরে যেতে পারে। ভীম সেন কেন, ভীম সেনের বাবা এলেও আর তার ও নূরীর সন্ধান পাবে না।
কিন্তু সময়ের প্রয়োজন।
তাই রঘু ধীরে ধীরে তার লক্ষ্য পথে অগ্রসর হচ্ছিল। এমন দিনে হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে বনহুর এসে পড়ল তাদের দলে। কেঁচো তুলতে সাপ বেরিয়ে পড়ল। নূরীকে সরাতে তার কোন বেগ পেতে হত না, কিংবা কয়েকদিন পরে সরালেও চলত, কিন্তু তা হবার উপায় নেই। তাই রঘু নূরীকে দ্রুত সরিয়ে ফেলল ভীম সেনের আস্তানা থেকে। একমাত্র বনহুরের জন্য তাকে এত তাড়াতাড়ি করতে হলো।
একদিন নয়, আরও কয়েকদিন রঘু বনহুর আর নূরীকে একসঙ্গে মিশতে দেখেছে। আড়ালে দাঁড়িয়ে দাঁতে দাঁত পিষেছে। কিন্তু নীরব রয়েছিল
সে, বললে সব কাজ হয়ত ফাঁস হয়ে যাবে।
তবু একদিন বলেছিল রঘু ভীম সেনের কাছে। তাতেও হিতে বিপরীত হয়েছে। ভীম সেন তাকে অবিশ্বাসী বদনাম দিয়েছে। নূরীকে সরিয়ে বনহুরকে শেষ করবে, এই তার মনের বাসনা।
নূরীকে তার অনুচর দ্বারা সরিয়ে ফেললেও রঘু ভীম সেনের পাশে পাশে রইল। তাকে যেন কোনরকম সন্দেহ না করে।
ভীম সেন বনে বনে নূরীর সন্ধান করতে লাগল। বনহুর আর রঘু তার সঙ্গে রয়েছে।
বনহুরের মুখমণ্ডল গম্ভীর ভাবাপন্ন।
আর রঘুর মুখোভাব দুষ্টামিতে ভরা, গোপনে বারবার সে বনহুরের মুখ লক্ষ্য করে নিচ্ছিল আর মনে মনে খুশি হচ্ছিল।
ভীম সেন ক্লান্ত হয়ে পড়ল। সে সত্যিই নূরীকে মেয়ের মত ভালবেসে ফেলেছিল। নূরীর অদর্শনে ভীম সেনের হৃদয়ে শান্তি ছিল না।
মন্দিনা নদীতীরে এসে দাঁড়াল ভীম সেন, রঘু আর দস্যু বনহুর। ভীম সেন নদীর দিকে তাকিয়ে দু’হাত জুড়ে বলল—মা গঙ্গে, তুই আমার মাইয়ারে এনে দে। মা গঙ্গে–
ভীম সেন চোখ মুদে নদীর নিকটে প্রার্থনা জানাতে লাগল, তার মুদিত চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। এত দুঃখেও বনহুরের হাসি পেল। নদী কি করে তার মেয়েকে এনে দেবে, ভেবে পেল না বর্নহুর।
হঠাৎ বনহুরের দৃষ্টি চলে গেল নদীর ধারে একটা স্থানে। কি যেন পড়ে রয়েছে সেখানে। বনহুর এগিয়ে এলো, নত হয়ে যেমনি জিনিসটা হাতে উঠিয়ে নিতে যাবে, অমনি রঘু পায়ের চাপে মাটিতে দেবে দিল।
বনহুর সোজা হয়ে দাঁড়াল, কঠিন মুখোভাব নিয়ে তাকাল রঘুর দিকে।
রঘু কোন জবাব না দিয়ে মাটি থেকে জিনিসটা হাতে তুলে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল নদীর পানিতে। তারপর বলল—বাপু চলো!
ভীম সেন হাতের পিঠে চোখ মুছে দাঁড়াল।
ভীম সেনের সঙ্গে রঘু পা বাড়াল। বনহুর ফিরে তাকাল পূর্বের সেই স্থানটিতে। যেখানে ইতোপূর্বে কোন একটা জিনিস সে দেখেছিল যা রঘু নদীগর্ভে নিক্ষেপ করেছিল। জিনিসটা কি ছিল, কেনই বা রঘু তাকে দেখতে দিয়ে নদীগর্ভে নিক্ষেপ করল? বনহুর তাকাতেই অদূরে ঠিক তার কাছ থেকে হাত দুই দূরে কি যেন চকচক করে উঠলো। বনহুর এবার ক্ষিপ্রগতিতে এগিয়ে গিয়ে চকচকে জিনিসটা হাতের তালুতে উঠিয়ে নিল। সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠল বনহুর, এ যে নূরীর আংটি! বনহুরই একদিন নূরীকে এটা উপহার দিয়েছিল। বনহুর তাকিয়ে দেখল ভীম সেন আর রঘু অনেক দূরে এগিয়ে গেছে।
বনহুর আংটিটা হাতে নিয়ে এবার ভাবতে লাগল, তারপর তাকাল অদূরে এগিয়ে চলা রঘুর দিকে। নিশ্চয়ই রঘুর চক্রান্তেন নূরী নিরুদ্দেশ হয়েছে এবং তাকে এই নদীপথেই সরানো হয়েছে। নূরী চিহ্নস্বরূপ তার আংটি রেখে গেছে নদীতীরে। বনহুর লক্ষ্য করল যেখানে আংটিটা পেয়েছে সেখানে এবং তার আশেপাশে ভিজে মাটিতে বেশ কিছু সংখ্যক পায়ের দাগ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
