বনহুর সরল স্বাভাবিক মন নিয়ে মেতে রয়েছে নিজের কাজে। ভীম সেন যাতে খুশি থাকে সেই কাজ করে সে। আবার সুযোগ পেলেই ছুটে যায় নূরীর পাশে।
মন্দিনা নদীতীরে নূরী আর বনহুর হাসে, গান গায়—বনে বনে ঘুরে বেড়ায়। মনিও থাকে তাদের সঙ্গে।
এ দৃশ্য একদিন রঘুর চোখে পড়ে যায়।
বনহুর আর নূরী সেদিন একটা গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে বসে গল্প করছিল। হাসছিল ওরা দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে।
রঘু দূর থেকে লক্ষ্য করল। চুপ করে গিয়ে জানাল ভীম সেনের কাছে।
ভীম সেন তখন অস্ত্র পরীক্ষা করে দেখছিল, রঘু গিয়ে দাঁড়াল তার পাশে—সর্দার।
ভীম সেন তাকাল তার মুখের দিকে।
রঘুর দু’চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে, কঠিন কণ্ঠে বললসর্দার, বনহুর রাণীর সঙ্গে প্রেম করছে।
গর্জে উঠল ভীম সেন–প্রেম!
ভীম সেনের আদেশ ছিল, তার আস্তানায় কোন নারী থাকবে না বা কোন অনুচর নারীর সংশ্রবে যাবে না। নূরীকে ভীম সেন কন্যার আসনে স্থান দিয়েছিল এবং তার প্রতি সেই রকম আচরণ সে নিজে করত আর অনুচরগণকেও করার জন্য আদেশ দিয়েছিল। বনহুরের সঙ্গে নূরীর যে কোন সম্বন্ধ বা পরিচয় থাকতে পারে, একথা ভীম সেন কোন সময় ভেবে দেখেনি বা ভাবার মত তার মনোভাব হয়নি।
হঠাৎ রঘুর মুখে ‘প্রেম’ শব্দটা শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল ভীম সেন, বলল—বনহুর রাণীর সঙ্গে প্রেম করছে?
হাঁ, সর্দার। আমার সঙ্গে এসো, দেখবে চল।
ভীম সেন আর রঘু খোলা তরবারি হাতে দ্রুত এগিয়ে চলল। একটা গাছের আড়ালে এসে দাঁড়াল ওরা দু’জন। একটু পূর্বে যেখান থেকে রঘু দেখে গিয়েছিল বনহুর আর নুরীকে।
ভীম সেনের মুখ কঠিন হয়ে উঠল, দেখলো বনহুর শিশু মনিকে নিয়ে আদর করছে। নূরীর চিহ্ন নেই সেখানে। ভীম সেন রঘুকে অবিশ্বাসী বলে গাল দিল।
রঘু সর্দারের মুখে এই শব্দ প্রথম শুনল। রাগে ক্ষোভে অধর দংশন করল রঘু। তারপর চলে গেল সেখান থেকে। এমন অপদস্থ জীবনে সে কোনদিন হয়নি। এ তার চরম অপমান।
রঘুর মনে প্রতিহিংসার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। প্রকাশ্যে কিছু না বললেও ভেতরে ভেতরে নূরীর প্রতি রঘুর লালসা ছিল। শুধু ভীম সেনের ভয়ে সে কোনদিন নূরীর প্রতি হস্তক্ষেপ করার সাহস পায়নি।
নূরী নিজের গুহায় বসে জামা সেলাই করছিল। মনির এবং নিজের জামাকাপড় নূরী নিজেই সেলাই করত। আজ একটা জামা সেলাই করছিল আর গুন গুন করে গান গাইছিল। নূরীর মনে আজ কোন দুঃখ নেই। তার হুরকে সে জয় করে নিয়েছে, সমস্ত অন্তঃকরণ দিয়ে ওকে সে পেয়েছে।
নূরী বনহুরের চিন্তায় মগ্ন, ঠোঁটে গানের মৃদু দোলা। চোখের সামনে ভাসছে অতীতের কত দৃশ্য।
হঠাৎ পেছন থেকে রঘু নূরীর মুখ চেপে ধরল। সঙ্গে সঙ্গে মুখে গুঁজে দিল একটা রুমাল। অতি সহজে তুলে নিল কাঁধে। গুহার অদূরে অন্ধকারে কয়েকজন রঘুর অনুচর অপেক্ষা করছিল। নূরীকে নিয়ে রঘু পৌঁছতেই তারা ওকে ধরে মন্দিনা নদীবক্ষে ছোট্ট একটা ডিঙ্গি নৌকাতে তুলে নিল।
রঘু ফিরে এলো আস্তানায়।
নূরীকে যখন মুখে রুমাল গুঁজে মন্দিনা নদীবক্ষে ডিঙ্গি নৌকায় উঠিয়ে নেয়া হলো তখন বনহুর নিজের গুহায় পাথরের শয্যায় শুয়ে বিশ্রাম করছে।
পরদিন ভীম সেনের দলের মধ্যে একটা মহা আলোড়ন শুরু হলো–নূরী নিরুদ্দেশ হয়েছে।
বনহুরের কানেও কথাটা গেল। শুনে সে চিন্তিত হলো, এই গহন বনে সে যাবে কোথায়?
মনি মায়ের জন্য আকুলভাবে কাঁদছে।
বনহুর মনিকে তুলে নিল বুকে। কিন্তু নূরী গেল কোথায়? বনহুর ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়ল। এখানে সে কার জন্য রয়েছে? শুধু নূরী-সূরীর জন্য সে আজও এই ভীম. সেনের আড্ডায় পড়ে রয়েছে।
বনহুর শিশু মনিকে কিছুতেই প্রবোধ দিতে পারছে না।
ভীম সেন অত্যন্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ল। নিজের অনুচরগণকে নূরীর সন্ধানে ছড়িয়ে দিল সে বনের বিভিন্ন স্থানে।
ভীম সেন নিজেও বের হলো ঘোড়ায় চেপে।
রঘু হাসল মনে মনে।
বনহুর রঘুর মুখোভাব লক্ষ্য করে দাঁতে দাঁত পিষলো।
নূরীকে যখন ডিঙ্গিনৌকায় তুলে নেওয়া হলো তখন নূরী চিৎকার করতে না পারলেও সে নিজের হাতের আংটি এবং মাথার কাঁটা খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল নদীতীরে।
কয়েকজন বলিষ্ঠ লোক তাকে মজবুত করে হাত-পা বেঁধে ডিঙ্গির উপর ফেলে রাখল।
গোটা রাত ধরে ডিঙ্গি চলল। ভোর হবার পূর্বেই একটা দ্বীপের মত জায়গায় এসে তারা ডিঙ্গি নৌকাখানা বেঁধে ফেলল। নূরীকে এবার বন্ধনমুক্ত করে দিল।
নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচল নূরী। এতক্ষণ মুখে রুমাল বাঁধা থাকায় নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল।
নূরীকে জোরপূর্বক টেনে হিচড়ে নিয়ে চলল বলিষ্ঠ লোকগুলো।
নূরী শত চেষ্টা করেও ওদের হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে নিতে পারলো না।
চারদিকে পানি আর মধ্যে এই অদ্ভুত ধরনের দ্বীপ। বড় বড় পাথর আর টিলার মত উঁচুনীচু অসমতল জায়গা। মাঝে মাঝে বড় বড় জংগল আর গাছপালা।
নূরীকে এই দ্বীপের এক স্থানে এনে নামিয়ে নেওয়া হলো। কতগুলো পাথর এক জায়গায় পাকার হয়ে পড়ে রয়েছে। লোকগুলো নূরীকে নিয়ে সেই পাথরের স্তুপের কাছে এসে থামল। কয়েকজনে ধরে একটা পাথর সরিয়ে ফেলল, সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এলো একটা সুড়ঙ্গপথ।
লোকগুলো সেই সুড়ঙ্গপথে নূরীকে নিয়ে চলল।
নূরীকে যখন লোকগুলো সুড়ঙ্গপথে নিয়ে যাবার জন্য টানাটানি করছিল তখন নুরী নিজের আংগুল কমড়ে কিছুটা কেটে ফেলল। রক্ত বেরিয়ে এলো নুরীর আংগুল বেয়ে। নূরী সেই রক্ত পাথরের গায়ে একটা সংকেত চিহ্নের আকারে মুছে নিল।
